সুনামগঞ্জে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ;

গাফিলতির কারণেই ডুবেছে হাজার কোটি টাকার ধান

সুনামগঞ্জে এ বছর ২ লাখ ২৩ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়। কৃষকেরা বলছেন, ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে ৯০ শতাংশ ফসলের খেত তলিয়ে গেছে।

আবনা ডেস্ক: ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে গাফিলতির কারণেই সুনামগঞ্জের হাওরে হাজার কোটি টাকার বোরো ধান তলিয়ে গেছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই অভিযোগ তুলেছেন। তাঁরা গাফিলতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন।
গত বুধবার বিকেলে সুনামগঞ্জ পৌর শহরে হাওরে ফসলডুবির প্রতিবাদে আয়োজিত এক সমাবেশে সুনামগঞ্জ-৪ আসনের (সদর ও বিশ্বম্ভরপুর) সাংসদ পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি করেন। পাশাপাশি সুনামগঞ্জকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
সুনামগঞ্জে এ বছর ২ লাখ ২৩ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়। কৃষকেরা বলছেন, ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে ৯০ শতাংশ ফসলের খেত তলিয়ে গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সুনামগঞ্জ কার্যালয় এ বছর জেলার ৪২টি হাওরের বোরো ফসল রক্ষায় ৫৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয়ে বাঁধ নির্মাণের কাজ করছে। এর মধ্যে ৭৬টি প্যাকেজে প্রায় ৪৮ কোটি টাকার কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। বাকি টাকার কাজ করছে স্থানীয়ভাবে গঠিত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি)। পিআইসির কাজ হচ্ছে বাঁধের ভাঙা অংশ সংস্কার করা আর ঠিকাদার করছে নতুন বাঁধ নির্মাণ। কাজের সময়সীমা ছিল ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি। পরে ঠিকাদারদের কাজের সময় ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
তবে পাউবোর কর্মকর্তারাই বলছেন, সুনামগঞ্জে এবার অসময়ে ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল নামার কারণেই ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এর জন্য শুধু বাঁধ নির্মাণকে দায়ী করা যাবে না। পিআইসি গঠনসহ নানা কারণে এবার কাজ শুরু হয় জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে। এ কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। গত ১৩ মার্চ পর্যন্ত ১২টি বাঁধের কাজ শুরু না করায় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের চিঠি দেয় পাউবো।
কাজ পাওয়া ঠিকাদারদের তালিকা পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ৭৬টি বাঁধের কাজের মধ্যে ৩৭ কোটি টাকার ৩২টি বাঁধের কাজ পেয়েছে ছয়টি প্রতিষ্ঠান। এই ছয়টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চারটি আবার জেলার বাইরের। তালিকায় দেখা গেছে, মেসার্স খন্দকার শাহীন আহমদ ১০ কোটি ৩৫ লাখ টাকার নয়টি বাঁধ নির্মাণের কাজ পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ফরিদপুর জেলার গোয়ালচামট এলাকার। চারটি বাঁধের কাজ শুরু না করায় গত ১৩ মার্চ পাউবো থেকে ওই প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেওয়া হয়।
মেসার্স গুডম্যান এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান পেয়েছে ৩ কোটি ৩৩ লাখ ৫৯ হাজার টাকার আরও সাতটি বাঁধের কাজ। ঠিকানা সুরাইয়া হাউস, আকুরটাকুরপাড়া, টাঙ্গাইল। সুনামগঞ্জের সজীব রঞ্জন দাশ পেয়েছেন ৭ কোটি ৮১ লাখ ৪ হাজার টাকার নয়টি বাঁধ নির্মাণের কাজ। ১৫৪, মতিঝিল ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নুনা এন্টারপ্রাইজ পেয়েছে ৫ কোটি ১৪ লাখ ৭০ হাজার টাকার দুটি বাঁধ নির্মাণের কাজ। সুনামগঞ্জের স্টেশন রোড এলাকার মেসার্স নূর ট্রেডিং পেয়েছে ৩ কোটি ৭৭ লাখ ২৩ হাজার টাকার তিনটি ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ। ৯৯, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইব্রাহিম অ্যান্ড মো. শামীম আহসান নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পেয়েছে হাওরের একটি বাঁধ নির্মাণের ৩ কোটি ৫৪ লাখ ৮ হাজার টাকার কাজ। কুমিল্লার হাউজিং এস্টেট এলাকার ম্যাম কনস্ট্রাকশন নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২ কোটি ৯৯ লাখ ১৪ হাজার টাকার একটি বাঁধ নির্মাণের কাজ পেয়েছে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার খরচার হাওরে একটি বাঁধের কাজ করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এলএন কনস্ট্রাকশনের প্রতিনিধি আলমগীর হোসেন বলেছেন, ‘প্রথম দিকে বাঁধের কাজে মাটি পেতে সমস্যা হওয়ায় কাজ শুরু হয়েছে দেরিতে। পরে অবশ্য আমরা ঠিকমতো কাজ করেছি। এই হাওরে আমাদের বাঁধ ভেঙে নয়, পানি ঢুকেছে নদীর তীর উপচে।’
ঠিকাদার সজীব রঞ্জন দাশ মুঠোফোন না ধরায় তাঁর সঙ্গে কথা বলা যায়নি। সুনামগঞ্জ পাউবো থেকে দেওয়া তালিকায় জেলার বাইরের ঠিকাদারদের কোনো মুঠোফোন নম্বর না থাকায় তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।
হাওরে ফসলডুবির প্রতিবাদে গত মঙ্গলবার মানববন্ধন করে জেলা আইনজীবী সমিতি। মানববন্ধনে বক্তারা হাওরে বাঁধ নির্মাণে অনিয়মকে ফসলডুবির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শাস্তির দাবি জানান।
হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের সদস্যসচিব বিন্দু তালুকদার বলেন, ‘এবার অসময়ে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে, এটা ঠিক। কিন্তু বাঁধের কাজ সময়মতো না হওয়া এবং কাজে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির কারণেই হাওরে ফসলহানি ঘটেছে। আমরা বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির জেলা কমিটির সভাপতি চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেছেন, ‘আমরা প্রতিবছর চিৎকার করি, কিন্তু কোনো ফল হয় না। এবার সময়মতো বাঁধের কাজ হয়নি। সুনামগঞ্জের লাখো কৃষক এখন একমাত্র ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। তাঁদের কীভাবে বাঁচানো যায়, সরকারের উচিত সেই উদ্যোগ নেওয়া।’
জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল হক বলেন, ‘আগে জেলাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করতে হবে। এরপর ফসল রক্ষায় যাঁদের অবহেলা-গাফিলতি আছে, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।’
জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল হুদা গতকাল দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলন করে বাঁধের কাজের অনিয়মের তদন্ত দাবি করেন। জড়িত পাউবো কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও পিআইসির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
পাউবোর সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আফসার উদ্দিন বলেন, ঠিকাদারদের সব কাজ এখনো শেষ হয়নি। এখনো অনেক কাজ বাকি আছে। তাঁরা চিঠি দেওয়ার পরও দুটি বাঁধে ঠিকাদার কাজ শুরুই করেননি। তিনি আরও বলেন, ঠিকাদারেরা যত শক্তিশালীই হোন, কোনো ছাড় পাবেন না। যাঁরা যেটুকু কাজ করেছেন, সেটুকুরই বিল পাবেন।


আপনার মন্তব্য প্রেরণ করুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ফিল্ডসমূহ * এর মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে

*

پیام رهبر انقلاب به مسلمانان جهان به مناسبت حج 1440 / 2019
conference-abu-talib
We are All Zakzaky