সিরিয়া-ইসরাইল সামরিক ভারসাম্য ও S-300 মিসাইল

সিরিয়া-ইসরাইল সামরিক ভারসাম্য ও S-300 মিসাইল

S-300 সরবরাহের মাধ্যমে শুধু সিরিয়া নয়। ইরান, হিজবুল্লাহ, ইরাক, ইয়েমেন, লেবাননও পরোক্ষভাবে অনেক উপকৃত হবে।

আবনা ডেস্কঃ সামরিক বিশ্লেষকদের মতে রাশিয়ান S-300 বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্য বিশেষত সিরিয়া-ইসরাইল বর্তমান সামরিক ভারসাম্য বদলে দিবে। সিরিয়াও তার সামরিক দূর্বলতা ঘুচানোর জন্য গত কয়েক দশক ধরে S-300 অর্জনের চেষ্টা করে আসছিল। ২০১৩ সালে ইসরাইল-আমেরিকা অনুরোধ ও চাপপ্রয়োগ করে সিরিয়ায় S-300 সরবরাহ থেকে রাশিয়াকে বিরত রাখে। কয়েক মাস আগেও রাশিয়া সিরিয়াকে S-300 এয়ারডিফেন্স মিসাইল সিস্টেম সরবরাহ করার ঘোষণা দিয়েছিল। সেই সময়ও ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী ঝটিকা সফরে রাশিয়ায় গিয়ে অনেক অনুরোধ করে, হয়তো বিনিময়ে মূল্যবান কিছু দিয়ে সেটা স্থগিত করেছিল। ২৪ সেপ্টেম্বর রাশিয়া ঘোষণা দেয়, তারা সিরিয়া কে S-300 সরবরাহ করবে। এরপরেও ইসরাইল-আমেরিকা প্রাণান্তকর চেষ্টা চালায়, সেটা স্থগিত করার জন্য। ভয়, হুমকি বা লোভ দেখানো সবই করা হয়েছে এই অল্পসময়ের ভিতরে। শেষ মূহুর্তে একটি ইসরাইলী প্রতিনিধি দল রাশিয়া সফরে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করলেও তাতে রাজি হয়নি রাশিয়া। অবশেষে সিরিয়ায় S-300 এয়ার ডিফেন্স মিসাইল সিস্টেম সরবরাহ সম্পন্ন করেছে রাশিয়া।

এটা পরিষ্কার, সিরিয়ার হাতে S-300 থাকলে তার অনেক সুবিধা হবে। তেমনই ইসরাইলের অনেক ক্ষতি হবে বা অতীতে ভোগ করা অনেক বড় সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। আসলে কি সেটা? সেই দিকগুলো একটু ভেবে দেখা যাকঃ

 -সিরিয়ান এয়ারডিফেন্স ফোর্সে এখন যে বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আছে তার মধ্যে শুধুমাত্র SA-17 Buk-m2 এবং SA-22 কে আধুনিক বলা যায়। এদের রেঞ্জ বেশ সীমিত। SA-22 মাত্র ২০ কিলোমিটার এবং SA-17 Buk-m2 ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোটামুটি মোকাবেলা করতে পারে। কিন্তু রাশিয়া এখন S-300 মিসাইল সিস্টেমের যে ভার্সন সরবরাহ করছে তার রেঞ্জ ২৫০ কিলোমিটার যা SA-17 Buk-m2 এর ৫ গুণ।

