ইরানের ইসলামি বিপ্লবের দিনগুলি (১-৪ পর্ব)

ইরানের ইসলামি বিপ্লবের দিনগুলি (১-৪ পর্ব)

ইরানের ইসলামী বিপ্লব, বিশ্ব ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। রাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসনের কষাঘাতে নিস্পেষিত ইরানি জনগণ ইমাম খোমেনী (রহ.)-র নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালে এই বিপ্লব সফল করেন। ইরানের বিপ্লব বিশ্বের ন্যায়কামী ও নির্যাতিতদের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে।

আবনা ডেস্ক: ইরানের ইসলামী বিপ্লব, বিশ্ব ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। রাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসনের কষাঘাতে নিস্পেষিত ইরানি জনগণ ইমাম খোমেনী (রহ.)-র নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালে এই বিপ্লব সফল করেন। ইরানের বিপ্লব বিশ্বের ন্যায়কামী ও নির্যাতিতদের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। ইরানের দুর্দণ্ড প্রতাপশালী ও স্বৈরাচারী শাহের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব খুব সহজ ছিল না। এজন্য বহু মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। সহ্য করতে হয়েছে চরম নির্যাতন ও দুঃখ-কষ্ট।

১ম পর্ব
অন্যায়-অত্যাচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে ইরানিদের সংগ্রামের ইতিহাস সুপ্রাচীন। ১৯৬০-র দশকে ইসলামী বিপ্লবের পথে চূড়ান্ত যাত্রা শুরু হলেও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ইরানিদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল আরও আগে। ১৯০৫ সালের সাংবিধানিক বিপ্লব এবং তেল সম্পদকে জাতীয়করণের জন্য ১৯৫০-র দশকের গণসংগ্রাম, বিংশ শতাব্দির আরও দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। সে যাইহোক, আমরা ফিরে আসছি ইসলামী বিপ্লবের পথে চূড়ান্ত যাত্রার ইতিহাসে।
১৯৬১ সাল। স্বৈরাচারি শাহ সরকার ইসলাম বিরোধী স্থানীয় পরিষদ আইন অনুমোদন করার সাথে সাথে ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ও জনগণ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ইমাম খোমেনী (রহ.) এই আইন বাতিলের আহ্বান জানালেন। কিন্তু শাহ প্রথমে তাতে কান দিলেন না। আন্দোলন আরও জোরদার হলো। এক বছরেরও কম সময়ের আন্দোলনে শাহ বিতর্কিত আইনটি বাতিল করতে বাধ্য হলেন। বলা যায়, সাফল্য দিয়েই বিপ্লবের পথে যাত্রা শুরু হলো।
১৯৬৩ সালের শুরুতে শাহ, শ্বেত বিপ্লব শীর্ষক একটি গণপ্রতারণামূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করে। বাস্তবে এই পরিকল্পনাটি ইরানি জনগণ ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ছিল। এ কারণে ইমাম খোমেনি (রহ.) ধর্মীয় নগরী কোম থেকে এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন। এরপরও এই পরিকল্পনার ব্যাপারে গণভোটের আয়োজন করা হয়। ইমাম খোমেনী এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ায় অধিকাংশ মানুষ গণভোট বয়কট করে। ইরানিরা শ্বেত বিপ্লব পরিকল্পনার প্রতিবাদে ঐ বছর ফার্সি নববর্ষের উৎসব পালন না করে শোকানুষ্ঠান পালন করেছিল। উল্লেখ্য, ইরানে প্রতিবছর অত্যন্ত জাকজমকপূর্ণভাবে ফার্সি নববর্ষ উদযাপিত হয়। নববর্ষ উৎসবকে ইরানের সবচেয়ে বড় আনন্দ উৎসবও বলা যেতে পারে। কিন্তু সেদিন ইরানিরা ইমাম খোমেনীর প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে তাদের এই গুরুত্বপূর্ণ উৎসব পালন থেকে বিরত ছিলেন। ইরানি জনগণের অবিশ্বাস্য এ পদক্ষেপের কারণে শাহ তার ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে। সাথে সাথে ধর্মীয় নগরী কোমে হামলা চালানোর নির্দেশ জারি হয়। শাহের পেটোয়া বাহিনী কোমে হানা দেয়। শহীদ হন ছাত্র-শিক্ষকসহ বেশ কয়েক জন। শাহের বাহিনীর এই নির্মম হামলার নিন্দা জানিয়ে পরের দিনই ইমাম খোমেনী (রহ.) বিবৃতি প্রকাশ করেন।
