?>

ছয়দিনে তালেবানদের দখলে নয়টি প্রাদেশিক শহর, দোহায় বসেছে শান্তি বৈঠক

ছয়দিনে তালেবানদের দখলে নয়টি প্রাদেশিক শহর, দোহায় বসেছে শান্তি বৈঠক

আফগানিস্তানে তালেবান যোদ্ধাদের ক্রমবর্ধমান বিজয়ের মুখে আতংকগ্রস্ত আমেরিকা এবং তাদের দোসর ন্যাটো শক্তি। পশ্চিমা শক্তির সমর্থিত আশরাফ গনি’র সরকারকে চরম পরিণতি থেকে রক্ষার জন্য একপ্রকার শান্তি-সমঝোতা করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে মার্কিন প্রশাসন।

আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা) : তলেবানদের যুদ্ধবিরতিতে রাজী করানোর উদ্দেশ্যে নিয়ে মার্কিন শান্তি দূত জালমে খালিলযাদ মঙ্গলবার ( ১০ আগস্ট) ছুটে এসেছেন কাতারের রাজধানী দোহায়। সেখানে তালেবানদের একটি রাজনৈতিক কার্যালয় রয়েছে। তালেবান প্রতিনিধি এবং আফগান সরকারের  প্রতিনিধিদের সাথে মঙ্গলবারই পৃথক পৃথক বৈঠক করেছেন  মার্কিন দূত। বৈঠকে জাতিসঙ্ঘ, আমেরিকা, ব্রিটেন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, চীন, পাকিস্তান, উজবেকিস্তানের বিশেষ প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। মঙ্গলবার নাগাদ রাশিয়ার বিশেষ প্রতিনিধি দোহায় এসে পৌঁছান নি। বৈঠক আরও কয়েক দফা  চলবে ।

সপ্তাহ দুই  আগে প্রতিবেশী পাকিস্তান একটা রাজনৈতিক সমাধান এবং যুদ্ধ বন্ধ করে শান্তি স্থাপনের জন্য তালেবানদের  সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিল।

তবে আফগান পররাষ্ট্র মন্ত্রানালয়ের সাবেক একজন মূখপাত্র ওমর সামাদ সোমবার আল-জাজিরাকে বলেছেন, আগেই দরকার ছিল রাজনৈতিকভাবে আফগানিয়াস্তান সংকটের সমাধান করা । গত তিন বছর ধরেই সেটা করতে ব্যর্থ  হয়েছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলি। এখন এটা বলতে গেলে অসম্ভব অবস্থায় চলে গেছে। এর অর্থ পরিষ্কার, এখন সামরিক শক্তি দিয়েই সমাধান হতে চলেছে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক সংকট । 

চূড়ান্ত বিজয়ের পথে তালেবান

দীর্ঘ বিশ  বছর আফগানিস্তানে  দখলদারি বহাল রেখে আমেরিকা ও তার ন্যাটো মিত্ররা  তালেবানদের দমনে ব্যর্থ হয়ে  সকল বিদেশি সৈন্য  প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। চলতি আগষ্ট মাসের মধ্যেই আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তালেবানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত  চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনীকে প্রত্যাহার করার কথা। ইতোমধ্যে বিদেশী সৈন্য প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এরই মধ্যে তালেবান যোদ্ধারা গত এপ্রিল থেকে তাদের হামলা বৃদ্ধি করতে থাকে। যুদ্ধ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তালেবানরা ইতোমধ্যে দেশটির অর্ধেকের বেশি এলাকায় নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকাও এখন তাঁদের নিয়ন্ত্রণে। গত শুক্রাবার ( ৬ আগস্ট) থেকে মঙ্গলবার ( ১২ আগস্ট) পর্যন্ত  ছয়দিনে  নয়টি প্রাদেশিক শহর দখল করে নিয়েছে তলেবান যোদ্ধারা । তালেবানের হাতে এ পর্যন্ত আফগানিস্তানের নয়টি প্রাদেশিক রাজধানীর পতন হয়েছে। এর মধ্যে আজ (বুধবার) সর্বশেষ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বাদাখশানপ্রদেশের রাজধানী ফয়জাবাদ শহরের পতন হয়।। ফয়জাবাদ শহরের পতনের পর রাশিয়া বলেছে, তাজিকিস্তান ও উজবেকিস্তানের বেশিরভাগ সীমান্ত এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তালেবান। বাদাখশান প্রদেশের সঙ্গে তাজিকিস্তান,পাকিস্তান ও চীনের সীমান্ত রয়েছে.

