সিরিয়ায় মার্কিন হামলা লাশ ফেলে রাজনীতি করার উৎকৃষ্ট নমুনা: বিশ্লেষক

সিরিয়ায় মার্কিন হামলা লাশ ফেলে রাজনীতি করার উৎকৃষ্ট নমুনা: বিশ্লেষক

সিরিয়ায় রাসায়নিক হামলায় আসলে কারা জড়িত? এ সংক্রান্ত অভিযোগের তথ্য ও ছবি কতটা সত্য ও কতটা বানোয়াট?

আবনা ডেস্ক: সিরিয়ায় রাসায়নিক হামলায় আসলে কারা জড়িত? এ সংক্রান্ত অভিযোগের তথ্য ও ছবি কতটা সত্য ও কতটা বানোয়াট?
সিরিয়ায় রাসায়নিক হামলায় আসলে কারা জড়িত? এ সংক্রান্ত অভিযোগের তথ্য ও ছবি কতটা সত্য ও কতটা বানোয়াট?
সিরিয়ায় সাম্প্রতিক মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক ও চলতি ঘটনা বিষয়ের বিশ্লেষক এবং বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ মুনীর হোসেন খানের একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার প্রচারের উদ্যোগ নিয়েছে রেডিও তেহরান।
ওই সাক্ষাৎকারটির বিবরণ এখানে তুলে ধরা হলো:
প্রশ্ন: সম্প্রতি সিরিয়ার একটি বিমান ঘাঁটিতে প্রায় ৬০ টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে মার্কিন যুদ্ধ-জাহাজ। এ ঘটনাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
মুনীর হোসেন খান: দেখুন আমার মতে এই ঘটনা সিরিয়া সংক্রান্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরাট বড় ভুল ও স্ব-বিরোধিতামূলক নীতি-অবস্থানেরই প্রমাণ।
‘আগের মতো আসাদকে সরানোটা যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার নয় এবং আসাদ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকবে কিনা তা নির্ধারণ করবে সিরিয়ার জনগণ’ – এই ছিল অল্প কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও মন্তব্য। কিন্তু এখন ঠিক বিপরীত বক্তব্য রাখছেন মার্কিন সরকারের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা।
সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশের বিদ্রোহী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত খান শাইখুন শহরে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের কথিত ঘটনায় বেশ কিছু সংখ্যক অধিবাসীর মৃত্যু হলে কোন ধরণের তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়াই মার্কিন সরকার দাবি করে যে, বাশার আল আসাদ সরকারের সেনাবাহিনীই উক্ত রাসায়নিক হামলা চালিয়েছে! আর এই দাবির আলোকে অতি সম্প্রতি তাদের বক্তব্য হচ্ছে: এখন আসাদকে ক্ষমতা থেকে সরানোই ট্রাম্প প্রশাসনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার!
মার্কিন নীতির এই বিস্ময়কর ডিগবাজির আসল কারণ হল পূর্ববর্তী বক্তব্যে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো ক্ষুব্ধ হয়েছিল।
বেশ কয়েক মাস ধরে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধে সিরিয় আরব বাহিনীর অবস্থান অত্যন্ত ভালো। একের পর এক বিজয় ও সাফল্য অর্জন করছে সিরিয়ার সরকারী সেনাবাহিনী। তাই এ সময়ে রণাঙ্গনে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর ওপর রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের কোনো যৌক্তিকতাই নেই।
কারণ এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হবে বাশার আল আসাদ সরকারের জন্য খুবই বিপজ্জনক এবং তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সিরিয়ার ওপর হামলা চালানোর মহা-অজুহাত বা সুবর্ণ-সুযোগ যুগিয়ে দেবে। তাই চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের কাছাকাছি থাকার মত খুব ভালো অবস্থানে থেকেও আসাদ সরকার রাসায়নিক হামলার ঝুঁকি নেবেন- তার সরকারকে এমন বোকা ভাবাটা বালখিল্যতা ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।
প্রশ্ন: আপনি কেনো এটা বলতে চাচ্ছেন যে আসাদ সরকার কথিত রাসায়নিক হামলায় জড়িত নয়, আর কেনোই বা মার্কিন সরকার ও তার মিত্ররা আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে এ ধরনের হামলার অভিযোগ আনবে?
