নিস ট্রাজেডি’র পর;

ওলাঁদ ও ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে মাজমা’র মহাসচিবের খোলা চিঠি

  • News Code : 767038
  • Source : ABNA
Brief

ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে লেখা খোলা চিঠিতে, তাকফিরি ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় তুলে ধরেছেন হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন আখতারি।

হলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা –আবনা-: ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ ও ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে লেখা এক খোলা চিঠিতে, আন্তর্জাতিক ও তাকফিরি সন্ত্রাসবাদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় উল্লেখ করেছেন আহলে বাইত (আ.) বিশ্বসংস্থা (মাজমা)’র মহাসচিব ।

চিঠিতে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন আখতারি, অমুসলিমদের জীবনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়ে পবিত্র কুরআনের নির্দেশ ও হযরত মুহাম্মাদ (স.) ও হযরত আলী (আ.) এর বাণীর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন: আরবি নামের অধিকারী হওয়া অথবা বাহ্যিক দৃষ্টিতে মুসলমান মনে হওয়ার অর্থ এই নয় যে, এ নৃশংসতার সাথে জড়িত ব্যক্তিরা ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী এ অপরাধে লিপ্ত হয়েছে। আর এ কথার পক্ষে সবচেয়ে স্পষ্ট যুক্তি হল, শত শত বছর ধরে বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীরা মুসলিম ভূখণ্ডগুলোতে শান্তিপূর্ণভাবে জীবন-যাপন করে আসছে।

চিঠির শেষে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ও ইউরোপের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন: অন্তত শিশু ও আপনাদের দেশের নিরীহ জনগণের জীবন রক্ষার্থে হলেও দ্বিমুখী আচরণ বর্জন করে লাগামহীন তাকফিরি সন্ত্রাসবাদের মোকাবেলায় নিজ দায়িত্ব পালন করুন।

জনাব আখতারি বলেন: প্রকৃত মুসলিম আলেমগণ এবং যে সকল ইসলামি দেশের সরকার ও সংস্থাগুলো সত্যিকার অর্থেই সন্ত্রাসবাদের মোকাবেলা করতে চায় এ ক্ষেত্রে তারা আপনাদের শ্রেষ্ঠ সহযোগী ও বন্ধু।

 

আহলে বাইত (আ.) বিশ্বসংস্থার মহাসচিবের খোলা চিঠি:

 

ফ্রান্সের মাননীয় রাষ্ট্রপতি, জনাব ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ!

ইউরোপের সরকার প্রধান, প্রধানমন্ত্রী এবং উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ!

ফ্রান্সের নিস শহরের মর্মান্তিক ঘটনায় আমি মর্মাহত; যাতে বহু নিরীহ লোক হতাহত হয়েছে এবং আমাকে এ চিঠি লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছে। শুরুতেই আমি নিজের এবং আহলে বাইত (আ.) বিশ্বসংস্থার শত শত সদস্য যারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তাদের সকলের পক্ষ থেকে এ সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানাই।

সাথে সাথে আপনাদের এবং এ হামলার শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করে মহান আল্লাহর দরবারে নিহতদের জন্য প্রশান্তি কামনা করছি।

এ ধরনের তিক্ত ঘটনা, যার প্রভাবে বেশ কিছু বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্য এবং ইসলামি দেশগুলোকে জর্জরিত, এখন আপনাদের দেশগুলোতেও পৌঁছেছে; গতকাল প্যারিস, ব্রাসেলস ও ওরল্যান্ডে আজ নিস-এ। আর মহান আল্লাহই জানেন আগামীকাল কোথায় ঘটতে যাচ্ছে। যেভাবে তাকফিরি সন্ত্রাসীরা হুমকি দিয়েছে, অতি শীঘ্রই রোম, লন্ডন, বার্লিন ও ভিয়েনার সড়কগুলোও কি দায়েশ (আইএসআইএল) ও আল-কায়েদার হামলায় রক্তে রঞ্জিত হবে? এহেন পরিস্থিতিতে একটি সুন্দর আগামীর আশা কি করা সম্ভব?

এ ধরনের ঘটনার নেপথ্য কারণ কি? এ সন্ত্রাসবাদের উৎপত্তিস্থল কোথায় যারা শিশুদের উপরও করুণা করে না? তারা কি মুসলমান? তাদের এ সকল (নৃশংস) পদক্ষেপ কোন চিন্তাধারা থেকে উৎসারিত? তারা অর্থ ও অস্ত্র কোথায় পায়?

 

জনাব ওলাঁদ ও ইউরোপের সরকার প্রধানগণ!