তীব্র লড়াই চলছে বেশ কয়েকটি শহরে। দক্ষিণের হেলমান্দ প্রদেশের রাজধানী লস্করগাহ দখলে রাখতে মরিয়া আফগান সরকারি বাহিনী মঙ্গলবারও তালেবানদের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী এরই মধ্যে  প্রাদেশিক শহরের দশটি থানার ন’টি দখল করে নিয়েছে তালেবানরা । লড়াই চলছে উত্তরের বলখ  প্রদেশের  রাজধানী  মাযার-ঈ শরিফের দখল নিয়ে ।

তালেবানদের আক্রমনের তীব্রতায় দিশেহারা আফগান বাহিনী তাদের সামরিক ঘাঁটি ছেড়ে পালাচ্ছে অস্ত্র গোলা-বারুদের ভাণ্ডার  ফেলে। অনেকে সরকারি পক্ষ ত্যাগ করে তালেবানদের সাথে যোগ দিচ্ছে। তালেবানদের দখলে আসছে সরকারী বাহিনীর ফেলে যাওয়া প্রচুর আধুনিক অস্ত্র-সস্ত্র। তালেবানরা আরও বিপুল উদ্যমে তাদের আক্রমণ তীব্র করছে। যেকোনো মুহূর্তে রাজধানী কাবুলের পতন ঘটতে পারে বলেও আশঙ্কা জোরদার হচ্ছে।

প্রচণ্ড যুদ্ধে প্রাণ হারাচ্ছেন উভয় পক্ষের সৈনিক এবং অসংখ্য বেসামরিক নাগরিক। যুদ্ধকবলিত এলাকা থেকে বাসিন্দারা পালিয়ে যাচ্ছেন যে সেদিকে পারছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন জানিয়েছে সাম্প্রতিক যুদ্ধে গত কয়েক মাসে অন্তত চার লক্ষ নাগরিক বাস্তচ্যুত হয়েছে । আর রেড ক্রসের হিসেবে গত দশ দিনে আহত চার হাজার বেসামরিক নাগরিককে  চিকিৎসা দিতে হয়েছে।

সোমবার ( ৯ আগস্ট) অনেকটা আপসের মধ্য দিয়ে পতন ঘটেছে হিন্দুকুশ পর্বতমালা বেষ্টিত সামানগাঁ প্রদেশের রাজধানী আইবাক শহরের। তালেবানদের আক্রমনের মুখে নগরীর শীর্ষ নেতারা প্রদেশের গভর্নরকে বুঝিয়ে রাজী করাতে সক্ষম হন যে, অনিবার্য  ধ্বংস এবং প্রাণহানি  ঠেকাতে হলে যুদ্ধ না করা উত্তম। গভর্নর তাদের প্রস্তাবে রাজী হয়ে সরকারি সেনাদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেন। 

এর আগে রোববার উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শহর কুন্দুজ দখলের পর সার-ই পাল এবং তালোকান শহরও তালেবানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। কুন্দুজ শহর দখল তালেবানের জন্য চলতি বছরের সবচেয়ে বড় অর্জন বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।

তার আগে গত শুক্রবার বিকেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় নিমরোজ প্রদেশের রাজধানী জারাঞ্জ দখল করে তালেবান। জারাঞ্জ হচ্ছে ইরান সীমান্তের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্যকেন্দ্র। এ শহরের চারদিকের এলাকা দখল করে নেয়ার পর তালেবান আরও সামনে অগ্রসর হতে শুরু করে।

ওদিকে, তালেবান সামরিক প্রধান মুহাম্মদ ইয়াকুব এক বানীতে তাদের যোদ্ধাদের সতর্ক করে দিয়েছেন, তাদের দখলে আসা শহরের বেসামরিক নাগরিকদের জীবন-সম্পদ যেন সুরক্ষিত হয়। সরকারি সেনা কর্মকর্তা বা বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বাড়িঘরে যেন তালেবান সৈন্যরা  প্রবেশ না করেন সে বিষয়েও সাবধান করে দিয়েছেন তিনি । বাজার ও ব্যাবসা কেন্দ্র চালু রাখার ব্যাপারেও নির্দেশ দিয়েছেন তালেবান সামরিক প্রধান।

ক্লান্ত-অবসন্ন  মার্কিন ন্যাটো বাহিনী  

আফগানিস্তানের এরকম ভয়ংকর পরিস্থিতিতে  মার্কিন সামরিক সদর দপ্তর পেন্টাগনের মুখপাত্র জন কিরবি সংবাদ সম্মেলনে স্বীকার করেছেন, আফগান পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। তবে ওয়াশিংটন এখন বলছে আফগানিস্তানের যুদ্ধ পরিস্থিতি সেখানকার রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের  জয় -পরাজয়ের ব্যাপার। তাদের দেশ তাদেরই রক্ষা করতে হবে। তালেবানদের ওপর পরিচালিত সাম্প্রতিক মার্কিন বিমান হামলা প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন এড়িয়ে যান  পেন্টাগনের মুখপাত্র।

