?>

রোহিঙ্গা সঙ্কট ও একজন জাহিদার কথা

রোহিঙ্গা সঙ্কট ও একজন জাহিদার কথা

তার বয়স তখন ১৮ মাস বা দেড় বছর। তখন তার মা তাকে নিয়ে নৌকায় করে পাড়ি দেন নাফ নদী।
আশ্রয় নেন বাংলাদেশে। এমনি আরো হাজার হাজার মুসলিম রোহিঙ্গা নির্যাতন থেকে জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে পাড়ি দিয়েছিল। এবারও দিয়েছে এবং দিচ্ছে। ওই যে বাংলাদেশে পা রাখা তারপর থেকে এখানেই বসবাস করছেন জাহিদা বেগম।

আবনা ডেস্কঃ জাহিদা বেগম। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা। বাড়ি তার পাহাড়ে ঘেরা, মিয়ানমারের জঙ্গলা এলাকায়। সেই বাড়ির স্মৃতি তিনি স্মরণ করতে পারেন না। তার বয়স তখন ১৮ মাস বা দেড় বছর। তখন তার মা তাকে নিয়ে নৌকায় করে পাড়ি দেন নাফ নদী।
আশ্রয় নেন বাংলাদেশে। এমনি আরো হাজার হাজার মুসলিম রোহিঙ্গা নির্যাতন থেকে জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে পাড়ি দিয়েছিল। এবারও দিয়েছে এবং দিচ্ছে। ওই যে বাংলাদেশে পা রাখা তারপর থেকে এখানেই বসবাস করছেন জাহিদা বেগম। তিনি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবিরেই বড় হয়ে উঠেছেন। এখন আন্তর্জাতিক সাহায্য বিষয়ক গ্রুপগুলোর জন্য কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কারো কোনো প্রয়োজন আছে কিনা এমন মানুষের সন্ধানে ঘোরেন তিনি। সেপ্টেম্বরের শেষের দিকের কথা। তখন মিয়ানমার থেকে তার উদ্বিগ্ন, ভীত সন্ত্রস্ত আত্মীয়রা তাকে ফোন করেন। তারা তাকে জানান, সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে। হাজার হাজার রোহিঙ্গা পালাচ্ছে। তখন ২৮ বছর বয়সী জাহিদা তাদের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি অর্ধ ডজন দেশে ফোন করেন। সেখানে থাকা আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে রোহিঙ্গাদের সহায়তার জন্য সংগ্রহ করেন কয়েক হাজার ডলার। তিনি মিয়ানমারে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের উদ্ধার করতে বোট ভাড়ার জন্য এ অর্থ সংগ্রহ করেন। এর একদিন পরে জাহিদা বেগমের আত্মীয়রা সহ আশপাশের গ্রামের প্রায় ৪০০ মানুষকে নিরাপদ করেন তিনি। তাদেরকে বাংলাদেশে আনার ব্যবস্থা করেন। ওই রাতেই উদ্ধার হন ৩৫ বছর বয়সী আবদুল মতলব। তিনি বলেন, জাহিদা যদি আমাদের কাছে ওইসব বোট না পাঠাতো তাহলে আমাদেরকে মিয়ানমারেই মরতে হতো। বাংলাদেশে বাঁশ ও প্লাস্টিকের ছাউনিতে তৈরি ছোট্ট আশ্রয়ে নিজের পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন মতলব। তবে এ শিবিরে একসঙ্গে ঘুমাতে হয় অনেক কষ্ট করে। জায়গায় হয় না। তিনি বলেন, শুধু তার গ্রাম থেকেই ৭০ জনের জীবন রক্ষা করেছেন জাহিদা। গ্রামের বাকি প্রায় ৪০০ মানুষকে হত্যা করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা।
