কারবালার শহীদদের জন্য শোক প্রকাশ বৈধ: আনোয়ার কবির

  • News Code : 719049
  • Source : IRIB
Brief

পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন সুরায় শোক প্রকাশ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ ও গবেষক জনাব একেএম আনোয়ার কবির।

আবনা ডেস্ক : পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন সুরায় শোক প্রকাশ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ ও গবেষক জনাব একেএম আনোয়ার কবির। তিনি সুরা আল 'ইমরান' ও সুরা 'বুরুজে'র উদাহরণ তুলে ধরেছেন।
আনোয়ার কবির রাসুলের উদ্ধৃতি তুলে ধরে বলেন, ইমাম হুসাইন হচ্ছেন বেহেশতের যুবকদের সর্দার। রাসুল বলেছেন, হুসাইন হচ্ছে তোমাদের হেদায়েতের প্রদীপ। তাকে যে কারবালার ময়দানে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল।
সুরা বুরুজের শেষ দিকে এসেছে, যারা বিশ্বাসী নর-নারীকে বিপদাপন্ন করেছে এবং পরে তওবা করে নি তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি এবং দহন যন্ত্রনা। এখানে আল্লাহ পাক ইয়াজিদি বাহিনীর ওপর সতর্ক বাণী উচ্চারণ করেছেন।
এসব আয়াত আমাদেরকে প্রমাণ করে যে পবিত্র কুরআনে শোক পালনের নমুনা রয়েছে।
সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ। পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো।

রেডিও তেহরান: জনাব এমকে আনোয়ার কবির আপনার কাছে জানতে চাইব- আল্লাহর ওলিদের জন্য বিশেষ করে শহীদ সম্রাট ইমাম হুসাইন(আ.)সহ কারবালার শহীদদের জন্য শোক প্রকাশ কি বৈধ? এর প্রয়োজনীয়তার পক্ষে কী কোনো যুক্তি রয়েছে?
একেএম আনোয়ার কবির: আল্লাহর পথে পূর্ববর্তী অনেক নবী রাসূল নিহত হয়েছেন এবং তাদের সাথে থাকা অনেক ঐশীপুরুষও নবী রাসূলদের পথে নিজেদের জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছেন সে কথাটি পবিত্র কুরআনের সুরা আল ইমরানের ১৪৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক উল্লেখ করেছেন।
আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে পূর্ববর্তী নবী-রাসূলদের ব্যাপারে এই সুরার মধ্য দিয়ে স্মরণ করলেন।
পূর্ববর্তী নবীদের মধ্যে অনেক নবী এবং তাদের অনুসারীরা আল্লাহ পাকের অনুগত ছিলেন এবং আল্লাহর দ্বীনকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। আল্লাহপাক তাঁদের কথা পবিত্র কুরআনে স্মরণ করেছেন।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বারবার আমাদেরকে- নবীদের জন্মদিন এবং তাদের আত্ম বিসর্জনের কথা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করে বিষয়গুলোকে আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন।
এ থেকে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, যারা আল্লাহর পথে নিজেদেরকে উসর্গ করেছেন সে বিষয়কে যাতে আমরা স্মরণে রাখি। তাদের স্মরণকে আমাদের মধ্যে জাগ্রত রেখে তারা আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠার জন্য যা যা করেছেন আমরা যেন সেই একই ভূমিকা পালন করি।

রেডিও তেহরান: জ্বি জনাব আনোয়ার কবির, মহান আল্লাহর ওলিদের জন্য শোক প্রকাশ সম্পর্কে আপনি পবিত্র কুরআন থেকে চমৎকার দুটি যুক্তি উপস্থাপন করলেন। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআন থেকে আরো কোনো যুক্তি বা প্রমাণ থাকলে তা তুলে ধরুন।
একেএম আনোয়ার কবির: আমি শোকানুষ্ঠানের বিষয়টির প্রতি আলোকপাত করতে চাই। অনেকের ধারণা যে ইসলাম বোধহয় কান্নাকাটিকে সমর্থন করে না। ইসলাম এসব বিষয়কে প্রশ্রয় না দিয়ে বরং তা মানুষের দুর্বল দিক বলে গণ্য করে। তবে আমরা পবিত্র কুরআনে ঠিক এর বিপরীত চিত্র লক্ষ্য করি। কুরআনের ৩০ পারার একটি সুরা ‘তাকভীর’। এই সুরায় কিয়ামতের ভয়াবহতা তুলে ধরার সময় আল্লাহ বলছেন, জীবন্ত কবর দেয়া কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে কি অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছে?
তাহলে আজ আমাদের প্রশ্ন- কারবালায় ইমাম হুসাইনের শিশু পুত্রকে কী হত্যা করা হয় নি? আল্লাহ পাক একজন মূর্তি পূজারী বা মুশরেকের কন্যার হত্যার জন্য যখন এতটা ব্যাকুতি প্রকাশ করছেন। ওই বিষয়টিকে স্মরণ করে আল্লাহ বলছেন ওই কাজটি কত বড় অপরাধের কাজ হয়েছে! পবিত্র কুরআনে সেই অপরাধটাকে আল্লাহ পাক তুলে ধরেছেন যাতে কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিটি মানুষ মনে রাখে। মনুষত্বের দাবি হচ্ছে একটা কাফের বা মুশরিকের সন্তানদেরকেও যেন কেউ এভাবে হত্যা না করে।

