আরব রাজা-বাদশাহ'র সঙ্গে ওবামার বৈঠক এবং জঙ্গি কানেকশন

  • News Code : 692486
  • Source : IRIB
Brief

বুশ প্রশাসনের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক আন্ডার সেক্রেটারি স্টুয়ার্ট লিভি বলেছিলেন, বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদ বন্ধের জন্য যদি তার ক্ষমতা থাকত তাহলে তিনি সৌদির সন্ত্রাসবাদে অর্থ জোগানো বন্ধ করে দিতেন। অন্যদিকে পাকিস্তানের সাবেক আইনমন্ত্রী ইকবাল হায়দার ২০১২ সালের আগস্ট মাসে ডয়চে ভেলেকে এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, "তালেবান হোক আর লস্করই জাংভি হোক তাদের আদর্শ যে সৌদি ওহাবিবাদ, কোনো দ্বিধা ছাড়াই এ কথা বলা যায়।"

গত ১৪ মে, ২০১৫ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা এবং আরব রাজা-বাদশাহ ও তাদের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধির সাথে একটি বৈঠক হয়। বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সাথে পাঁচ+১ বিশ্ব-শক্তি পরমাণু চুক্তির প্রায় দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হওয়ায় আরব রাজারা চুক্তি নিয়ে যে উদ্বেগ জানিয়েছে তা প্রশমন করা। আরব রাজারা আমেরিকার বহু বছরের কেনা খাস গোলাম! ওবামা তো তাদের বলেছেনই আমেরিকা কখনই তার আরব মিত্রদের ত্যাগ করবে না, কিন্তু আরব রাজারা তাতে সন্তুষ্ট নয়। তাহলে প্রশ্ন হল: আরব রাজাদের উদ্বেগ কিভাবে নিরসন করবেন ওবামা? মার্কিন ফরেইন পলিসি ম্যাগাজিন লিখেছে, আমেরিকা যে তার আরব মিত্রদের পাশে আছে এর প্রমাণ হিসাবে উন্নত ধরণের মারণাস্ত্র আরবদের কাছে বিক্রি করতে হবে! ঐ বৈঠকের তাৎপর্য এটাই।
ওবামা প্রশাসনের প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে পরিমাণ অস্ত্র বিক্রি করে তার চার ভাগের তিনভাগেই কিনেছে সৌদি আরব! ২০০৮ সালে সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দার ফলে মার্কিন অস্ত্র কোম্পানিগুলোর অবস্থা ছিল মুমূর্ষু। সে সময় হাতে আলোক-বর্তিকা নিয়ে এগিয়ে আসে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় সব রাজা বাদশাহ। একের পর এক অস্ত্র চুক্তি করতে থাকে মার্কিন কোম্পানিগুলোর সাথে ! ২০১০ সালে সৌদি আরবের কাছে কয়েক হাজার বিলিয়ন ডলার মূল্যের এফ-১৫ যুদ্ধ বিমান, অ্যাপাচি হেলিকপ্টার, সাঁজোয়া যান ও অন্যান্য সরঞ্জাম বিক্রির পেন্টাগনের ঘোষণায় বোয়িং, লকহিড মার্টিন, রেথিয়ন, জেনারেল ইলেকট্রিক, ইউনাইটেড টেকনোলজিসের সিকোরস্কাই হেলিকপ্টার ইউনিট এবং আইটিটি অ্যারোস্পেস হয় সবচেয়ে বেশি উপকৃত। সৌদিদের কাছে ৮৪টি বোয়িং এফ-১৫এস বিমান বিক্রির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪ রাজ্যে ৫০ হাজার চাকুরি সৃষ্টি হয়েছে বলে রাজনৈতিক-সামরিক বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্ড্রু শ্যাপিরো গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছিলেন।