এর কিছু দিন পরই বিশ্বনবীর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসেন (আ.)-র শাহাদাতের স্মৃতিবিজড়িত মহররম মাস শুরু হয়। ইরানের জনগণ শোকাবহ এই মাসে বিভিন্ন শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করে এবং এসব অনুষ্ঠানে বিজ্ঞ আলেম ও বিশিষ্টজনেরা বক্তব্য রাখেন। এ অবস্থায় শাহের নির্যাতন ও অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করার জন্য ইমাম খোমেনী (রহ.) মহররম মাসকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান। এই আহ্বানের পরপরই শোকানুষ্ঠানে বক্তারা শাহের নানা অপকর্মের বিবরণ তুলে ধরতে শুরু করেন।
দশই মহররমকে আশুরা বলা হয়। ইমাম হোসেন (আ.)’র শাহাদাৎ দিবস বা আশুরার দিনে গোটা ইরান শোকাচ্ছন্ন থাকে। এদিনের শোকানুষ্ঠানে কোটি কোটি মানুষ অংশ নেয়।
১৯৬৩ সালের এমনি এক দিনে ইমাম খোমেনী শাহের ধর্ম ও দেশ বিরোধী তৎপরতা সম্পর্কে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন,যা আশুরার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পড়ে শোনানো হয়। এই বিবৃতি প্রকাশের অপরাধে শাহের বাহিনী ১৯৬৩ সালের ৫ই জুন ইমাম খোমেনী (রহ.)-কে গ্রেফতার করে তেহরানের কারাগারে প্রেরণ করে।
ইমাম খোমেনী (রহ.)-কে গ্রেফতারের খবর বাতাসের গতিতে গোটা ইরানে ছড়িয়ে পড়ে এবং জনতা রাস্তায় নেমে ইমামের মুক্তির দাবিতে শ্লোগান দেয়। শাহের বাহিনী অস্ত্র নিয়ে বিক্ষোভকারীদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। রক্তাক্ত হয় রাজপথ। রাজধানী তেহরান ও ধর্মীয় কোমসহ সারা দেশে শহীদ হয় কয়েক হাজার ন্যায়কামী মানুষ।
আন্দোলন বাহ্যত স্তিমিত হয়ে আসে। ইমাম খোমেনীকে কিছুদিন সেনা ঘাঁটিতে এবং প্রায় ১০ মাসের মতো একটি বাড়ীতে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়ে আসায় শাসক গোষ্ঠী ধরেই নিয়েছিল যে, ইমাম খোমেনী (রহ.) তার আন্দোলনের সাহস হারিয়ে ফেলেছেন এবং জনতাও আর নতুন করে আন্দোলন গড়ে তোলার দুঃসাহস দেখাবে না। এ কারণে ১৯৬৪ সালের এপ্রিল মাসে ইমাম খোমেনীকে মুক্তি দেয়া হয়। কিন্তু ইমাম খোমেনী (রহ.) মুক্তি পাবার পর কয়েক দিন পরই শাহ সরকারের বিরুদ্ধে এক জ্বালাময়ী ভাষণ দেন। তিনি বিজাতীয়দের উপর শাহের নির্ভরতার কড়া সমালোচনা করেন এবং জনগণকে প্রতিরোধ গড়ে তুলার আহ্বান জানান। এর কিছু দিন না যেতেই আবারও শোকের মাস মহররম এসে উপস্থিত হয়। ঐ বছরের শোকানুষ্ঠানগুলোও শাহের অন্যায়-অপকর্ম ফাঁস করার অনুষ্ঠানে রূপ নেয়। এসব শোকানুষ্ঠানে আগের বছরের একই মাসে শাহের বাহিনীর হামলায় যারা শহীদ হয়েছিল তাদেরকেও স্মরণ করা হয় গভীর শ্রদ্ধাভরে।
১৯৬৪ সালের অক্টোবর মাসে শাহ তার অনুগত সংসদকে দিয়ে ক্যাপিটিউলেশন বিল পাস করিয়ে নেয়। এই বিলটি ইরানের স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্বের জন্য অপমানজনক ছিল। এই আইনের কারণে ইরানে কোন মার্কিন নাগরিকের বিচার করা যেত না। এক কথায় ইরানে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদেরকে বিচারের উর্ধ্বে রাখা হয়েছিল। ইরানের স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্ব বিরোধী এই ক্যাপিটিউলেশন আইনের বিরুদ্ধে সমগ্র জাতি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ইমাম খোমেনী এই আইনের ধ্বংসাত্বক প্রভাব সবার সামনে তুলে ধরেন। মহান এই নেতা শাহের অন্যায় ও দুর্নীতি সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করে তোলার পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে জনগণের দুঃখ-কষ্টের প্রধান হোতা হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি বলেছিলেন, বর্তমানে আমাদের দুঃখ-কষ্টের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দখলদার ইসরাইলই দায়ী। কারণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিবাদী ইসরাইলের পরামর্শে ইরানের স্বৈরাচারী সরকার, ইরানিদের জীবন দুর্বিসহ করে তুলেছিল।
এ অবস্থায় ইমাম খোমেনীর যুক্তিপূর্ণ ওই ভাষণ শাহের সরকারকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলে। তারা এই ভীতি কাটিয়ে ওঠার জন্য ইমাম খোমেনীকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইমামকে ১৯৬৪ সালের ৪ নভেম্বর তুরস্কে এবং এর ১১ মাস পর ইরাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। আর এভাবেই ইমামের ১৪ বছরব্যাপী নির্বাসিত জীবনের সূচনা হয়। ইমাম যখন নির্বাসনে তখনও ইরানে কম-বেশি আন্দোলন অব্যাহত ছিল। শাহের বাহিনীর দমন-পীড়নের কারণে বাহ্যত মাঠে-ময়দানের আন্দোলন স্তিমিত থাকলেও ভেতরে ভেতরে ন্যায়কামীরা তাদের প্রস্তুতি অব্যাহত রাখে। এর প্রমাণ পাওয়া যায়, ১৯৬৫ সালের ২০ শে জানুয়ারি। এদিন ইসলামী মুতালেফে পার্টির কয়েক জন সদস্য শাহের অনুগত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হাসান আলী মানসুরকে হত্যা করে। পরে অবশ্য শাহের বাহিনী এই হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদেরকে ফায়ারিং স্কোয়াডে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। #

২য় পর্ব
ইমাম খোমেনী (রহ:)-র নির্বাসিত জীবনের সূচনা হয় ১৯৬৪ সালের ৪ নভেম্বর। তুরস্কে ১১ মাস রাখার পর ইমামকে ইরাকে পাঠানো হয়। ইমাম খোমেনী (রহ:)-কে ইরান থেকে সরিয়ে দেয়ার পর শাহ বিরোধী আন্দোলন সাময়িকভাবে কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। এ সময় শাহের নিরাপত্তা বাহিনী খোঁজে খোঁজে আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার করতে থাকে এবং গ্রেফতারকৃতদের অনেককেই হত্যা করে। শাহের বাহিনীর নির্যাতনে অনেকেই পঙ্গু হয়ে যায়। শাহের স্বৈরাচারী সরকার তার গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থা সাভাককে আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী করে। সাভাক সদস্যদের প্রধান দায়িত্বই ছিল শাহ বিরোধীদের সনাক্ত করে তাদের গ্রেফতার করা এমনকি প্রয়োজনে হত্যা করা। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং ইসরাইলি গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ, ইরানের সাভাকের সদস্যদেরকে এ ব্যাপারে সব ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল।
সেদিনের ইরানের মানুষ কিন্তু আজকের মতো অর্থনৈতিক দিক থেকে এতটা সমৃদ্ধ ছিল না। কারণ তেল খাত থেকে অর্জিত অর্থ জনকল্যাণে ব্যয় না করে শাসক শ্রেনীর ভোগ-বিলাসে খরচ করা হতো। জনগণের অর্থের একটা বড় অংশ ব্যয় হতো, শাহের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দখলদার ইসরাইলের সমর্থন অটুট রাখার জন্য। ফলে ইরানের সাধারণ জনগণ অতিকষ্টে দিনাতিপাত করতো। অন্যদিকে, শাহ সাধারণ মানুষকে অভুক্ত রেখে বিদেশী অতিথিদের ডেকে এনে কোটি কোটি ডলার খরচ করে জাঁকজমকপূর্ণ নানা উৎসব পালন করতো। ১৯৬৬ সালে শাহ তার ক্ষমতা গ্রহণের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে চোখ ধাঁধাঁনো এক উৎসবের আয়োজন করে। এরপর ১৯৭১ সালে ইরানে রাজতান্ত্রিক শাসনের আড়াই হাজার বছর উপলক্ষে ব্যয়বহুল এক উৎসবের আয়োজন করা হয়। এই উৎসবে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও রাজা-বাদশাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এই উৎসব উপলক্ষ্যে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করা হয়েছিল। নিজেকে পরাক্রমশালী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছিল সেই উৎসবের মাধ্যমে। এখানেই শেষ নয়। পরের বছর এই উৎসবের বর্ষপূর্তিও পালন করা হয় বেশ ধুমধামের সাথে।