 তবে বাস্তবতা হচ্ছে, এ মাসে আফগানিস্তান ত্যাগের আগে মার্কিন সৈন্যরা এখন যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে ছাউনিতে আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন অবশ্য জানিয়ে দিয়েছেন,  আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের ব্যপারে  তালেবানদের সাথে ডোনাল্ড রেগান যে চুক্তি করেছে  তার  সন্মান তিনি রক্ষা করবেন এবং তিনি নিজেও  চান ইতিহাসের দীর্ঘতম যুদ্ধ থেকে দেশের সৈন্যদের দেশে ফিরিয়ে আনতে।

অপরদিকে,  কয়েক দশক ধরে  জার্মান সেনাদের নিরাপত্তা প্রতিরক্ষায় থাকা কুন্দুস শহরের পতনের পর জার্মান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আননেগ্রেট  ক্রাম্প সোমবার এক টুইট বার্তায় জানিয়েছেন। কুন্দুস তথা গোটা আফগানিস্তানের খবর খুবই তিক্ত এবং  বেদনাদায়ক । তার দেশ ও পার্লেমেন্ট কি চায় একট  প্রজন্ম ধরে আমাদের সৈন্যরা সেখানে যুদ্ধক্ষেত্রে থাকুক। যদি না চায় তবে  অন্য মিত্রদের সাথে আফগানিস্তান থেকে আমদের সৈন্যদের  প্রত্যাহার করাটাই উত্তম সিদ্ধান্ত। 

উল্লেখ্য,  আফগানিস্থানে  মোতায়েন বিদেশী  সেনাদের  সংখ্যার দিক থেকে  আমেরিকার পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জার্মানী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর  সবচেয়ে বেশি জার্মান সৈন্য নিহত হয়েছে  কেবল কুন্দুসে।

ওদিকে, ব্রিটিশ প্রতীরক্ষা মন্ত্রী সচিব বেন ওয়ালেস ডেইলি মেল পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আমেরিকা আফগানিস্থান থেকে চলে যাবার পর  ন্যাটো বাহিনী সেখানে মোতায়েন রাখার  ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকারের প্রস্তাবে তেমন  একটা সাড়া মেলেনি।

পালাচ্ছে বিদেশি নাগরিক- মার্কিন, বৃটিশ, ভারতীয়রা

আফগানিস্তানের বর্তমান অবস্থা এতটাই বিপজ্জনক যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ভারত তাদের নাগরিকদের দেশটি ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে।

কাবুলে মার্কিন দূতাবাস শনিবার বলেছে, আফগানিস্তানে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের অবিলম্বে দেশটি ছাড়া উচিত। একজন মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ফিন্যান্সিয়াল টাইমস পত্রিকাকে বলেন, মার্কিন নাগরিকদের প্রতি এ নির্দেশনা এটিই ইঙ্গিত করছে যে আফগানিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে।

বিভিন্ন প্রদেশে প্রচণ্ড যুদ্ধ ছড়িয়ে পরার কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় আফগানিস্তানে থাকা যুক্তরাজ্যের সকল নাগরিককে দ্রুত দেশটি ত্যাগ করার ব্যাপারে সতর্ক বার্তা দিয়েছে ব্রিটেন।

দেশটির ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট অফিস শুক্রবার (৬ আগস্ট) হালনাগাদ করা তাদের ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছে, ‘আফগানিস্তানে থাকা সকল ব্রিটিশ নাগরিককে যত দ্রুত সম্ভব দেশটি ত্যাগের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। যদি আপনি আফগানিস্তানে থাকেন, তাহলে আপনাকে দ্রুত আফগানিস্তান ত্যাগের নির্দেশ দেয়া হচ্ছে কারণ দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটতে দেখা যাচ্ছে।’

ওদিকে,  মঙ্গলবার  নিজ দেশের নাগরিকদের আফগানিস্তান ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছে ভারত। মাজার-ই-শরিফের কনস্যুলেট জেনারেল অব ইন্ডিয়া মঙ্গলবার এক টুইট বার্তায় লিখেছে, মাজার-ই-শরিফ থেকে একটি বিশেষ ফ্লাইট দিল্লির উদ্দেশে রওনা দেবে। মাজার-ই-শরিফ এবং এর বাইরে অবস্থানরত ভারতীয় নাগরিকদের আফগানিস্তান থেকে দেশে ফেরার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে আফগানিস্তানে দেড় হাজার ভারতীয় নাগরিক অবস্থান করছেন। এদের মধ্যে যারা বিশেষ ফ্লাইটে দেশে ফিরতে চান তাদের জরুরি ভিত্তিতে দূতাবাসে গিয়ে নিজেদের বিস্তারিত তথ্য দিতে বলা হয়েছে। গত মাসে কান্দাহারে অবস্থিত দূতাবাস থেকে প্রায় ৫০ জন কূটনীতিক এবং নিরাপত্তা সদস্যকে দেশে ফিরিয়ে নিয়েছে ভারত।#

342/


আপনার মন্তব্য প্রেরণ করুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ফিল্ডসমূহ * এর মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে

*