নতুন কোনো চাহিদা না থাকায় বোয়িংয়ের এফ-১৮ বিমানের প্রডাকশন লাইন বন্ধ হওয়ার পথে ছিল। আলোক বর্তিকা নিয়ে এগিয়ে আসল কুয়েত! কুয়েত ৩ বিলিয়ন ডলারের ৪০ টি এফ-১৮ বিমান কেনার চুক্তি করায় এযাত্রা বেঁচে গেল কোম্পানিটি! এরমধ্যেই নতুন অন্য  কোনো খদ্দের খুঁজে পাবে কোম্পানিটি। নতুন করে ৬.৫ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি করেছে কাতার! পিছিয়ে নেই আরব আমিরাতসহ অন্যান্য আরব রাষ্ট্রও! বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি যেন তাদের নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার! শুধু যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেই যে আরবরা অস্ত্র কিনে এমনটি নয়, আরবরা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ইউরোপের ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানিসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে কম বেশি অস্ত্র কিনে থাকে ! কথা হল অস্ত্র শুধু কিনলেই হয় না, সেসব দেখাশোনা, ব্যবহার ও কারিগরি বিভিন্ন ত্রুটির কারণে দরকার হয় হাজার হাজার টেকনিশিয়ান। আরবদের তো নিজস্ব কোনো টেকনিশিয়ানও নেই, নেই প্রতিরক্ষা শিল্প! তাই ইউরোপ, আমেরিকার হাজার হাজার টেকনিশিয়ানেরও উচ্চ বেতনের কর্মসংস্থান হয়ে যায় আরবদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কেনার লেনদেনে!
ক্যাম্প ডেভিডে আরব রাজাদের সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে বৈঠক করলেন ঐ বৈঠকের ফলাফল হিসাবে অর্থাৎ আরবদের উদ্বেগ(!) নিরসনের জন্য নতুন করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা! আরব রাজা-বাদশাহরা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ঐ সব অস্ত্র কি করবেন? রুটির সাথে খাবেন নাকি ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহার করবেন? ইসরাইলের সাথে যুদ্ধ করার সাধ্য ও সাহস কোনটিই আরবদের নেই বরং উল্টোটাই-আরব রাজা বাদশাহরা  ইসরাইলের এজেন্ট হয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিচ্ছে ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ! সিরিয়া ও ইরাকে লড়াইরত জঙ্গিরা ইসরাইলের হাসপাতালে চিকিৎসা সুবিধা নিচ্ছে এরকম তথ্য প্রমাণও পাওয়া গেছে! এজন্য  ইসলামের লেবেল-লাগানো এইসব জঙ্গি গ্রুপকে দেখবেন না যে তারা ইসরাইলের বিরুদ্ধে কোনো ন্যূনতম হুমকি ধমকি দিয়েছে যেমনটি দিয়ে থাকে বিশ্বের অন্যান্য দেশকে! কখনই দেয়নি ! তেমনি ইসরাইলের কোনো মিডিয়া এবং সরকার বা সরকারের কোনো কর্মকর্তা আইএস বা আল কায়েদা এজাতীয় জঙ্গি গ্রুপকে কখনও তাদের নিরাপত্তা বা দেশের জন্য হুমকি হিসাবে বর্ণনা করেছে- এরকম কোনো তথ্য-প্রমাণ বা নিউজ পাওয়া যায় না!
আরব রাজা-বাদশাহদের দেয়া অস্ত্র ছাড়াও ইউরোপ, আমেরিকার কালো বাজার থেকে বা এইসব দেশ থেকে গোপনেও অস্ত্র পেয়ে থাকে এরা, আবার কখনও কখনও আমেরিকা নিজেই বিমান থেকে এদের তাঁবু বা ঘাঁটিগুলোতে প্রচুর অস্ত্র ফেলে যায় ! পরে তা প্রকাশ হওয়ার পর আমেরিকা দাবি করে যে ভুল করে ওদের ঘাঁটিতে অস্ত্র পড়েছে!  এছাড়াও 'গনিমতের মাল' হিসাবেও দখলকৃত ভূখণ্ড থেকে এরা অস্ত্র পেয়ে থাকে। আল কায়েদা, আইএস এবং এজাতীয় জঙ্গি গ্রুপের অস্ত্রের উৎস সম্পর্কে জানা গেল। কিন্তু অর্থ ?