এরপর ১৯৭৫ সালে, পাহলভি বংশের রাজ সিংহাসন দখলের ৫০ বছর পূর্তি পালন করা হয় ব্যাপক আয়োজনের মাধ্যমে। ইরানের সাধারণ মানুষ যখন দারুণ অর্থকষ্টে ভুগছিল তখন এ ধরনের ব্যয়বহুল অনুষ্ঠান যেন শাহের পতনকেই ত্বরান্নিত করছিল। ইরানের সাধারণ জনগণ তখন তাদের মৌলিক চাহিদাগুলোও পুরণ করতে অপারগ ছিল।
শাহ ছিল ইসলাম বিদ্বেষী। এ কারণে ইরানে ইসলামের প্রভাব ক্ষুন্ন করার জন্য তিনি ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করেন। রাজতান্ত্রিক শাসনের আড়াই হাজার বছর উপলক্ষ্যে বিশাল আয়োজনের একটি বড় লক্ষ্য ছিল, ইরানের ইতিহাস থেকে ইসলাম ধর্মকে মুছে ফেলা। শাহ তার ইসলাম বিরোধী তৎপরতার অংশ হিসেবে ইরানে হিজরী সালের পরিবর্তে শাহী সালের প্রবর্তন ঘটিয়েছিল। শাহ ১৯৭৬ সালের মার্চ মাসে, আড়াই হাজার বছর আগে থেকে অর্থাৎ রাজতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার সময় থেকে তারিখ গণনার নির্দেশ জারি করে।
ইরানে সে সময় শাহের অনুগত কয়েকটি রাজনৈতিক দল গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু শাহ ১৯৭৫ সালে ঐসব পার্টিকেও বিলুপ্ত ঘোষণা করে নিজের নেতৃত্বে রাস্তখিয নামক একটি দল প্রতিষ্ঠা করে। শাহ অর্থাৎ মোহাম্মদ রেজা ঐ দল গঠনের পর দম্ভভরে বলেছিল, কেউ চাক বা না চাক, ইরানের সকল মানুষই এখন একটি মাত্র দল অর্থাৎ রাস্তখিয পার্টির সদস্য। কেউ মেনে না নিলে তা ঘোষণা করতে পারে, তাহলে আমরা তাকে পার্সপোর্ট দিয়ে দেশ থেকে বিদায় করে দিতে পারব। আর কেউ যদি দেশ ছেড়ে যেতে না চায় তাহলে তার আশ্রয় হবে কারাগারে।
শাহ এ ধরনের দম্ভোক্তির জন্য সাহস পেয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। মার্কিন সরকার শাহকে তার ইসলাম বিদ্বেষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছিল। শাহ ধরেই নিয়েছিল যে, মার্কিন ষড়যন্ত্রের কাছে জনগণের আন্দোলন পরাস্ত হবে এবং তিনি আজীবন তার অন্যায়-অপকর্ম চালিয়ে যেতে পারবেন।
ইমাম খোমেনী (রহ:)-র অনুপস্থিতিতে ইরানে শাহ বিরোধী কয়েকটি গেরিলা সংগঠন প্রতিষ্ঠা লাভ করে। গেরিলা আন্দোলনে ইসলামপন্থীদের বাইরে অন্যান্য মতবাদের অনুসারীরাও যোগ দিয়েছিল। কিন্তু এসব গেরিলা সংগঠন খুব একটা সফল হতে পারেনি। ইমাম খোমেনী (রহ:)সহ ইরানের অধিকাংশ ধর্মীয় নেতাই মনে করতেন, বিপ্লব সফল করার জন্য প্রথমে মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে। আর এ লক্ষ্যে তারা ইসলামী শিক্ষা প্রচার এবং শাহের অন্যায়-অপকর্ম ও দুর্নীতির তথ্য ফাঁস করে দিতে থাকেন। অবশ্য এ কাজটিও খুব সহজ ছিলনা। কারণ সে সময় শাহের বিরোধিতা করলেই তাকে গ্রেফতার করা হতো। কোন আলেম, শাহের জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বললে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াবার আহ্বান জানালে তার ওপর অসহনীয় নির্যাতন চালানো হতো এবং নির্বাসনে পাঠানো হতো।