 -গতি, ম্যানুভারবিলিটি, বিধ্বংসী ক্ষমতা, ইলেক্ট্রনিক যুদ্ধের ক্ষমতা এবং কার্যকরীতা বহুগুণ বেশি। ইসরাইলী বিমানবাহিনীর মেরুদণ্ড ৪র্থ প্রজন্মের এফ-১৬, এফ-১৫ এখন S-300 এর সামনে দাঁড়াতেই পারবেনা, এমনটাই ধারণা সামরিক বিশ্লেষকদের। শুধুমাত্র ৯টা ইসরাইলী এফ-৩৫ কিছুটা লড়াই করতে পারবে হয়তো, কিন্তু সেটা নিয়েও অনেকের সন্দেহ আছে। কারণ S-300 সিস্টেম কয়েক ধরনের মিসাইল ব্যবহার করে থাকে যাদের রেঞ্জ ৪০-৪০০ কিলোমিটার পর্যন্ত (যেমন S-300v4 ভার্সনের রেঞ্জ ৪০০কিলোমিটার)। তেমনি একটা S-300 সিস্টেমে রাডারও থাকে অনেক ধরনের এবং অনেকগুলো, যার মধ্যে এন্টি-স্টিলথ রাডার অন্যতম । আর সিরিয়ায় রাশিয়া শুধু একটা বা কয়েকটা S-300 সিস্টেমই দিচ্ছেনা, দিচ্ছে একটা শক্তিশালী নেটওয়ার্ক যেটা অনেকগুলো এবং অনেক ধরনের রাডার সমৃদ্ধ হবে। সাথে থাকবে শক্তিশালী জ্যামার যা মিসাইল ছাড়াই শত্রুর স্যাটেলাইট, রাডার, বিমানের কম্পিউটার ও ইলেক্ট্রনিক সিস্টেম, গাইডেড বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র কে জ্যাম করে দিতে এমনকি স্থায়ী ভাবে নষ্ট করে দিতেও পারে। এফ-৩৫, S-300 এর ১০০-১৫০ কিলোমিটারের মধ্যে চলে আসলে তার সনাক্ত হবার অত্যন্ত সম্ভাবনা রয়েছে।

 -ইসরাইলের বিমানবাহিনীর জন্যই সামরিক ভাবে অজেয় হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিল বিগত দশকগুলোতে। কিন্তু ইসরাইলের একটা বড় দূর্বলতা আছে, সেটা হলো এর আয়তন ও আকাশসীমা অত্যন্ত ক্ষুদ্র। সিরিয়ার S-300 এর রেঞ্জের মধ্যেই থাকবে ৭০% ইসরাইলি আকাশসীমা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিগুলো। এখন তারা নিজের আকাশসীমাতেই ঘোর অনিরাপদ এবং করুণার পাত্র। ঘাঁটি থেকে ফ্লাই করা মাত্রই S-300 এর ভয়ংকর রেঞ্জের মধ্যে পড়ে যাবে। ফলে সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ বিমানবাহিনী যুদ্ধকালীন সময়ে স্থল ও নৌবাহিনীকে কোন সাহায্যই করতে পারবে না, সিরিয়ার আকাশসীমায় অবলিলায় প্রবেশ তো অনেক পরের কথা। এতে করে ইসরাইলী বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে আতংকের বদলে দূর্বল প্রতিপক্ষ হিসাবে আবির্ভূত হবে। বিমান বাহিনীর সাপোর্ট পেয়েও ২০০৬ সালে লেবাননে এবং ২০১৪ সালে গাজায় কতটা নাস্তানাবুদ হয়েছে সেটা অনেকেরই জানা। পরের লেবানন যুদ্ধে সিরিয়ান S-300 যদি লেবানন কে সাপোর্ট দিতে শুরু করে অবস্থা কত করুণ হতে পারে সেটা নিয়ে অনেক সময় ভাবতে হবে। আর সিরিয়া, লেবানন, ইরানের সম্মিলিত হামলার কথা বাদই দিলাম।

 -বিমানবাহিনী অকার্যকর হয়ে গেলেও ইসরাইল হয়তো চেষ্টা করবে ক্রুজ মিসাইল এবং ব্যালেস্টিক মিসাইল দিয়ে হামলা চালাতে। কিন্তু S-300 কে পৃথিবীর অন্যতম সেরা মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমও বিবেচনা করা হয়। আগেই বলেছি অনেক ধরনের মিসাইল ব্যবহার করে এই সিস্টেম, সেটা ভিন্ন ভিন্ন টার্গেটের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ভিন্ন ভিন্ন মিসাইল। ধারণা করা হচ্ছে সিরিয়ায় অবস্থিত রাশিয়ান S-400 এবং A-50 বিমানসহ সম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক এর সাথে যুক্ত থাকবে সিরিয়ান এয়ারডিফেন্স নেটওয়ার্ক।

