বৃটেনের সুপ্রিম কোর্টের রায়

  • News Code : 807325
  • Source : Mzamin
Brief

ব্রেক্সিট মামলার আপিলে হেরে গেছে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র সরকার। বৃটেনের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন ইউরোপ বিচ্ছেদের জন্য আর্টিকেল ৫০ কার্যকর করতে অবশ্যই পার্লামেন্টের অনুমোদন নিতে হবে।

আবনা ডেস্ক: ব্রেক্সিট মামলার আপিলে হেরে গেছে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র সরকার। বৃটেনের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন ইউরোপ বিচ্ছেদের জন্য আর্টিকেল ৫০ কার্যকর করতে অবশ্যই পার্লামেন্টের অনুমোদন নিতে হবে। পার্লামেন্ট অনুমোদন দিলেই ব্রেক্সিট নিয়ে অগ্রসর হতে পারবে সরকার। বৃটিশ সুপ্রিম কোর্ট বাংলাদেশ সময় গতকাল বিকাল সাড়ে তিনটায় এ রায় দিয়েছেন। আদালতের মোট ১১ জন বিচারকের মধ্যে ৮ জন এ বিষয়ক প্রস্তাব পার্লামেন্টে পাঠানোর পক্ষে মত দেন। তিন জন বিপক্ষে মত দেন। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিচারে সুপ্রিম কোর্টে করা আপিলে হেরে গেলেন তেরেসা মে। এখন তাকে ব্রেক্সিট কার্যকর করতে হলে অবশ্যই লিসবন চুক্তির আর্টিকেল ৫০ পার্লামেন্টে তুলতে হবে। পার্লামেন্ট যদি ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বৃটেনের বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে এ অনুচ্ছেদ সক্রিয় করতে ভোট দেয় তাহলেই তেরেসা মে ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবেন।
এ রায় ঘোষণার আগে অনেকবারই সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মার্চ মাস শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া শুরু করবেন তেরেসা মে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়ের ফলে এখন ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া কোনদিকে মোড় নেয় তা বলা মুশকিল। সুপ্রিম কোর্টের এ রায়ের সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া নিয়ে চ্যালেঞ্জ জানানো ব্যবসায়ী নারী গিনা মিলার। আপিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া ১১ বিচারকের সভাপতি ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রেসিডেন্ট লর্ড ন্যুবার্গার। তিনিই রায় ঘোষণা করে শোনান। এতে তিনি বলেন, বিচারকদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সরকারের করা আপিল প্রত্যাখ্যান করা হলো। এর পক্ষে ছিলেন লর্ড ন্যুবার্গার, লেডি হ্যালি, লর্ড ম্যান্স, লর্ড কের, লর্ড ক্লার্ক, লর্ড উইলসন, লর্ড সাম্পশন ও লর্ড হজ। বিরোধিতা করেন তিনজন বিচারক লর্ড রিড, লর্ড কার্নওয়াথ ও লর্ড হিউজ।
উল্লেখ্য, আদালতে ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার আগে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে নির্বাহী ক্ষমতাবলে ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবেন। এ জন্য তাকে পার্লামেন্টের অনুমোদন নেয়ার প্রয়োজন নেই। এমন পরিস্থিতিতে এ সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেন ব্যবসায়ী নারী গিনা মিলার। অন্যদের মধ্যে তাকে সমর্থন দেয় স্কটল্যান্ডের সরকার। তাতে বলা হয়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বৃটেনকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’কে অবশ্যই পার্লামেন্টের অনুমোদন নিতে হবে। তার এ চ্যালেঞ্জের পক্ষে রায় দেন লন্ডনের হাইকোর্ট। হাইকোর্ট থেকে বলা হয়, পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়া কোনোভাবেই ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবেন না তেরেসা মে। হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে বৃটিশ সরকার। ফলে ৫ই ডিসেম্বর থেকে চারদিন শুনানি হয় বৃটেনের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে। এরপর হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে গতকাল রায় দেন সুপ্রিম কোর্ট।