সে সময় পরিস্থিতি এতটাই শ্বাসরুদ্ধকর ছিল যে, ইমাম খোমেনী (রহ:)-র প্রতি সমর্থন ঘোষণার কারণে ১৯৭০ সালে ইরানের শীর্ষ স্থানীয় আলেম আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোহাম্মদ রেজা সায়িদীকে গ্রেফতার করে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়। ১৯৭৪ সালে একই কারণে অপর আলেম আয়াতুল্লাহ গাফ্ফারিকে গ্রেফতার ও হত্যা করা হয়। এরপর ১৯৭৬ সালের জুন মাসে ইরানের মুসলিম চিন্তাবিদ ড. আলী শারিয়াতি সন্দেহজনক ভাবে মৃত্যুবরণ করেন। মুসলিম ছাত্র সমাজের উপর ড. আলী শারিয়াতির ব্যাপক প্রভাব ছিল এবং মনে করা হয়, শাহের অনুচরদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। এতসব প্রতিবন্ধকতার পরও ইরানের আলেমগণ ও ন্যায়কামীরা জনগণকে সচেতন করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখেন। তারা শাহের জুলুম-নির্যাতন, ভোগ-বিলাসিতা, ইসলাম বিদ্বেষ, দুর্নীতি, মার্কিন ও ইহুদিবাদ প্রীতি সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করতে থাকেন।
ইসলামী বিপ্লব সফল হবার কয়েক বছর আগে বিশ্বে জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ করে বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের অকুন্ঠ সমর্থনের কারণে ইরানের শাহ আরও বেশি দাম্ভিক হয়ে ওঠে। সে সময় ইরানের শাহ সরকার, গোটা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ সংরক্ষণ করার দায়িত্ব পালন করতো। তবে তার প্রশাসনে দুর্নীতি ও বৈষম্য ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।

৩য় পর্ব
১৯৬৪ সালের চৌঠা নভেম্বর ইমামের নির্বাসিত জীবনের সূচনা হবার পর ইরানে স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়ে এলেও বিপ্লবের প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায়নি। ইমাম খোমেনী (রহ.) নির্বাসনে থেকেই ইরানিদেরকে বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। এ সময় তিনি তার প্রিয় সন্তানকে হারান। এ পর্বে এসব বিষয় নিয়েই আলোচনা করা হবে।
ইমাম খোমেনী (রহ.) বিদেশে অবস্থান করলেও তিনি সব সময় ইরানি জনগণকে স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত করার চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। নির্বাসনে থেকেও তিনি শাহের অন্যায়-অপকর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন। ইমাম খোমেনীর পাশাপাশি ইরানে অবস্থানকারী তার সহযোগীরাও জনগণকে সজাগ ও সচেতন করে তোলার ব্যাপারে সোচ্চার ছিলেন। এর মধ্য দিয়েই ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের উপযুক্ত ক্ষেত্র প্রস্তুত হতে থাকে।এমনি এক পরিস্থিতিতে ১৯৭৭ সালের ২৩ শে অক্টোবর ইমাম খোমেনী (রহ.)-র জেষ্ঠ পুত্র আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোস্তফা খোমেনী ৪৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। ইমামের এই সন্তানের মৃত্যুর পেছনে ইরানের শাহ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী এবং ইরাকের বাথ সরকারের হাত ছিল বলে সবাই বিশ্বাস করেন। তাদের সম্পৃক্ততার ব্যাপারে কিছু তথ্য-প্রমাণও রয়েছে।
ইমাম খোমেনী (রহ.)-র জেষ্ঠ পুত্র আয়াতুল্লাহ মোস্তফা খোমেনী একজন আদর্শ মানুষ ছিলেন। তিনিও তার পিতার মতোই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। ইরানের স্বৈরাচারী শাহ সরকারের বিরোধিতা করার কারণেই আয়াতুল্লাহ মোস্তফা খোমেনীকেও গ্রেফতার করে তুরস্কে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। ইমাম খোমেনী (রহ.)-কে নির্বাসনে পাঠানোর কিছু দিন পরই এই ঘটনা ঘটে। এরপর মোস্তফা খোমেনীকেও তার পিতার সাথে ইরাকে পাঠানো হয়। ইরাকে পৌছে তিনি তার পিতা ইমাম খোমেনী (রহ.) এবং সেখানকার বিখ্যাত আলেমদের কাছ থেকে আরও উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণে মনোনিবেশ করেন। সাইয়্যেদ মোস্তফা খোমেনী সব সময় তার পিতার সহযোগী ও উপদেষ্টা হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন।