'সৌদি অর্থে বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদ' শিরোনামে ২০১৩ সালের শেষের দিকে বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন একটি বিশ্লেষণধর্মী আর্টিকেল প্রকাশ করেছিল। সেখানে লিখেছিল-"সারা বিশ্বে ইসলামিক চরমপন্থা ও জঙ্গিবাদের উত্থান ছড়িয়ে পড়ার পিছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী সৌদি আরব। গত চার দশক ধরে ওহাবি ইমামদের প্রচারিত ইসলামের অসহিষ্ণু, উগ্র ও সহিংস ব্যাখ্যা রপ্তানিতে ব্যয় হচ্ছে এই রাজতন্ত্রের বিপুল সম্পদ।"
বুশ প্রশাসনের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক আন্ডার সেক্রেটারি স্টুয়ার্ট লিভি বলেছিলেন, বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদ বন্ধের জন্য যদি তার ক্ষমতা থাকত তাহলে তিনি সৌদির সন্ত্রাসবাদে অর্থ জোগানো বন্ধ করে দিতেন। অন্যদিকে পাকিস্তানের সাবেক আইনমন্ত্রী ইকবাল হায়দার ২০১২ সালের আগস্ট মাসে ডয়চে ভেলেকে এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, "তালেবান হোক আর লস্করই জাংভি হোক তাদের আদর্শ যে সৌদি ওহাবিবাদ, কোনো দ্বিধা ছাড়াই এ কথা বলা যায়।"
দি ইকনোমিস্ট জানিয়েছে, একজন আইএস সদস্য কম করে হলেও প্রতি মাসে ৪০০ ডলার বেতন পায় যা বিশ্বের যে কোনো জঙ্গি গ্রুপের সদস্য তো বটেই এমনকি ইরাক ও সিরিয়াসহ কতিপয় আরব দেশের সেনা সদস্যরাও এত পরিমাণ বেতন পান না! বিখ্যাত নিউ ইয়র্ক টাইমস এর সহযোগী পাকিস্তানের এক্সপ্রেস ট্রিবিউন জানিয়েছে, তদন্তে জানা গেছে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই আইএস-এর সদস্য সংগ্রহে অর্থ যুগিয়েছে ! আমি হুবহু কোট করছি-“During the investigations, Yousaf al Salafi revealed that he was getting funding – routed through America – to run the organization in Pakistan and recruit young people to fight in Syria,” এক্সপ্রেস ট্রিবিউন আরও প্রকাশ করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে আইএস এর নিন্দা করলেও এর অর্থ, অস্ত্র ও সদস্য সংগ্রহে কোনো বাধার সৃষ্টি করেনি !
এছাড়াও, আইএস বর্তমানে ইরাক ও সিরিয়ার দখলকৃত অংশের তেল ক্ষেত্রগুলো থেকে বিপুল পরিমান পেট্রো ডলার উত্তোলন করে হাজার হাজার তেল ট্যাংকারে তেল ভরেই জাহাজে করে বিক্রি এবং স্থানান্তরিত করছে। জলপথে হোক বা ভূমি থেকেই হোক তারা এই তেল ট্যাংকগুলো এক দেশের মধ্য দিয়ে আর এক দেশে স্থানান্তর ও বিক্রি করছে এবং আমেরিকার নেতৃত্বে আইএস বিরোধী তথাকথিত ’আন্তর্জাতিক জোট’ সেই তেল তাদের কাছ থেকে কিনেও নিচ্ছে। জঙ্গিরা যতই সভ্যতা, সংস্কৃতি ও বর্বর, নিষ্ঠুর হোক কিন্তু তাদের কাছ স্বল্পমূল্যে তেল কিনতে তারা তাল গাছের মত এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। বেশিরভাগ তেল তুরস্ক হয়ে ইসরাইল, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিক্রি করছে অথচ কি অদ্ভুত ব্যাপার সেই আমেরিকাই দাবি করছে যে, তারা আইএস বিরোধী যুদ্ধ করছে!