এ রায়ের মাধ্যমে ইইউ থেকে বৃটেনের আনুষ্ঠানিক প্রস্থান প্রক্রিয়া শুরুর কর্তৃত্ব তুলে দেয়া হলো পার্লামেন্টের আইনপ্রণেতাদের হাতে। সুপ্রিম কোর্ট এও জানিয়েছেন স্কটল্যান্ড, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড এবং ওয়েলসের ডিভলভড অ্যাসেমব্লির (ক্ষমতা হস্তান্তরিত সংসদ) সম্মতি নেয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না সরকারকে। আদালতের এ রায় ব্রেক্সিট কার্যকর করা নিয়ে তেরেসা মে’র পরিকল্পনার ওপর আঘাত হলেও, ডাউনিং স্ট্রিটের মুখপাত্র বলেছেন, রায়ে বৃটিশ জনগণের সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন আসে নি। তিনি আরো বলেছেন, ‘আমরা সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তকে শ্রদ্ধা করি। আর পার্লামেন্টে আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নিরূপণ করবো শিগগিরই।’ গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর মে’র পক্ষে যে বিষয়টা রয়েছে তা হলো কমন্স বা লর্ডস পার্লামেন্টের কোনো কক্ষেই ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া আটকানোর কোনো প্রবণতা নেই। তবে আদালতে ব্রেক্সিট বিল উপস্থাপনের পর সেখানে এসএনপি ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক দলের প্রস্তাবিত সংশোধনী না থাকতে দল দুটি এর বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারে। ওদিকে, আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া আটকানোর কোনো অভিপ্রায় বিরোধী লেবার দলের নেই। লেবার দলের নেদা জেরেমি করবিন বলেছেন, ‘আর্টিকেল ৫০ কার্যকর করার প্রক্রিয়ায় বাগড়া বাধাবে না তার দল’। তবে, সরকারের বিলে সংশোধনী আনার চেষ্টা করবে দলটি। করবিন বলেন, ‘লেবার সরকারের কাছ থেকে এমন একটি পরিকল্পনা দাবি করছে যেখানে সমঝোতার পুরো প্রক্রিয়া জুড়ে পার্লামেন্টের কাছে সরকারের জবাবদিহির আওতায় থাকবে। একইসঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তিতে পার্লামেন্টের অনুমোদনের নিশ্চিত করার জন্য অর্থবহ একটি ভোট চায় লেবার দল।’
লিবারেল ডেমোক্রেট দলের নেতা টিম ফ্যারন বলেছেন, চূড়ান্ত চুক্তিতে আইনপ্রণেতাদের ভোট দেয়ার নিশ্চয়তা না দেয়া হলে তার দল আর্টিকেল ৫০ সক্রিয় করার বিরুদ্ধে ভোট দেবে।
স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার নিকোলা স্টারজন বলেছেন, রায়ে দেখা গেছে ক্ষমতা বিকেন্দ্রিকরণ নিয়ে স্কটিশ সরকারকে যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তা কোনো গুরুত্ব পায় নি। তিনি আরোও বলেছেন, এরপরও স্কটিশ পার্লামেন্টের ভোট দেয়ার সুযোগ থাকবে আর্টিকেল ৫০ কার্যকর করা নিয়ে তারা সম্মতি দেবে কি না।
অ্যাটর্নি জেনারেল জেরেমি রাইট তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, সরকার সুপ্রিম কোর্টের রায় নিয়ে ‘হতাশ’ তবে তা মেনে চলবেন।
আদালতে ব্রেক্সিট নিয়ে চ্যালেঞ্জ জানানো ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম গিনা মিলার আদালতের রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘কোনো প্রধানমন্ত্রী, কোনো সরকারই জবাবদিহিতা মুক্ত থাকার প্রত্যাশা করতে পারে না। শুধুমাত্র সার্বভৌম হলো পার্লামেন্ট। আদালতের বাইরে রায়ের পর তিনি বলেন, ব্রেক্সিট আলোচনার জন্য সেরা পথপরিক্রমা নির্ধারণে সরকারকে এখন সহায়তা করার সুযোগ পেলেন এমপিরা।