 অনেকের ধারনা সিরিয়ানরা S-300 এর মত উন্নত সিস্টেম অপারেট করতে অক্ষম। কিন্তু সিরিয়ায় এয়ারডিফেন্সের উপর অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া হয়। ১৯৬৯ সাল থেকেই এয়ারডিফেন্স নামে আলাদা একটা বাহিনীই গঠণ করা হয়েছে যার সৈন্য সংখ্যা সিরিয়ান বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর মোট সৈন্য সংখ্যার চেয়েও অনেক বেশি। এই বাহিনী Buk-M2, SA-22 অপারেট করতে পারলে কেন S-300 অপারেটর করতে পারবেনা? সিস্টেম উন্নত হলে কি সেটা অপারেট করাও জটিল হয়? আমি তো জানি উন্নত ও আধুনিক সফটওয়্যার ও যন্ত্রগুলো আরো বেশি ইউজার ফ্রেন্ডলি করে তৈরি করা হয়। এছাড়া সিরিয়ান ক্রুরা রাশিয়ায় পর্যাপ্ত ট্রেনিং পেয়েছে S-300 অপারেটের। খুব জটিল স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে রাশিয়ান ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞ বা ক্রু নিয়োগ দেয় সিরিয়ানরা এবং সেই ইতিহাস সিরিয়ায় ও মধ্যপ্রাচ্যে বহু পুরাতন।

 S-300 সিস্টেমে হামলা করে ধ্বংস করে দিবে ইসরাইল এমন ধারণা আছে অনেকের। তেমনটা হলে রাশিয়ার অস্ত্রবিক্রিতে বড় ধ্বস নামতে পারে সেটা রাশিয়ানরা খুব ভালোই জানে। সেইভাবেই দিচ্ছে তারা, জ্যামার, অতিরিক্ত Buk-M2, SA-22 সহ। একটা S-300 সিস্টেম, মিসাইল ছাড়াও শত্রুর এন্টি-রেডিয়েশন মিসাইলকে বিভ্রান্ত করে দেবার ক্ষমতা রাখে।

 কয়েকমাস আগে আমার একটা কথা মনে হয়েছিল, "ইসরাইলের কাছে আমেরিকার চেয়েও বহুগুণ গুরুত্বপূর্ণ দেশ রাশিয়া।" কথাটা শুনে খুব অবাক হলেন? আজ যে S-300 ইসরাইলের শত্রুর কাছে সরবরাহ করে ইসরাইলী সামরিক অহংকারকে আর্তনাদে পরিণত করে দিল। এরপর যদি আরো উন্নত S-400 মিসাইল সরবরাহ করে? গ্রাউন্ড টার্গেটে আঘাত করার জন্য SS-26 বা হাইপারসরিক ক্রুজ মিসাইল ব্রহ্মাস সরবরাহ করে? যাদের ব্যাপক হামলা আটকানোর সামর্থ্য ইসরাইলের নাই। তাহলে কি এখনকার ইসরাইল-সিরিয়ার লড়াই ঠিক বিপরীতধর্মী হয়ে যাবে না?

 আমরা যে ইসরাইলকে অনেক দক্ষ, চৌকশ, প্রযুক্তিতে উন্নত অজেয় বাহিনী ভেবে বিস্মিত হই তার কতটা কৃতিত্ব ইসরাইলের নিজের প্রাপ্য? আসলে আমেরিকা ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী চক্রের মধ্যপ্রাচ্যে নিযুক্ত চৌকিদারের নাম ইসরাইল। যাকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ, অস্ত্র ও প্রযুক্তি সাহায্য দিয়ে এই অবস্থায় ধরে রাখা হয়েছে। শুধু তাই না, ইরান, সিরিয়া, নিজের টাকায় যা অবলীলায় কিনতে পারে, সেখানেও তার প্রভুরা বাধা দেয় । এভাবেই ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র ছিল এতো দিন, যেটা এখন আর নাই।

 S-300 সরবরাহের মাধ্যমে শুধু সিরিয়া নয়। ইরান, হিজবুল্লাহ, ইরাক, ইয়েমেন, লেবাননও পরোক্ষভাবে অনেক উপকৃত হবে।

 ***Mostak Ahmed এর ফেইসবুক পেজ থেকে সংগৃহিত


আপনার মন্তব্য প্রেরণ করুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ফিল্ডসমূহ * এর মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে

*

Pesan Haji 2018 Ayatullah Al-Udzma Sayid Ali Khamenei
We are All Zakzaky