এই তো মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ও রিপাবলিকান দলের সিনেটর রন পল দুই দিন আগেই বলেছেন,“তার দলের যুদ্ধবাজ সিনেটররা মধ্যপ্রাচ্যে উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসআইএল সৃষ্টির জন্য দায়ী।” রন পল আরও বলেছেন, “আইএসআইএল সন্ত্রাসীরা আজ এত শক্তিশালী হয়েছে কেবল যুদ্ধবাজদের নির্বিচার অস্ত্র সরবরাহের কারণে। ”
শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি নয়, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সম্পদশালী দেশ কাতারও আল কায়েদা, তালেবান, আইএসসহ বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর উত্থানের পিছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে থাকে। তালেবান নেতাদের সাথে আমেরিকার মধ্যস্থতা ও মাঝে মাঝে তালেবান নেতাদের আশ্রয়ও দেয় কাতার। ইসলামি জঙ্গি গ্রুপগুলোর উত্থানের পিছনে অন্যান্য আরব রাজা বাদশাহরা তো বটেই এমনকি আরব দেশগুলোর অনেক ধন কুবেরও অর্থ অনুদান দিয়ে থাকে। এই নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বিভিন্ন সময় অ্যানালিটিকাল অনেক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হল সৌদি আরবসহ অন্যান্য রাজা বাদশাহ ও ধনকুবেররা জঙ্গিদের পিছনে এত অর্থ ও অস্ত্র ব্যয় করেন কেন ?
এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদেরকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিকে বুঝতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলকে সবসময় লাঠিয়াল হিসাবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্য। এই ইসরাইল আরবদের সাথে বিভিন্ন যুদ্ধে আরবদের যেমন জর্ডান, মিসর, লেবানন ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ ভূমি দখল করে নিয়েছিল। তারপর লেবানন ও সিরিয়া ছাড়া মিসর ও জর্ডান ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি করে ও ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়ে নিজেদের ভূমি ফিরে পায়। লাঠিয়াল ইসরাইলের বিরুদ্ধে আরবদের মধ্যে যখন মাথা তোলার কেউ আর থাকল না তখনই ইসরাইলের বিরুদ্ধে উত্থান হতে থাকে ইরানের! প্রমাদ গুণলো ইসরাইল! ইরানকে আরব ও বিশ্ব শান্তির জন্য হুমকি হিসাবে প্রচার করতে থাকে পশ্চিমা মিডিয়া। নয়া ইরানের উত্থানে শুধু ইসরাইল নয় শঙ্কিত হয় আরবরাও! আরব অঞ্চলে ইরানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হল সিরিয়া। ইসরাইলকে প্রতিহত করতে ফিলিস্তিনে হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লাহকে সশস্ত্র-রূপে দাঁড় করায় ইরান। আর এদের সাথে ইরানের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হল সিরিয়া। শুধু তাই নয় ইরানের সাথে ইসরাইলের ভবিষ্যৎ যুদ্ধে ইসরাইলে ইরানের