সুপ্রিম কোর্টের প্রেসিডেন্ট লর্ড ন্যুবার্গার রায়ের মূল অংশ পড়ে শোনানোর সময় বলেন, ‘৮-৩ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দিচ্ছেন যে সরকার পার্লামেন্টের অনুমোদন ব্যতীত আর্টিকেল ৫০ কার্যকর করতে পারবে না। ১৯৭২ সালের ইউরোপিয়ান সম্প্রদায় আইনের সেকশন ২ মোতাবেক, ইইউ প্রতিষ্ঠানগুলো যখনই কোনো নতুন আইন প্রণয়ন করে তা ইউকে আইনের অংশ হয়ে যায়। অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ওই আইন ইইউ আইনকে ইউকে আইনের স্বতন্ত্র এক সূত্র বানায়; পার্লামেন্ট ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগ পর্যন্ত এটা এমনই থাকবে। ফলে, ইউকে যখন ইইউ চুক্তি থেকে প্রস্তান করবে, ইউকে আইনের একটি সূত্র বিচ্ছিন্ন হবে। এছাড়াও, ইউকে নাগরিকদের উপভোগ করা নির্দিষ্ট কিছু অধিকার পাল্টে যাবে। একারণে, সরকার পার্লামেন্টের অনুমোদন ব্যাতীত আর্টিকেল ৫০ কার্যকর করতে পারবে না।’ ন্যুবার্গার আরো বলেন, ‘গণভোটে প্রভাব রাখার জন্য আইনে কোনো পরিবর্তন আনতে হলে তা শুধুমাত্র ইউকে সংবিধানে অনুমোদিত পন্থায় করতে হবে; যেমন পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে। এ ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে অগ্রসর হওয়াটা হবে বিদ্যমান সাংবিধানিক মূল্যবোধের লঙ্ঘন যা অনেক শতাব্দী ধরে প্রচলিত রয়েছে।’
তেরেসা মে নেতৃত্বাধীন বৃটিশ সরকারের অনেক মন্ত্রী আগাম বুঝতে পারছিলেন যে আপিলের রায় তাদের বিপক্ষে আসবে। তবে, ৮-৩ ব্যবধানে পরাজিত হওয়াটা প্রত্যাশা করেন নি তারা। সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ের বিপক্ষে মত দেয়া তিন বিচারক লর্ড রিডস, কার্নওয়াথ এবং হিউজ তাদের রায়ে বলেছেন, ইউরোপিয়ান কমিউনিটিস অ্যাক্ট সরকারকে তার বিশেষ অধিকার প্রয়োগে সীমাবদ্ধতা দেয় নি। আর মন্ত্রীরা চাইলে পার্লামেন্টকে অবহিত না করেই এ প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করতে পারেন।
ওদিকে, এডিনবার্গ, বেলফার্স্ট ও কার্ডিফের ডিভলভড অ্যাসেমব্লিগুলো (ক্ষমতা হস্তান্তরিত সংসদ) ব্রেক্সিট প্রক্রিয়ায় তাদের ভাষ্য থাকার দাবি উঠিয়েছে। তবে ব্রেক্সিট প্রক্রিয়ায় তারা অংশগ্রহণের আনুষ্ঠানিক অধিকার পায় নি।
লর্ড ন্যুবার্গার বলেন, ‘বিকেন্দ্রীকরণ ইস্যুতে আদালত সর্বসম্মতিক্রমে রায় দিচ্ছেন যে, আর্টিকেল ৫০ সক্রিয় করার আগে ক্ষমতা হস্তান্তরিত সংসদগুলোর সঙ্গে আলোচনা করার আইনি বাধ্যবাধকতা ইউকের মন্ত্রীদের নেই।’
অর্থাৎ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে প্রস্থান প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করতে আর্টিকেল ৫০ কার্যকর করার এখতিয়ার এখন বৃটিশ পার্লামেন্টের। সরকার পার্লামেন্টে এ সংক্রান্ত বিল উপস্থাপনের পর আইনপ্রণেতারা ভোট দেবেন। পার্লামেন্টের অনুমোদন সাপেক্ষে লিসবন চুক্তির এই আর্টিকেল যেদিন কার্যকর করার ঘোষণা দেবে বৃটিশ সরকার সেদিন থেকে শুরু হয়ে যাবে উল্টো গণনা। ইইউ’র সঙ্গে চূড়ান্ত বিচ্ছেদের সমঝোতা শেষ করতে ইউকে সময় পাবে ওই দিন থেকে ২ বছর।


আপনার মন্তব্য প্রেরণ করুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ফিল্ডসমূহ * এর মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে

*

conference-abu-talib
Pesan Haji 2018 Ayatullah Al-Udzma Sayid Ali Khamenei
We are All Zakzaky