ইরানের শাহ সরকার ভেবেছিল পুত্রের মৃত্যুর ফলে ইমাম খোমেনী (রহ.) অত্যন্ত ভেঙ্গে পড়বেন এবং সত্য প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে সরে যাবেন। কিন্তু শাহ সরকারের সেই আশা পূর্ণ হয়নি। ইমাম খোমেনী তার সন্তানের মৃত্যুতে অত্যন্ত কষ্ট পেলেও আন্দোলন অব্যাহত রাখার ব্যাপারে তিনি ছিলেন দৃঢ়সংকল্প। এ ব্যাপারে তার অবস্থানে বিন্দু পরিমাণ ছেদ পড়েনি। সন্তানের শাহাদাতের পর তিনি এক ভাষণে স্বৈরাচারী শাহের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী ভাষণ দেন এবং ইরানি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
ইমাম খোমেনী (রহ.)-র জেষ্ঠ পুত্রের সন্দেহজনক মৃত্যুর খবরকে শাহ সরকার সেন্সর করলেও বিভিন্ন মাধ্যমে তা জনগণের কাছে পৌছে যায় এবং জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। আয়াতুল্লাহ মোস্তফা খোমেনীর স্মরণে ইরানে বিশেষ অনুষ্ঠান উদযাপন করা হয় এবং প্রায় তের বছর পর এই প্রথম প্রকাশ্যে জনসমাবেশে ইমাম খোমেনীর নাম উচ্চারিত হয়। এর প্রায় তিন মাস পর ইরানে শাহের অনুগত একটি পত্রিকায় ইমাম খোমেনী (রহ.)-র প্রতি কটূক্তি করে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ১৯৭৮ সালের ৯ই জানুয়ারি শাহের সরাসরি নির্দেশে এত্তেলাত পত্রিকায় প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়।
প্রবন্ধটি প্রকাশিত হবার পরপরই জনতা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং ইরানের ধর্মীয় নগরী কোমে এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। প্রবন্ধটি প্রকাশিত হবার পরের দিন অর্থাৎ ১০ই জানুয়ারি এর প্রতিবাদে কোমের ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মঘট পালিত হয় এবং ছাত্ররা বিক্ষোভে অংশ নেয়। ১১ ই জানুয়ারি ছাত্রদের সাথে একাত্বতা ঘোষণা করে কোমের সাধারণ মানুষও বিক্ষোভে ব্যাপক ভাবে অংশ নেয়। ফলে কোম শহর বিক্ষোভের নগরীতে পরিণত হয়।
অতীতের মতোই বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। হতাহত হয় বহু মানুষ। বিক্ষোভকারীদের উপর ভয়াবহ এই হামলার পর বাহ্যত ঐ আন্দোলনটি স্তিমিত হলেও সবার কাছে এটা স্পষ্ট হয় যে, সচেতন ইরানিরা শাহের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য সব সময় প্রস্তুত রয়েছে। কোমে অনুষ্ঠিত ঐ বিক্ষোভের পর এ বিষয়টিও স্পষ্ট হয় যে, ইরানিরা ১৩ বছর ধরে ইমাম খোমেনীর অনুপস্থিতির পরও তাকেই নিজেদের নেতা বলে মনে করে এবং ইমামের অবমাননাকে তারা কোন ভাবেই মেনে নেবে না। ইরানের শাহ সরকার ও সহযোগী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভাবতেও পারেনি যে, রাষ্ট্রীয় ভাবে ব্যাপক অপপ্রচারণার পরও ইরানি জনগণ তাদের ধর্ম এবং ধর্মীয় নেতাকে এত বেশী ভালোবাসেন। এরপরও স্বৈরাচারী শাহ সরকার এই ভেবে স্বস্তি অনুভব করছিল যে, কোমের আন্দোলন থেমে গেছে এবং নতুন করে এ ধরনের ঘটনার পুণরাবৃত্তি আর সম্ভব নয়। কিন্তু ওই ঘটনার ৪০তম দিবসে শহীদদের স্মরণে ইরানের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তাব্রিজে বিপ্লবী আলেম আয়াতুল্লাহ কাজী তাবাতাবায়ির আহ্বানে চেহলামের অনুষ্ঠানে শাহের নিরাপত্তা বাহিনী হামলা চালায়। এতে বেশ কয়েক জন হতাহত হয়। আর এই ঘটনার পর গোটা তাব্রিজের মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং রাস্তায় নেমে শাহ বিরোধী বিভিন্ন শ্লোগান দিতে থাকে। এ অবস্থায় শাহের সেনাবাহিনী ট্যাংক ও সাজোয়া যান মোতায়েন করে এবং বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক হামলা চালায়। সেনাবাহিনীর হামলায় বহু লোক শাহাদাৎবরণ করেন এবং শত শত মানুষ মারাত্বক আহত হয়। তাব্রিজের ঐ গণজাগরণের পর তখনি সবাই এটা উপলব্ধি করতে থাকে যে, ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের সময় ঘনিয়ে এসেছে এবং শাহের বিরুদ্ধে বিপ্লব সফল হবে।