মুনীর হোসেন খান: এর কারণ আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি যে সিরিয় সেনাবাহিনী এবং আসাদ প্রশাসন নয় বরং নিশ্চিতভাবে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের রাজনৈতিক, কৌশলগত এবং প্রচারণামূলক ফায়দা উঠাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো। তাই গোপনে বিদ্রোহীদেরকে রাসায়নিক অস্ত্র দিয়ে তা ব্যবহারের মাধ্যমে বেশ কিছু নিরপরাধ জনতার লাশ ফেলে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, কৌশলগত- এমনকি সামরিক ফায়দাও ওঠাতে চাচ্ছে মার্কিন সরকার ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো। এরই জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হলো জাতিসংঘ ও এমনকি মার্কিন কংগ্রেসের অনুমতি না নিয়েই সিরিয় সরকার-নিয়ন্ত্রিত শাইরাত বিমান-ঘাঁটির ওপর সাম্প্রতিক মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। এটাই হচ্ছে লাশ ফেলে রাজনীতি করার এক উৎকৃষ্ট নমুনা।
কে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারকারী তথা দোষী পক্ষ - তা জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে তদন্ত করে খুঁজে বের না করেই জাতিসংঘ ও এমনকি মার্কিন কংগ্রেসের অনুমতি না নিয়েই সিরিয় সেনাবাহিনীর শাইরাত বিমান-ঘাঁটিতে এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রমাণ করছে যে সিরিয় সরকারি বাহিনী নয় বরং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোই রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারকারী।
যদি নিকি হ্যালি এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী না বলতেন যে বাশার আল আসাদকে ক্ষমতা থেকে সরানো মার্কিন প্রশাসনের অগ্রাধিকার নয় এবং আসাদ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকবেন কিনা তা নির্ধারণ করবে সিরিয় জনগণ; আর এ ধরণের মন্তব্য না করেই যদি রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা ঘটানো হত তাহলে হয়তো অনেক সরলমনা মানুষ বিশ্বাস করতে পারতেন যে বাশার আল আসাদই রাসায়নিক হামলাকারী, যদিও বিচক্ষণ ও চক্ষুষ্মান ব্যক্তিরা এরপরেও তা বিশ্বাস করবেন না। কিন্তু আগের মতো আসাদকে সরানোটা যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার নয়-- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এ বক্তব্যের পর উক্ত রাসায়নিক হামলা থেকে বোঝা যায় যে বাশার আল আসাদ ও সিরিয় সেনাবাহিনী নির্দোষ।
আর এছাড়াও স্বয়ং বাশার আল-আসাদ প্রশাসন, ইরান এবং রাশিয়া কর্তৃক রাসায়নিক হামলা সংক্রান্ত নিরপেক্ষ তদন্তের প্রস্তাব ও দাবীও আসাদ প্রশাসনের নির্দোষিতা প্রমাণ করছে।
সিরিয়ার যে বিমান-ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে সেই ঘাঁটিটা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো বিশেষ করে আই এসের বিরুদ্ধে বিমান আক্রমণের জন্য ব্যবহৃত হত এবং এখনও হচ্ছে। তাই রাসায়নিক আক্রমণের ধুয়ো তুলে সিরিয় সেনাবাহিনীর উক্ত ঘাঁটিতে এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা যে বিদ্রোহী জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো বিশেষ করে দায়েশ তথা আইএস বা সাবেক আইএসআইএল-এর জন্য কল্যাণ বয়ে এনেছে তা অতি সহজেই বোধগম্য। আর এ থেকেও প্রমাণিত হয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সমর্থিত আইএস তথা সাবেক আইএসআইএল ও জাবহাতুন নুসরার মত জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোই ইদলিবে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে।
প্রশ্ন: সিরিয়ার ওপর সাম্প্রতিক মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আরও কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে কী? কিংবা এটা কি এক ঢিলে বেশ ক’টি পাখি শিকারের মত পদক্ষেপ?