যদিও আমি ভালভাবেই জানি যে, এর উত্তর আপনাদের জানা আছে, কিন্তু বিশ্বের সাধারণ মানুষের বিবেককে সামনে রেখে –যা বর্তমানে মর্মাহত ও সন্ত্রস্ত- ৫টি বিষয় এ চিঠিতে উল্লেখ করতে চাই:

 

প্রথম: আরবি নামের অধিকারী হওয়া অথবা বাহ্যিক দৃষ্টিতে মুসলমান মনে হওয়ার অর্থ এই নয় যে, এ নৃশংসতার সাথে জড়িত ব্যক্তিরা ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী এ অপরাধে লিপ্ত হয়েছে। কারণ এ কথার পক্ষে সবচেয়ে স্পষ্ট যুক্তি হল, শত শত বছর ধরে বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীরা মুসলিম ভূখণ্ডগুলোতে শান্তিপূর্ণভাবে জীবন-যাপন করে আসছে। পাশাপাশি শিয়া ও সুন্নি মাযহাবের আলেমদের পক্ষ থেকে এ ঘটনার নিন্দা এ বিষয়ের প্রমাণ যে, মুসলিম উম্মাহ তাকফিরিদেরকে নিজেদের থেকে আলাদা মনে করে।

পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট ভাষায় মানবাধিকার ও অমুসলিমদের জীবন রক্ষার বিষয়ে এভাবে বলে:

«لا ینهاکم الله عن الذین لم یقاتلوکم فی الدین و لم یخرجوکم من دیارکم أن تبروهم و تقسطوا إلیهم إن الله یحب المقسطین».

“দ্বীনের ব্যাপারে যাহারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে নাই এবং তোমাদেরকে স্বদেশ হইতে বহিস্কার করে নাই তাহাদের প্রতি মহানুভবতা প্রদর্শন ও ন্যায়বিচার করিতে আল্লাহ্ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। আল্লাহ্ তো ন্যায়পরায়ণদের ভালবাসেন।” (সূরা মুমতাহিনা : ৮)

আল্লাহর রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (স.) এ কাজ মুসলিম শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার শুরুতেই সম্পন্ন করেন এবং ঐতিহাসিক মদিনা সনদ প্রকাশের মাধ্যমে অমুসলিমদের জীবন, সম্পদ ও অধিকার রক্ষার কথা ঘোষণা দেন।

সকল মুসলমানদের নেতা ‘ইমাম আলী ইবনে আবি তালিব তার ঐতিহাসিক ফরমানে বিশ্বের সকল মুসলমানকে এ শিক্ষা দিয়েছেন যে, যেন তারা অন্যান্য ধর্ম ও আকিদার অনুসারীদের প্রতি সম্মান দেখায়। তিনি লিখেছেন:

«انهم صنفان اما اخ لک فی الدین او نظیرک فی الخلق».

‘তারা (মানুষ) হয় তোমার দ্বীনী ভাই অথবা সৃষ্টির দিক থেকে তোমার সদৃশ্য’

 

দ্বিতীয়: উল্লিখিত বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি রেখে বলতে চাই, আপনারা এ সকল ঘটনাকে যে ‘ইসলাম ধর্ম’ ও ‘মুসলিম উম্মাহ’র সাথে সম্পৃক্ত করেন এর কারণ কি? কেন জনাব ওলাঁদ এ ঘটনার পর একে পূনরায় ‘ইসলামি সন্ত্রাসবাদ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন? সন্ত্রাসী গোষ্ঠি দায়েশে’র তৎপরতার প্রথম দিন থেকেই আপনারা ইউরোপীয় সরকার প্রধানরা এবং আপনাদের শক্তিশালী গণমাধ্যম সন্ত্রাসী এ গ্রুপটিকে ‘ইসলামিক স্টেট’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং করছেন! অথচ বিশ্বের ১ শত কোটির বেশী মুসলমান এ সকল ব্যক্তিদের অপরাধী ও সন্ত্রাসী বল জানে; যারা ইসলাম ধর্ম ও মানবতার শিক্ষার কোন গন্ধও পায়নি।

 

তৃতীয়: যে সকল সন্ত্রাসী হামলা আপনাদের দেশগুলোতে ঘটছে, তা প্রতিনিয়ত আমাদের সাথী এবং আমাদের জনগণ যার আগুনে পুড়ছে তারই আংশিক প্রতিফলন মাত্র। যে দিনগুলোতে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ার শহরগুলোর মাটি নিরীহ মানুষের রক্তি রঞ্জিত হচ্ছিল সেদিন যদি আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোতে তাদের (সন্ত্রাসীদেরকে) প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করার পরিবর্তে তাদের মূলোৎপাটনের বিষয় নিয়ে ভাবতেন তবে আজ এ নৃশংসতা আপনাদের দ্বারগোড়ায় পৌঁছুতো না।

চতুর্থ: বিষয়টি আমাদেরকে অবাক করে যে, ফ্রান্স নিজেই যখন সন্ত্রাসী হামলার শিকার তখন কিভাবে এদেশের সরকার ‘মুনাফিকদের সন্ত্রাসী দল’কে সহযোগিতা করে?! প্যারিস ও নিস ট্রাজেডিতে প্রায় ৩০০ লোক প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু তারা বর্তমানে এমন একটি সন্ত্রাসী দলের সহযোগিতা করছে, যাদের হাত ১৭০০০ ইরানির রক্তে রঞ্জিত!