প্রবেশের একমাত্র পথ হল সিরিয়া ! কারণ সিরিয়ার সাথে চুক্তির কারণে ইরান সিরিয়ার ভূমি ব্যবহার করে অতি সহজেই ইসরাইলের ভিতরে সেনা পাঠাতে পারবে যা ইসরাইলের জন্য সত্যিই আতংকের বিষয়! সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে ক্ষমতা থেকে সরানোর আরব ও ইসরাইলী এত তোড়জোড়ের কারণ হল মূলত এটাই। এছাড়াও অর্থনৈতিক কারণ তো আছেই। অন্যদিকে ইরানও কোনোক্রমেই সিরিয়াকে হাতছাড়া করবে না তেমনি রাশিয়াও। আরব দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র সিরিয়াই হল রাশিয়ার বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ মিত্র! ফলে আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার অর্থ হচ্ছে, ইরান ও রাশিয়াকে স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল করে ফেলা। আর এ থেকে সবচেয়ে লাভবান হবে মার্কিন সরকার, ইসরাইল ও তাদের আরব মিত্র পক্ষ! আসাদকে সরানোর চেষ্টায় এদের প্রত্যেকেরই স্বার্থ রয়েছে। সৌদি ও ইসরাইলের ইরানকে বধ, তুরস্কের স্বার্থ হল আরব রাষ্ট্রগুলোকে তার অধীনে নিয়ে এসে মধ্যপ্রাচ্যে মোড়লগিরি করা আর আমেরিকার স্বার্থ হল ইরান ও রাশিয়াকে একসঙ্গে বধ! আর এই কারণেই সিরিয়ায় আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে আরব বসন্তের সুযোগেই বিদ্রোহী ও জঙ্গি বাহিনী গঠন করে তাদের হাতে অস্ত্র ও অর্থ যোগান দিতে শুরু করল এরা সবাই! নিয়ে আসা হল আল কায়েদাকে, গঠন করা হল আইএসআইএল, ইউরোপ, আমেরিকা ও বিভিন্ন দেশ থেকে রিক্রুট করে নিয়ে আসা হল কথিত মুসলিম জিহাদিদের! ফলে অল্পদিনের মধ্যেই আইএসআইএল এতই শক্তিশালী হল যে তারা শুধু সিরিয়াতে নয় পার্শ্ববর্তী ইরানের আর এক মিত্র ইরাকেও প্রবেশ করল! লক্ষণীয় ব্যাপার হল আইএসআইএল নামে যে ভয়ংকর জঙ্গি গ্রুপের উৎপত্তি হয়েছে এরা কখনই ইসরাইল বা মার্কিন আরব মিত্রের কোনো দেশ আক্রমণ করেনি আর করার কথাও নয়! এদের দৌড় ঐ পর্যন্তই ।
আরবদের সবচেয়ে বড় শত্রু ইসরাইল। কিন্তু মার্কিন ও ইসরাইলী ষড়যন্ত্রে বেশিরভাগ আরব সরকার শত্রু হিসাবে বেছে নিয়েছে ইরানকে। অবস্থা এমনই যে আরবরা আমেরিকা ও ইসরাইলকে এখন পর্যন্ত বারবার চাপ দিচ্ছে ইরান আক্রমণ করতে! এ নিয়ে ক্যাম্প ডেভিডে ওবামার সাথে আরব রাজাদের বৈঠকের কয়েকদিন আগে ইসরাইলী প্রতিনিধির সাথে আরবরা গোপনে ইরান নিয়ে জর্ডানেও বৈঠক করেছে যা পরবর্তীতে যে কারণেই হোক ফাঁস হয়ে যায়! তারপরেও  আমেরিকা ও ইসরাইল ইরানকে আক্রমণ করছে না দেখে ইরানকে প্রতিহত করতে অবশেষে পাকিস্তান থেকে পরমাণু অস্ত্র কেনার পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়ে এসেছে সৌদি আরব! ওয়াশিংটনেও সাবেক সৌদি গোয়েন্দা প্রধান প্রিন্স টার্কি বিন ফয়সাল প্রকাশ্যে গর্ব করে বলেছেন, “whatever the Iranians have, we will have too”.  