ইমাম খোমেনী (রহ.) সে সময় ইরাকে নির্বাসনে ছিলেন এবং তিনি সেখান থেকেই গভীরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনি তাব্রিজের রক্তক্ষয়ী ঘটনা পর্যবেক্ষণের পর ইরানি জনগণের প্রতি এক শোক বার্তায় বলেন, শাহের এটা জানা উচিত যে, ইরানিরা তাদের পথ খোজেঁ পেয়েছে এবং অপরাধীদেরকে পর্যবসিত করে প্রতিশোধ না নেয়া পর্যন্ত তারা থামবেনা। আল্লাহর ইচ্ছায় গোটা ইরানের মানুষ শাহ সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়ে ওঠেছে ও এই প্রতিবাদ আরও জোরালো হবে এবং স্বৈরাচারী শাহের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য সম্মানিত আলেমদের মাধ্যমে ইসলামের পতাকা উত্তোলিত হবে।
ইমাম খোমেনী (রহ.) এরপর ঐ বছর ফার্সি নববর্ষ উপলক্ষ্যে আবারও কোম ও তাব্রিজের শহীদদের আত্মদানের কথা ইরানীদের স্মরণ করিয়ে দেন। সে বছর ইরানিরা নববর্ষের আনন্দে ডুবে না গিয়ে বিপ্লব সফল করার উপায় নিয়ে ভাবতে থাকেন এবং নিজেদের মধ্যে ঐক্য অটুট রাখার লক্ষ্যে কাজ করে যেতে থাকেন। আর এভাবেই বিপ্লবের পথে অগ্রযাত্রা ত্বরান্নিত হয়।

৪র্থ পর্ব
১৯৭৮ সালের ২৯ শে মার্চ। পরিস্থিতি তখনও থমথমে। মানুষ শাহের ওপর ভীষণ ক্ষুব্ধ। কোমের বিক্ষোভে গুলির পর তাব্রিজের শোকানুষ্ঠানে নৃশংস হামলা; মানুষের ধৈর্যের বাধ যেন ভেঙ্গে যাচ্ছিল। তাব্রিজের শহীদদের স্মরণে শোকানুষ্ঠান শেষ করেই ক্ষুব্ধ জনতা দলে দলে রাস্তায় নেমে আসে। তারা প্রকাশ্যে শাহের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শ্লোগান দেয়। হত্যাকান্ডের পুণরাবৃত্তির ব্যাপারে মানুষরূপী হায়েনাদের সতর্ক করে দেয়া হয়।
২৯ শে মার্চ কোন অঘটন না ঘটলেও ৩০ শে মার্চ ইরানের আরেক শহর ইয়াযদের রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়। ইমাম খোমেনী (রহ.)-র ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও বিখ্যাত আলেম আয়াতুল্লাহ সাদুকি ইমামের মুক্তির দাবিতে ইয়াযদ জামে মসজিদে এক সমাবেশের আয়োজন করেছিলেন। সমাবেশ শেষে উপস্থিত জনতা রাস্তায় শাহের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নেয়। সেদিনের বিক্ষোভও শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হতে দেয়নি শাহের বাহিনী। বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। ঐ হামলায় ১৫ জন বিক্ষোভকারী শহীদ এবং আরও অনেকে আহত হন। কিন্তু সেদিন শাহের বাহিনী গুলি চালিয়েও বিক্ষোভ বন্ধ করতে পারেনি। ওই বিক্ষোভ টানা তিনদিন অব্যাহত ছিল। শাহের নির্যাতন যত বাড়ছিল আন্দোলনও ততটাই বেগবান হচ্ছিল।
ইসলামী বিপ্লবের সেই দিনগুলির ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শহীদদের স্মরণে আয়োজিত শোকানুষ্ঠানগুলো ইসলামী বিপ্লবকে সফল করার ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। বিভিন্ন মুসলিম দেশের মতো ইরানেও কেউ মারা গেলে এর তৃতীয়,সপ্তম ও চল্লিশতম দিবসে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এসব অনুষ্ঠানে মৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবসহ শুভানুধ্যায়ীরা অংশ নেন এবং মরহুমের পরকালীন শান্তির জন্য দোয়া করেন। ইরানে বিপ্লবের দিনগুলিতে স্বৈরাচারী শাহের বাহিনীর হাতে শহীদদের স্মরণে বিভিন্ন দিবসে যেসব অনুষ্ঠান হতো,তাতে মানুষের ব্যাপক সমাবেশ ঘটতো। কোন কোন শহীদের স্মরণে ইরানের