জাহিদা বেগম লম্বা আলখাল্লা কালো পোশাক পরেন। আত্মবিশ্বাসী নারী। তার মাথায় স্কার্ফ। তিনি বেড়ে উঠেছেন রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের নির্যাতনের কাহিনী শুনতে শুনতে। বিশ্বে সবচেয়ে নির্যাতিত সম্প্রদায়ের মধ্যে অন্যতম এই রোহিঙ্গারা। তাদের কোনো ভোটাধিকার নেই। নেই নাগরিকত্ব। নেই চলাচলে স্বাধীনতা। নেই মৌলিক অধিকার। মিয়ানমার তাদেরকে ‘রোহিঙ্গা’ও বলে না। তাদেরকে তারা বাঙালি হিসেবে অভিহিত করে। তাদের দাবি, এরা বাংলাদেশী। অবৈধভাবে বসবাস করছে মিয়ানমারে। এবার আগস্টে নৃশংসতার কথা মিয়ানমারে অবস্থানরত আত্মীয়দের কাছ থেকে জানার আগেই জাহিদা বেগম শুনেছিলেন ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশনস’-এর ব্যাপারে। এই অভিযানের নামে সেনাবাহিনী নৃশংস নির্যাতন চালায় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে। এর ফলে পালিয়ে ৬ লাখ ১৮ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নেন বাংলাদেশে। জাতিসংঘ একে জাতি নিধন হিসেবে আখ্যায়িত করে।
এ কথা জানার পরই জাহিদা বেগম দ্রুত পদক্ষেপ নেন। তিনি বুঝতে পারেন রাখাইনে মা ও শিশুরা পালিয়ে আসার জন্য চেষ্টা করছেন। ১৯৯০ সালে মায়ের সঙ্গে তিনি পালিয়ে এসেছিলেন। সে বিষয়টি স্মরণ করতে পারেন জাহিদা। ওই সময়ে আড়াই লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এমন অবস্থায় বিদেশে ফোন করে জাহিদা বলেন, তাদের উচিত নাফ নদীর ওপাড়ে এগিয়ে যাওয়া। সেখানে উদ্ধারের অপেক্ষায় অনেক মানুষ। জাহিদা বলেন, আমার দেবর বসবাস করে বিদেশে। আমি তাকে ফোন করি। তাকে বলি, আমাদের ভাই-বোনেরা নাফ নদীর কাছে এসে পৌঁছেছে। তার কাছে জানতে চাই, কিভাবে আমরা এসব মানুষকে উদ্ধার করে বাংলাদেশে নিয়ে আসতে পারি। উল্লেখ্য, জাহিদা বেগম দোভাষী হিসেবে কাজ করেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো সাহায্য ও মানবিক সহায়তা বিষয়ক সংগঠনগুলোর জন্য স্বাস্থ্য শিক্ষা দিয়ে বেড়ান ঘর থেকে ঘরে।
জাহিদা বেগম বলেন, অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়াতে বসবাস করা আত্মীয়-স্বজনদের ফোন করে কয়েক ঘন্টার মধ্যে তিনি সংগ্রহ করে ফেলেন ৪০০০ ডলারের বেশি। এই অর্থ তার কাছে আসে একজন ব্যক্তির মাধ্যমে, যিনি এর জন্য বড় অংকের ফি হাতিয়ে নেন। এরপর জাহিদা ছুটে যান বাংলাদেশের উপকূলীয় গ্রাম শ্যামলাপুরে। সেখানে যোগাযোগ করেন এক জেলের সঙ্গে। এই গ্রামটি কুতুপাংয়ে তার আশ্রয় শিবিরের কাছেই। তাকে অনুরোধ করেন, দুটি বোট ভাড়া করতে এবং তা মিয়ানমার সীমান্তের দিকে পাঠিয়ে দেয়ার অনুরোধ করেন। এরপর দুটি বোটে করে ফিরিয়ে আনা হয় ৭০টি পরিবারকে। তাদেরকে উদ্ধার করতে বাংলাদেশ থেকে ৬০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে মিয়ানমারে পৌঁছায় বোট। রাতের অন্ধকারে বঙ্গোপসাগর, নাফ নদী দিয়ে ফিরে আসে রোহিঙ্গাদের নিয়ে। এ জন্য ৪২০০ ডলারের বেশি দাবি করা হয়। ওদিকে শ্যামলাপুরে বোট আসার অপেক্ষায় থাকেন জাহিদা। নিজের তৈরি বাঁশ ও প্লাস্টিকের ঘরে প্রথম দফায় আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেন তিনি। সাহায্য হিসেবে পাওয়া অর্থ থেকে প্রতিটি পরিবারকে তিনি দেন ৩৫ ডলার করে। তারপর তাদেরকে পাঠিয়ে দেন আশ্রয় শিবিরে। জাহিদা বলেন, তারা যদি নিরাপদ থাকে, সুস্থ থাকে তাতেই আমার সন্তুষ্টি। এর চেয়ে বড় পাওয়া আমার কাছে নেই।
(বার্তা সংস্থা এপির রিপোর্টের অনুবাদ)


আপনার মন্তব্য প্রেরণ করুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ফিল্ডসমূহ * এর মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে

*