মুনীর হোসেন খান: কোনো কোনো ওয়াকিবহাল মহলের মতে ইদলিব প্রদেশের ‘খানশাইখুন’ অঞ্চলে সাম্প্রতিক রাসায়নিক হামলা আসলে উক্ত অঞ্চলে বিদ্রোহী সন্ত্রাসী জঙ্গিদের রাসায়নিক অস্ত্র নির্মাণ কারখানায় দুর্ঘটনাজনিত বিস্ফোরণ ছিল। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বিদ্রোহী সন্ত্রাসী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো নিজেদের এ অপরাধ ঢাকার জন্য উক্ত বিস্ফোরণকে বাশার আল আসাদ সরকার ও সিরিয় সেনাবাহিনীর ঘাড়ে চাপাতে চেয়েছে। এরই অংশ হিসেবে নানা কল্প- কাহিনী প্রচার করছে তারা।
আর এ কারণেই জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে তদন্তের আয়োজন এবং এর ফলাফলের অপেক্ষা না করে এবং জাতিসংঘের অনুমতি ছাড়াই এমনকি মার্কিন কংগ্রেসেরও অনুমোদন না নিয়েই ট্রাম্প প্রশাসন তড়িঘড়ি করে সিরিয় সেনাবাহিনীর বিমান-ঘাঁটি শুয়াইরাতে সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
আবার কারো কারো ধারণা, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয়ে কথিত রুশ সংযোগ ও সম্পৃক্ততাকে ভুল প্রমাণ করার জন্যও হয়তো মার্কিন প্রশাসন এ ধরণের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
আবার কারো কারো ধারণা, বিদ্রোহী জঙ্গি সন্ত্রাসীরাই তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে বা বোমা ফাটিয়ে এ ধরণের জঘন্য অপরাধের দায় সিরিয় সরকার ও সেনাবাহিনীর ওপর চাপাচ্ছে।
আবার এমন সম্ভাবনাও রয়েছে যে, অজ্ঞাত অজানা কোন বোমারু বিমান- যা হতে পারে তুরস্কের কোন সামরিক বিমান-ঘাঁটি থেকে আগত অথবা ইসরাইলী জঙ্গি বিমান- সেসব থেকে রাসায়নিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ বা বোমা বর্ষণ করে এ জঘন্য অপরাধ ঘটানো হয়েছে এবং আর তা বাশার আল আসাদ সরকারের কাজ বলে চাপিয়ে দিয়েছে মার্কিন সরকার।
সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশের খানশাইখুনে বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে সাম্প্রতিক রাসায়নিক হামলা এবং এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে সিরিয় সেনাবাহিনীর শুয়াইরাত বিমান-ঘাঁটিতে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বেশকিছু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকতে পারে। সংক্ষেপে বলা যায়:
প্রথমত: মিথ্যা রাসায়নিক হামলার অপবাদ আরোপ করে বিদ্রোহী সন্ত্রাসী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযানগুলোতে গত কয়েক মাস ধরে বিজয়ী সিরিয় আরব সেনাবাহিনীকে ভয়ংকর যুদ্ধাপরাধী বলে দেখানো এবং এভাবে বাশার আল আসাদ সরকারকে ক্ষমতায় থাকার অযোগ্য বলে প্রমাণ করা।
দ্বিতীয়ত: যুদ্ধে পরাজয় বরণকারী বিদ্রোহী জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হারানো মনোবল চাঙ্গা করা।
তৃতীয়ত: সন্ত্রাসীদের বিশেষ করে দায়েশ তথা আইএস বা সাবেক আইএসআইএল ও জাবহাতুন নুসরার বিরুদ্ধে সিরিয় সেনাবাহিনীর বিজয় ও অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করা এবং যুদ্ধে এসব বিদ্রোহী সন্ত্রাসী জঙ্গি গোষ্ঠী বিশেষ করে আইএসকে নিশ্চিত পরাজয় বরণ ও বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা।
চতুর্থত: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পর ললাটে নির্বাচনে জেতার পেছনে এ্যালেজড বা কথিত রুশ প্রভাব ও সম্পৃক্ততার যে অভিযোগ রয়েছে তা থেকে জনগণ ও প্রচারমাধ্যমগুলোর দৃষ্টি সরিয়ে এনে প্রমাণ করার চেষ্টা করা যে নয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রাশিয়ার দালাল ও ক্রীড়নক নয়।
পঞ্চমত: ঘরোয়া ক্ষেত্রে ট্রাম্প বিরোধী সংবাদ মাধ্যম ও মিডিয়ার কাছেও বিপাকগ্রস্ত ট্রাম্প প্রশাসনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো যার প্রমাণ হচ্ছে, সিরিয়ায় এই মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঠিক পরেই বেশকিছু প্রভাবশালী ট্রাম্প বিরোধী সংবাদ মাধ্যম ও মিডিয়া তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া এভাবে ব্যক্ত করে যে এইবার ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার গ্রহণযোগ্যতা লাভ করলেন।