এতদিন মনে করা হচ্ছিল পাকিস্তান পরমাণু অস্ত্র বানাচ্ছে ভারতকে পাল্লা দেওয়ার জন্যই নাকি সৌদি আরব পাকিস্তানের পরমাণু খাতে গত ৩০/৩৫ বছর ধরে বিলিয়ন বিলিয়ন পেট্রো ডলার বিনিয়োগ করেছে! ভারতের সাথে পাল্লা দিতে সৌদির কী স্বার্থ থাকতে পারে? আমার ধারণা আমেরিকা ও ইসরাইল ইরানের সাথে সৌদি আরবসহ অন্যান্য রাজতান্ত্রিক আরব দেশের যুদ্ধ বাধাতে চায়। তারা ৮০’র দশকে সংঘটিত ইরান-ইরাক যুদ্ধের মত আর একটি নতুন ভয়াবহ যুদ্ধ চাপিয়ে দিতে চায়! ইতোমধ্যেই তাদের এ পাতানো ফাঁদে পা দিয়েছে সৌদি আরবসহ অন্যান্য রাজতান্ত্রিক আরব শাসকগোষ্ঠী। এর অন্যতম প্রমাণ সৌদি আরবের নেতৃত্বে তথাকথিত হুথিদের দমনে ইয়েমেন আক্রমণ এবং চলছেই সেই আগ্রাসন। আর ইরান বিরোধী জনসমর্থন আদায় করতে সৌদি আরব সুন্নি-প্রধান দেশগুলোতে এরইমধ্যে অর্থের বিনিময়ে শিয়া বিরোধী সম্মেলনের আয়োজন শুরু করে দিয়েছে ঠিক যেরকমটি হয়েছিল ৮০’র দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়! মার্কিন ও ইসরাইলের পাতানো ফাঁদে শুধু পা দেয়নি ইরান যার ফলে যুদ্ধ এখনও শুরু হয়নি। আর যদিও কোনো কারণে যুদ্ধ শুরু হয়েও যায় তাহলে ইরানকে ঠেকাতে অলস ও অনুর্বর মস্তিষ্কের সৌদি আরবের পাকিস্তানের কাছ থেকে কিনে নেয়া পরমাণু অস্ত্রের প্রয়োগ ছাড়া অন্য কোনো উপায় আছে কি? খুব ভয়াবহ অবস্থা! যে কোনো মুহূর্তে জ্বলতে পারে যুদ্ধের আগুন !
লিখতে গেলে অনেক প্রসঙ্গ চলে আসে তাই আবার ফিরে যাই ক্যাম্প ডেভিডে। ক্যাম্প ডেভিডে আরব রাজাদের সাথে বৈঠকের ফল হিসাবে তাদের ইরান সংক্রান্ত উদ্বেগ(!) নিরসন করতে এখন তাদের কাছে আবারও বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি করবে আমেরিকা। মূলত ঐ সব অস্ত্রের একটা বিরাট অংশ ব্যয় হবে ইরানের তথাকথিত প্রভাব রোধ করতে বিভিন্ন জঙ্গি গ্রুপকে সাহায্য প্রদানে! ব্যয় হবে ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন ও লিবিয়াসহ বিভিন্ন মুসলিম প্রধান দেশগুলিতে! সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় কেন্দ্রগুলোসহ বিভিন্ন স্থাপনায় ঘটতে থাকবে একের পর এক বোমা বিস্ফোরণ! দখল ও পাল্টা দখল চলবে নিরন্তর! মরবে নিরীহ মানুষ! এটাই তো চায় মার্কিন ও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীরা। কারণ তাঁদের প্রাণ-ভোমরা যে এই অস্ত্র ব্যবসায়! আরব রাজা বাদশাহদের চেয়ে বিশ্ব মানবতার বড় শত্রু আর কে আছে?#

লেখক : মিজানুর রহমান মিলন


আপনার মন্তব্য প্রেরণ করুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ফিল্ডসমূহ * এর মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে

*

پیام رهبر انقلاب به مسلمانان جهان به مناسبت حج 1441 / 2020
conference-abu-talib
We are All Zakzaky