প্রায় সকল শহরে শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। এর প্রধাণ কারণ হলো, শহীদদের প্রতি জনগণের গভীর শ্রদ্ধাবোধ। সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা জীবনদান করেন,ইরানীরা তাদেরকে অতি আপনজন বলে মনে করে। শহীদদের স্মরণকে তারা অপরিহার্য বলে বিশ্বাস করেন। কাজেই শাহ প্রতিটি হত্যার মাধ্যমে নিজেরই পতন ডেকে আনছিলেন। একেকটি শাহাদাতের ঘটনা অন্তত তিনটি শোক সমাবেশের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতো। শহীদদের স্মরণে তৃতীয়,সপ্তম ও চল্লিশতম দিবসে যেসব অনুষ্ঠান হতো, তার প্রত্যেকটিতে স্বাভাবিক ভাবেই স্বৈরাচারী শাহের বিরুদ্ধে কথাবার্তা হতো এবং বিপ্লবী আন্দোলন নতুন মাত্রা পেত। শহীদদের রক্ত যাতে বৃথা না যায়, সে ব্যাপারে ইরানীরা শপথ নিতো। ইরনের সমকালীন ইতিহাস সম্পর্কে পাশ্চাত্যের লেখক জন ফুরান একটি বই লিখেছেন। 'কঠোর প্রতিরোধ' নামক ঐ বইয়ে তিনি বিপ্লব সফল করার ক্ষেত্রে চেহলাম অনুষ্ঠানের ভূমিকা সম্পর্কে লিখেছেন, শাহ সরকার চেহলাম উপলক্ষ্যে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশগুলোর বিষয়ে আগে থেকে ভাবতেও পারেনি। ইরানে কেউ শহীদ হলে তাদের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী শাহাদাতের চল্লিশতম দিবসে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। ১৯৭৮ সালের ৯ই জানুয়ারি কোম শহরে যারা শহীদ হয়েছিল তাদের স্মরণে ১৮ই ফেব্রুয়ারি তাব্রিজ,কোম, মাশহাদ এবং আরও নয়টি শহরে চেহলামের আয়োজন করা হয়। পুলিশ তাব্রিজের অনুষ্ঠানে সেদিন এক যুবককে গুলি করে হত্যা করে। এরপরই ক্ষুব্ধ জনতা রাস্তায় নেমে আসে। তাদের উপরও হামলা চালানো হয়। ঐ ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তি প্রাণ হারায়। তাব্রিজের শহীদদের চেহলাম দিবসে ৫৫ টি শহরে পুলিশের সাথে জনতার সংঘর্ষ হয়।
ইরানের জনগণের মাঝে প্রথম দিকে যে ভীতি কাজ করছিল ক্রমান্নয়ে তা দূরীভুত হয় এবং শাহের দমন-পীড়ন আন্দোলনে সাধারণ জনগণের সম্পৃক্ততাকে আরও বেশি জোরদার করে। আর এর মাঝে নির্বাসনে থেকেই ইমাম খোমেনী (রহ.) নিয়মিত দিক-নির্দেশনামূলক বাণী পাঠাতে থাকেন। ইমামের বক্তব্যে বারবারই আশাবাদ ফুটে ওঠত। তার আশাবাদ থেকে জনগণ শক্তি ও সাহস সঞ্চয় করতেন। ইমাম খোমেনী (রহ.) সব সময় ঐক্য বজায় রেখে সংগ্রাম চালিয়ে যাবার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এর ফলে মানুষ ঐক্যবদ্ধ ভাবে তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখে এবং পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে থাকে।
এর কয়েক মাস আগেও ইরানে ভালো কোন বিশেষণ যোগ না করে শাহের নাম উচ্চারণ করলে বা তার সামান্যতম সমালোচনা করা হলে কঠোর শাস্তি পেতে হতো। শুধু শাহ নয় তার পরিবারের কারো সমালোচনা করা নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু আন্দোলন বেগবান হবার সাথে সাথে সেসব নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতাও লোপ পায়। ইরানের জনগণ তাদের নিজস্ব মত-পার্থক্য ভুলে ইমাম খোমেনী (রহ.)-র নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ থাকতে পেরেছিলেন বলেই আজ স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ পেয়েছেন এবং স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারছেন।


আপনার মন্তব্য প্রেরণ করুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ফিল্ডসমূহ * এর মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে

*

پیام رهبر انقلاب به مسلمانان جهان به مناسبت حج 1441 / 2020
conference-abu-talib
We are All Zakzaky