ষষ্ঠত: বাশার আল আসাদ প্রশাসনকে ক্ষমতাচ্যুত করার পুরনো ইঙ্গ-মার্কিন-ইইউ-ইসরাইলী-সৌদি-কাতারি-আমিরাতি-তুর্কি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ বা অন্ততপক্ষে বাশার আল আসাদ প্রশাসনকে তীব্র বিপাকে ফেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অঘোষিত কোন বিকল্প লক্ষ্য ও অ্যাজেন্ডার বাস্তবায়ন।
সপ্তমত: বাশার আল আসাদ সরকার ও সিরিয় সরকারি সেনাবাহিনীকে সর্বদা তীব্র আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক চাপের মধ্যে রাখা এবং এ থেকে ফায়দা লুটা।
অষ্টমত: আসাদ বিরোধী তেল-সমৃদ্ধ ধনী আরব সরকারগুলো যেমন: সৌদি আরব, কাতার, আমিরাত ইত্যাদি সরকারকে খুশি ও আশ্বস্ত করে এদের কাছ থেকে সিরিয়ায় সাম্প্রতিক মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং অনুরূপ ভবিষ্যৎ আক্রমণ বাবদ সমুদয় খরচ আদায় করা তথা অর্থনৈতিক ফায়দা লুটা।
নবমত: সিরিয় সেনাবাহিনীর কতিপয় সামরিক অবস্থানের ওপর ইসরাইলের সাম্প্রতিক ব্যর্থ বিমান হামলার ঝাল মিটানো এবং প্রতিশোধ গ্রহণ করে বিদ্রোহী জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো বিশেষ করে জাবহাতুন নুসরা ও আইএসের বিরুদ্ধে সিরিয় আরব সেনাবাহিনীর গত কয়েক মাস ধরে চলে-আসা একের পর এক সাফল্য ও বিজয়ে ভীত সন্ত্রস্ত ইসরাইলের মনোবলকেও চাঙ্গা করা। ইসরাইল ওই হামলা চালাতে গিয়ে সিরিয় বিমানবিধ্বংসী ব্যবস্থার হাতে দুটো জঙ্গি বিমান হারিয়েছিল।
দশমত: এ হামলা সংক্রান্ত বাশার আল আসাদ সরকার, ইরান ও রাশিয়ার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার ধরণ, স্বরূপ, প্রকৃতি ও মাত্রা কেমন হয় তা দেখা এবং এর ভিত্তিতে সিরিয়া ও অত্র এলাকা এমনকি স্বয়ং ইরান ও রাশিয়ার ব্যাপারেও ভবিষ্যৎ কৌশলগত ও সামরিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তার ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণ।
প্রশ্ন: সিরিয়ায় বেসামরিক জনগণের ওপর রাসায়নিক হামলার অভিযোগ অতীতেও শোনা গেছে। পাশ্চাত্য এ অভিযোগ করেছিল বাশার আসাদ সরকারের বিরুদ্ধেই। কিন্তু পরে জাতিসংঘের তদন্তে দেখা গিয়েছিল যে বিদ্রোহীরাই ওই হামলা চালিয়েছিল। সে সময় সিরিয়ার বিরুদ্ধে ওই অভিযোগ প্রচারের কী উদ্দেশ্য ছিল?
মুনীর হোসেন খান: স্মরণ করা যেতে পারে যে, ২০১৩ সালের আগস্টে যখন সিরিয় সেনাবাহিনী বিদ্রোহী সন্ত্রসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে রণাঙ্গনে একের পর এক সাফল্য অর্জন করেই চলছিল তখন সিরিয় সরকারী সেনাবাহিনীর এ বিজয়াভিযান ও অগ্রযাত্রা ঠেকানো এবং বিদ্রোহী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে বাঁচানোর লক্ষ্যে দামেস্ক নগরীর কাছে বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত শহরতলী ও পল্লী এলাকায় (রীফে দামেস্ক)রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে তা বাশার আল আসাদ সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বাশার আল আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার পাঁয়তারা করছিল।
কিন্তু জাতিসংঘের তদন্তকারী দলের কাছে প্রমাণিত হয় যে, বিদ্রোহীরাই দামেস্কের আশেপাশের শহরতলী ও পল্লী এলাকায় তথা ‘রীফে দামেস্ক’ অঞ্চলে রাসায়নিক অস্ত্র বা সারেইন গ্যাস ব্যবহার করেছে যেগুলো বিশেষ একটি দেশ থেকে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর কাছে সরবরাহ করা হয়েছিল। তাই হালে পানি না পাওয়ার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা তখন বাশার আল আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়েছিল।
প্রশ্ন: সিরিয়ার সংকট ছয় বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও শেষ হচ্ছে না। এর কারণটা কী? সিরিয়ার বিষয়ে নিজস্ব লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য পাশ্চাত্য ভবিষ্যতে আর কী কী পদক্ষেপ নিতে পারে? আর এ সংকটের পরিণতিই বা কী হতে পারে?