রেডিও তেহরান: জনাব আনোয়ার কবির! আপনি মহান আল্লাহর ওলিদের জন্য শোক প্রকাশ করা সম্পর্কে সুরা তাকভিরের কয়েকটি আয়াতের চমৎকার দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের অন্য কোনো সুরার কোনো আয়াতের দৃষ্টানত থাকলে তাও শ্রোতাদের জন্য তুলে ধরার আহ্বান জানাচ্ছি।
একেএম আনোয়ার কবির : এরপর পবিত্র কুরআনের যে আয়াতটির কথা আমি উল্লেখ করতে চাই সেটা হচ্ছে সুরা ‘বুরুজ’। কুরআনের ৩০ পারার অপর এই সুরাটিতে বলা হয়েছে,’ ধ্বংস হয়েছে কুণ্ডের অধিপতিরা।
ঘটনায় বর্ণিত হয়েছে, অতীতের কোনো এক অত্যাচারী শাসক কয়েকশত মুমিনকে একটি গর্তের মধ্যে ফেলে দিয়ে জীবন্ত দগ্ধ করেছে। আল্লাহ পাক শপথ করে বলছেন যে, কুণ্ডের অধিপতিরা ধ্বংস হয়েছিল। ওই অধিপতিরা কুণ্ডের মধ্যে মুমিনদের দগ্ধ করছিল এবং তারা নিজেরা ওপরে বসে তা প্রত্যক্ষ করছিল। ওইসব অধিপতিরা মুমিনদের ওপর জঘন্য এমন অত্যাচার চালিয়েছিল এইজন্য যে তারা মহান আল্লাহকে বিশ্বাস করত।
কারবালায় কি এধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেনি। রাসুলের দৌহিত্য ইমাম হুসাইন (আ.) সম্পর্কে তিনি কি বলেননি‘ হুসাইন হচ্ছে বেহেশতের যুবকদের সর্দার। রাসুল কি বলেন নি, হুসাইন হচ্ছে তোমাদের হেদায়েতের প্রদীপ। তিনি নুহের তরীর সমতূল্য! রাসুল (সা.) তার উম্মতদের এতকিছু বলার পরও আমরা কী করেছি! ইমাম হুসাইন(আ.)’র চেয়ে পূর্ণ মুমিন হিসেবে আমরা কাকে কল্পনা করতে পারি! আর সেই ব্যক্তিকে সেদিন কারবালায় নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে।
এই সুরার শেষ দিকে এসেছে, যারা বিশ্বাসী নর-নারীকে বিপদাপন্ন করেছে এবং পরে তওবা করে নি তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি এবং দহন যন্ত্রনা। এখানে আল্লাহ পাক ইয়াজিদি বাহিনীর ওপর সতর্ক বাণী উচ্চারণ করেছেন।
এসব আয়াত আমাদেরকে প্রমাণ করে যে পবিত্র কুরআনে শোক পালনের নমুনা রয়েছে।
আমাদের পূর্ববর্তীতে যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়েছেন, নিজেদের জীবন বিসর্জন দিয়েছেন, আল্লাহর দ্বীনকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ভূমিকা পালন করেছেন তাদেরকে অবশ্যই স্মরণ করতে হবে। তাদের জন্য অবশ্যই শোক পালন করতে হবে। আর পবিত্র কুরআনই আমাদেরকে এই শিক্ষাদান করে।
রাসুল (সা.) পর ইসলামের যে অবস্থা হয়েছিল অর্থাৎ পরপর চারজন খলিফার শাসনামলের শেষ দিকে যখন মুয়াবিয়া ক্ষমতায় এসে ইসলামের খেলাফত ব্যবস্থাকে রাজতন্ত্রে পরিণত করল।
এরপর সে তার এক সন্তান যে আল্লাহর নির্দেশিত হালালকে হারাম এবং হারামকে হালালে পরিণত করল। ওই সন্ত্রান মদপান করত, ব্যাভিচারী ছিল তাকে ইসলামের খলিফা হিসেবে; রাসুলের খলিফা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করল।
মুয়াবিয়ার সেই সন্তান যখন ইসলামের নামে অন্যায় অবিচার ও অনাচার সমাজে প্রচার করতে শুরু করে তখন তার প্রতিবাদে ইমাম হুসাইন (আ.) তার প্রতিবাদ করেন।
ইমাম হুসাইন(আ.) তার পূর্ববর্তী নবীদের মিশনকে বাস্তবায়নের জন্য প্রতিবাদের ভূমিকা পালন করেন। আল্লাহর নবীরা এসেছেন পৃথিবীতে যাতে আল্লাহর বিধিবিধান শতভাগ কার্যকর হয় সেজন্য। আর সেই মিশন যাতে পরিপূর্ণভাবে পৃথিবীর বুকে বাস্তবায়িত হয় সেজন্য ইমাম হুসাইন(আ.) পৃথিবীর বুকে সংগ্রাম করে গেছেন।
ফলে ইমাম হুসাইনের সেই আন্দোলনকে যদি আমরা আমাদের নিজেদের জীবনে বারবার স্মরণ করি তাহলে পৃথিবীর বুকে আজও যারা অত্যাচারী, যারা নিজ স্বার্থে ইসলামের বিধি বিধানকে তুচ্ছ করছে অবমাননা করছে তাদের বিরুদ্ধে একটা সচেতনা তৈরি হয়।
আজকের অত্যাচার ও অনাচারের সাথে জড়িত সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যারা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। হত্যা ও অন্যায় অবিচারের সাথে যারা সম্পৃক্ত তাদের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সচেতন করে তোলে।
ইমাম হুসাইননের স্মৃতিকে আমরা যদি জাগ্রত রাখি তাহলে আমাদের মধ্যে তাদের সেই জেহাদের প্রেরণা সৃষ্টি হতে পারে। ইসলামের বর্তমানের মূল শক্র যারা রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করতে সহায়তা করবে।#


আপনার মন্তব্য প্রেরণ করুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ফিল্ডসমূহ * এর মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে

*

quds cartoon 2018
We are All Zakzaky