এরচেয়েও জঘন্য বিষয়টি হল, কিছুদিন পূর্বে সৌদি আরবের নিরাপত্তা বিষয়ক কর্মকর্তা ‘তুর্কি আল-ফায়সাল’কে সন্ত্রাসবাদের সমর্থনে তার দেশের রাজধানীতে বক্তব্য প্রদানের অনুমতি দেয়া হয়েছে; যে ‘তালেবান’, ‘আলকায়েদা’, ‘দায়েশ’, ‘বোকো হারাম’ ও ‘নুসরাহ ফ্রন্টে’র মত সন্ত্রাসী গ্রুপের জন্মদাতা! এক মুহুর্তের জন্য চিন্তা করুন, ইউরোপের নিরীহ জনগণের উপর নৃশংস এ হামলা ঐ ধরনের পদক্ষেপেরই ফসল নয় কি?

 

পঞ্চম: ওহাবিয়াত ও সালাফিয়াতে’র অমানবিক চিন্তা থেকে উৎস লাভকারী তাকফিরি সন্ত্রাসীরা ছোট ও বড়, পুরুষ ও নারী, সাদা ও কালো, ইউরোপীয় ও এশীয়, মুসলিম ও অমুসলিমের মাঝে কোন পার্থক্য রাখে না। তাকফিরি সন্ত্রাসবাদের নির্দিষ্ট কোন ধর্ম নেই; বরং ঐ সকল ব্যক্তিকে হত্যা করতে সিদ্ধহস্ত যাদের সাথে তাদের আকিদার মিল নেই।

যেহেতু ইস্যুটি গোটা বিশ্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই এই ধ্বংসাত্মক বিষয় থেকে পরিত্রাণ একমাত্র পথ হচ্ছে, বিশ্বের সকল দেশের উচিত একে সমূলে উৎপাটনের জন্য নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করা। এর জন্য সর্বপ্রথম সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর আর্থিক ও অস্ত্র সহযোগিতার সকল রাস্তা বন্ধ করতে হবে এবং তাদের সাথে যোগদানকারীদের পথরোধ করতে সীমান্তগুলো বন্ধ করে দিতে হবে।

আপনারা এবং আপনাদের দেশের গোয়েন্দা বিভাগগুলো ভাল করেই জানে যে, আলকায়েদা, দায়েশ ও নুসরা ফ্রন্টের হাজার হাজার সৈন্য কোন দেশ থেকে অর্থ পায়। কোন দেশ থেকে সামরিক ও যোগাযোগের প্রযুক্তি পেয়ে থাকে; এবং নিজেদের অপরাধ কর্মগুলো কোন মুফতি ও খতিবদের ফতওয়ার বলে বৈধতা দিয়ে থাকে।

ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ও ইউরোপের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ!

অন্তত শিশু ও আপনাদের দেশের নিরীহ নাগরিকদের জীবন রক্ষার্থে হলেও দ্বিমুখী আচরণ বর্জন করে লাগামহীন তাকফিরি সন্ত্রাসবাদের মোকাবেলায় আপনাদের দায়িত্ব পালন করুন –এ কথা উল্লেখ করে জনাব আখতারি বলেন: প্রকৃত মুসলিম আলেমগণ এবং যে সকল ইসলামি দেশের সরকার ও সংস্থাগুলো সত্যিকার অর্থেই সন্ত্রাসবাদের মোকাবেলা করতে চায় এ ক্ষেত্রে তারা আপনাদের শ্রেষ্ঠ সহযোগী ও বন্ধু।

ওয়াস সালামু আলা মানিত্তাবায়াল হুদা

মুহাম্মাদ হাসান আখতারি

মহাসচিব, আহলে বাইত (আ.) বিশ্বসংস্থা

১৫ই জুলাই ২০১৬


সম্পর্কিত প্রবন্ধসমূহ

আপনার মন্তব্য প্রেরণ করুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ফিল্ডসমূহ * এর মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে

*

پیام امام خامنه ای به مسلمانان جهان به مناسبت حج 2016
We are All Zakzaky
telegram