মুনীর হোসেন খান: সিরিয় সংকট ৬ বছর পরিয়ে এখন সপ্তম বর্ষে পদার্পণ করেছে অথচ পাশ্চাত্য অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের কাঙ্ক্ষিত কোন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আজও বাস্তবায়িত হয় নি। বাশার আল আসাদ সরকারের পতন ঘটেনি বরং দিনদিন তার অবস্থান দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হচ্ছে। পাশ্চাত্যের দেশগুলোসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ভাড়াটে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদেরকে এনে সিরিয়ায় দায়েশ, জাবহাতুন নুসরা, আহরারুশ শাম, ফ্রি সিরিয়ান আর্মি প্রভৃতি হরেক রকম ব্যানারের আওতায় সংঘবদ্ধ ও একত্রিত করে বিলিয়ন বিলিয়ন সৌদি, কাতারি, আমিরাতি পেট্রো-ডলার খরচ করেও সুদীর্ঘ সময় গত হয়ে যাওয়ার পরেও তেমন কোন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা তো অর্জিত হয় নি বরং তাকফিরি-সালাফি-ওয়াহহাবি সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের নিকষ কালো হিংস্র থাবা ব্রিটেন, ফ্রান্স, ব্রাসেলস, স্টকহোম, বার্লিন, ফ্রাঙ্কফুর্ট, ইস্তাম্বুল, আংকারা, সেন্ট পিটার্সবার্গ ও মস্কোসহ সমগ্র ইউরোপে প্রসারিত হয়ে আঘাতের পর আঘাত হানছে।
যে তাকফিরি-সালাফি-ওয়াহহাবি জঙ্গি সন্ত্রাসীদেরকে সিআইএ, এম আই সিক্স, মোসাদ তথা ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা ও বিভিন্ন পাশ্চাত্য দেশীয় গোয়েন্দা সংস্থার তত্ত্বাবধানে সৌদি আরব, কাতার, আমিরাত, জর্দান ও তুরস্কের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ইউরোপ থেকে ইরাক-সিরিয়ায় পাঠানো হয়েছিল আজ তারাই সিরিয়া ও ইরাকে পরাজয় ও ব্যর্থতার গ্লানি, রাগ, ক্ষোভ ও দুঃখ নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোয় ফিরে গিয়ে নাশকতামূলক সন্ত্রাসী তৎপরতা চালিয়ে অগণিত মানুষের রক্ত ঝরাচ্ছে। ইউরোপের বিগত মাসগুলোর এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলী এরই চাক্ষুষ ও জাজ্বল্য দৃষ্টান্ত ও প্রমাণ। আজ গোটা ইউরোপ ইঙ্গ-মার্কিন-ফরাসী-ইসরাইলী-আরবি (সৌদি-কাতারি-আমিরাতি-জর্দানি)-তুর্কী(এর্দোগানি) শাসক-চক্রের লালিত পালিত সন্ত্রাসবাদ জঙ্গিবাদ কবলিত হয়ে ভয়ংকর নিরাপত্তাহীনতা, ত্রাস ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে গেছে। এ অবস্থা আর কাহাঁতক সহ্য করা যায়? তাই এর দ্রুত নিষ্পত্তি ও বিহিত করার জন্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা সিরিয়া ইরাক সহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় এই সন্ত্রাসী জঙ্গিদের ক্ষমতায়নের চূড়ান্ত চেষ্টা যে চালাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। সম্ভবতঃ সিরিয়ায় সাম্প্রতিক রাসায়নিক অস্ত্র ব্যাবহারের ধুয়ো তুলে সেদেশের সরকার নিয়ন্ত্রিত শুয়াইরাত বিমান-ঘাঁটিতে বর্বর মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই করা হয়েছে।
এখন দেখার বিষয় যে ট্রাম্প কি ক্ষ্যাপা পাগলা কুত্তার মতো হিতাহিত কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়ে মারণ কামড় দেবেন? তবে যেটাই হোক না কেন সিরিয়ার ত্যাগী জনগণ, দৃঢ়-প্রত্যয়ী বাশার আল আসাদ সরকার এবং সেদেশের বীর সেনাবাহিনী সফল প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে এবারও ইঙ্গ-মার্কিন-ফরাসি-ইইউ-ইসরাইলি-আরবি-তুর্কী ভণ্ড-শয়তানি-মুনাফেকি- কুফরি জোটের চক্রান্ত ধূলিসাৎ করে দেবে ইনশাআল্লাহ।#


আপনার মন্তব্য প্রেরণ করুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ফিল্ডসমূহ * এর মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে

*

Arba'een
Mourining of Imam Hossein
Pesan Haji 2018 Ayatullah Al-Udzma Sayid Ali Khamenei
We are All Zakzaky