?>
রোহিঙ্গারা দেশ ছাড়ায় বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর উল্লাস,

রোহিঙ্গাদের আমরা আর ফিরিয়ে নেব না, তারা ‘সাপ’ ও ‘কুকুরের চেয়েও নিকৃষ্ট’

রোহিঙ্গাদের আমরা আর ফিরিয়ে নেব না, তারা ‘সাপ’ ও ‘কুকুরের চেয়েও নিকৃষ্ট’

মাইবোন টাউনশিপের রাখাইন বৌদ্ধ নারী দাও সো চায়কে প্রকাশ্য মারধর করেছে উগ্রপন্থীরা, কারণ তার স্বামী রোহিঙ্গা মুসলমানদের সাহায্য করেছে।

আবনা ডেস্কঃ মাইবোন টাউনশিপের রাখাইন বৌদ্ধ নারী দাও সো চায়কে প্রকাশ্য মারধর করেছে উগ্রপন্থীরা, কারণ তার স্বামী রোহিঙ্গা মুসলমানদের সাহায্য করেছে।
আগে থেকেই মিয়ানমারের সাধারণ মানুষের মনে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিরূপ ধারণা রয়েছে। রোহিঙ্গাদের বিষয়ে দীর্ঘ সময়ের সরকারি নীতিই মূলত ওই বিরূপ মনোভাবের জন্য দায়ী। রোহিঙ্গা নিপীড়ন নিয়ে বিশ্বজুড়ে যখন নিন্দার ঝড় বইছে, তখন মিয়ানমারের সরকার এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের চিন্তাধারা ঠিক বিপরীত। যুগ যুগ ধরে রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়ে মিয়ানমারের সাধারণ নাগরিকদের মনে একটি ‘শক্ত নেতিবাচক ধারণা’র জন্ম দিতে পেরেছে দেশটির মুসলিম বিদ্বেষী শাসকরা। ফলে তাদের কাছে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি অনাকাক্সিক্ষত এবং অগ্রহণযোগ্য। মিয়ানমারে যে কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বললে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি তারা উচ্চারণই করে না। অধিকাংশ মানুষ মনে করে রোহিঙ্গারা ‘বাঙালি’। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, মিয়ানমারের শাসকদের মতোই দেশটির জনগণও ‘রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সে দেশের নাগরিক মনে করে না।’ বিশ্বজুড়ে রোহিঙ্গা সংকটকে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মানবিক পরিস্থিতি হিসেবে দেখা হলেও মিয়ানমারের নাগরিকরা বিষয়টিকে দেখে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন হিসেবে। তাই রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের প্রতি ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিপীড়ন-নিধন চালানো হচ্ছে, মিয়ানমারজুড়েই এই অভিযোগ অস্বীকার করা হচ্ছে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমনটিই উঠে এসেছে।
রোহিঙ্গা নিধন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী উ থু মিন গালা বলেন, ‘রোহিঙ্গা মুসলিমরা মিয়ানমারের অধিবাসী নয়। রোহিঙ্গা নারীরা বেশি বেশি বাচ্চা জন্ম দেয়। এ কারণে স্থানীয় বৌদ্ধ জনসংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে রোহিঙ্গারা। তবে এখন যে কোনোভাবে বহু রোহিঙ্গা এখান থেকে চলে গেছে।’ রাখাইনের রাজধানী সিত্তেয় দামারামা বৌদ্ধ মন্দিরের ৫৭ বছর বয়সী ওই সন্ন্যাসী বলেন, ‘তারা চলে যাওয়ায় ভগবান বুদ্ধকে ধন্যবাদ জানাই। তারা আমাদের জমি, আমাদের খাবার, আমাদের পানি ইত্যাদি চুরি করে নিয়েছিল। আমরা কখনই তাদের আর ফিরিয়ে নেব না।’ রাখাইনের রোহিঙ্গাদের ওপর গত কয়েক মাসে মিয়ানমার সেনাবাহিনী যে হত্যাযজ্ঞ, গণধর্ষণ ও তাদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের তাণ্ডব চালিয়েছে, তার বিস্তারিত দলিল প্রমাণ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো প্রকাশ করেছে। গত আগস্ট মাসে নতুন করে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর প্রায় ৬ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। জাতিসংঘের মতে, ১৯৯১-৯২ সালে রুয়ান্ডার গণহত্যার পর এটাই ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুতগতির বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা। এত সব সত্ত্বেও মিয়ানমারে, এমনকি যেখানে গণহত্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে সেই রাখাইনেই জাতিগত নিধনযজ্ঞের অভিযোগ ঢালাওভাবে অস্বীকার করা হচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তা, বিরোধীদলীয় রাজনীতিক, ধর্মীয় নেতা এমনকি স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীদের একটিমাত্রই বক্তব্য। সেটা হচ্ছে, ‘রোহিঙ্গারা বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারের বৈধ নাগরিক নয়। কিন্তু এখন তারা ছলনার আশ্রয় নিয়ে বিশ্বের সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করছে।’
জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হাতে এমন বিশদ দলিল প্রমাণ রয়েছে যে, সেনাবাহিনী পুরো রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বাড়ি-ঘর ও ভিটেমাটি ব্যাপকভাবে জ্বালিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে নিরীহ রোহিঙ্গাদের টার্গেট করে হত্যা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর এই দলিল-প্রমাণ অস্বীকার করে দেশটির সরকার উল্টো দাবি করেছে, রোহিঙ্গারা নিজেরাই নিজেদের ঘর-বাড়িতে আগুন লাগিয়েছে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর যে অভিযোগ উঠেছে, তার জবাবে দেশটির সমাজসেবা মন্ত্রী ড. উইন মিয়াত আয়ে বলেন, ‘সেনাবাহিনী কর্তৃক নিরীহ রোহিঙ্গা হত্যার কোনো ঘটনা ঘটেনি। রোহিঙ্গা মুসলিমরাই নিজেদের লোককে হত্যা করেছে।’ রোহিঙ্গারা যে গণহারে দেশত্যাগ করে বাংলাদেশে চলে গেছে এতে রাখাইনের রাজনীতিকরাও সন্তুষ্ট। রোহিঙ্গাদের বাঙালি বলে আখ্যায়িত করে রাখাইনের রাথেডং জেলার একজন সাংসদ ড খিন স ওয়াই বলেন, ‘সব বাঙালিই তাদের ধর্মীয় স্কুলগুলোতে নির্মমভাবে হত্যা ও হামলা করতে শেখে। তাদের সঙ্গে বসবাস করা একটা অসম্ভব ব্যাপার।’ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রে অগ্র ভূমিকা পালন করেছে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা। মিয়ানমারের জনপ্রিয় বেশ কয়েক ভিডিও চরমপন্থী ওই সন্ন্যাসীরা রোহিঙ্গাদের ‘সাপ’ কিংবা ‘কুকুরের চেয়ে নিকৃষ্ট’ বলে উল্লেখ করেছে।


আপনার মন্তব্য প্রেরণ করুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ফিল্ডসমূহ * এর মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে

*