?>
নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন;

সৌদি রাজপ্রাসাদে সেই রাতে যা ঘটেছিল

সৌদি রাজপ্রাসাদে সেই রাতে যা ঘটেছিল

সৌদি আরবের পরবর্তী রাজা হওয়ার কথা ছিল মোহাম্মদ বিন নায়েফের। ফলে তাকে কেউ নির্দেশ দেবে এমনটা ভাবতেই পারতেন না নায়েফ।

আবনা ডেস্কঃ সৌদি আরবের পরবর্তী রাজা হওয়ার কথা ছিল মোহাম্মদ বিন নায়েফের। ফলে তাকে কেউ নির্দেশ দেবে এমনটা ভাবতেই পারতেন না নায়েফ। কিন্তু গত জুনের এক রাতে মক্কায় রাজপ্রাসাদে তাকে তলব করা হয়। এরপর তাকে সেখানে আটকে রাখা হয় আর পদত্যাগের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চাপ দেয়া হয়।
ভোরে তিনি হার মানেন। সৌদি আরবের জনগণ ঘুম থেকে জেগে উঠেই জানতে পারেন যে তারা নতুন একজন ক্রাউন প্রিন্স বা যুবরাজ পেয়েছেন। তিনি আর কেউ নন, বাদশাহ সালমানের ৩১ বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমান।
তরুণ প্রিন্সের সমর্থকরা তার এই পদোন্নতির প্রশংসা করেন। তারা একে দেখেন একজন উচ্চাভিলাষী নেতার ক্ষমতায়ন হিসেবে। কিন্তু ২১ জুন তাকে এ পদে বসানোর পর থেকেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে মোহাম্মদ বিল সালমানই নায়েফের অপসারণের ষড়যন্ত্র করেছিলেন। এই প্রক্রিয়া ছিল জনগণকে যা বলা হয়েছিল তার চেয়ে ঝঞ্জাময়। রাজপরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা নিউইয়র্ক টাইমসকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ একজন জানান, রাজতন্ত্রের ধারাবাহিক ক্ষমতারোহনে এই আকস্মিক পরিবর্তন জায়েজ করার জন্য কিছু সিনিয়র রাজপুত্রকে বলা হয়েছিল যে মোহাম্মদ বিন নায়েফ মাদকাসক্ত হওয়ার কারণে রাজা হওয়ার অযোগ্য। শুধু নায়েফ একা নন, তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদেরও বিতাড়িত করা হয়। এরা ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তাদের হারিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে তাদের হিমশিম খেতে হয়।
মোহাম্মদ বিন সালমানের ওপর এত বেশি ক্ষমতা অর্পণ করাটা সৌদি রাজতন্ত্রের ঐতিহ্যের পরিপন্থী, যেটা পরিচালিত হয়ে আসছে ঐকমত্য ও প্রবীণদের পরামর্শ মোতাবেক।
রাইস ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক ক্রিশ্চিয়ান কোটস আলরিচসেন বলেন, ‘একটি বিভাগ এবং তরুণ এক ব্যক্তিকে এত বেশি ক্ষমতা দেয়ায় তার চাচাতো ভাইয়েরা এবং সাবেক বাদশাহদের সন্তান এমন একটা অবস্থা তৈরি করতে পারে যে পরিবারের কাজ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।’
নিউইয়র্ক টাইমস গত মাসে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল যে মোহাম্মদ বিন নায়েফকে অন্তরীণ করে তাকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করেছিলেন তার চাচাতো ভাই মোহাম্মদ বিন সালমান।
এখন মার্কিন কর্মকর্তারা এবং রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা একই তথ্য দিচ্ছেন। তবে সবাই কথা বলেছেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে। কারণ রাজপরিবারের বিরাগভাজন হতে চান না তারা।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রশ্নের জবাবে সৌদি আরবের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এক লিখিত বিবৃতিতে বলেন, নায়েফকে চাপ দিয়ে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করার তথ্য সঠিক নয়। তিনি প্রবীণ রাজপুত্রদের সমন্বয়ে গঠিত অ্যালেজ্যান্স কাউন্সিল (আনুগত্য পরিষদ) জাতির সর্বোচ্চ স্বার্থে এই পরিবর্তন অনুমোদন দিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, নতুন ক্রাউন প্রিন্সের ওপর প্রথম আনুগত্য প্রকাশ করেন মোহাম্মদ বিন নায়েফ। সেই দৃশ্য ভিডিও করার বায়নাও ধরেন তিনি। নায়েফ অন্তরীণ নন। তার জেদ্দার প্রাসাদে প্রতিদিন মেহমান যাতায়াত করেন এবং তিনি একাধিকবার বাদশাহ ও নতুন ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গে দেখা করেছেন।
দ্বন্দ্বটা শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালে, যখন বাদশাহ সালমান ক্ষমতায় বসেন এবং তার প্রিয় পুত্রকে বিপুল ক্ষমতা দান করেন। তাকে ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স বানানো হয়, যার অর্থ হল তিনি বাদশাহ হওয়ার দৌড়ে দ্বিতীয় অবস্থানে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও অর্থনৈতিক কাউন্সিলের দায়িত্ব দেয়া হয় তাকে। রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোরও দায়িত্ব দেয়া হয় তাকে।
মোহাম্মদ বিন সালমানের সমর্থকরা তাকে দূরদর্শী নেতা বললেও সমালোচকরা বলছেন, তিনি ক্ষমতালিপ্সু। তিনি ইয়েমেনে ব্যর্থ যুদ্ধে সৌদিকে টেনে নিয়েছেন এবং বহু বেসামরিক লোককে হত্যা করেছেন। কাতারের সঙ্গেও বিবাদে জড়িয়েছেন তিনি। এই দুই বিবাদ থেকে বের হওয়ার কোনো স্পষ্ট পথ নেই।

কীভাবে বরখাস্ত হয়েছিলেন নায়েফ?
মার্কিন কর্মকর্তা ও রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠজনেরা জানান, ২০ জুন মক্কার সাফা প্রাসাদে জড়ো হন সিনিয়র প্রিন্স ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। তাদের বলা হয় যে বাদশাহ তাদেরকে দেখা করতে বলেছেন। তখন রমজান মাস প্রায় শেষের দিকে। রাজকুমাররা তখন বিদেশে ঈদুল ফিতরের ছুটি কাটানোর জন্য বিদেশে যাওয়ার উদ্দেশে মক্কায় সমবেত হয়েছেন। সেই সময়টাতেই এই পরিবর্তনটা আনা হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটা বড়দিনের প্রাক্কালে অভ্যুত্থানের মতো ঘটনা আর কি।
মধ্যরাতে মোহাম্মদ নায়েফকে বলা হয় যে বাদশাহে তাকে দেখা করতে বলেছেন। তাকে একটি রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তার ফোন কেড়ে নেয়া হয়। এরপর তাকে ক্রাউন প্রিন্স এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ ছাড়তে চাপ দেয়া হয়। প্রথমে তিনি সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। রাত বেড়ে চলে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত আর ২০০৯ সালে ভয়াবহ আত্মঘাতী হামলা থেকে গুরুতর আহত হয়ে বেঁচে যাওয়া নায়েফ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েন। প্রত্যুষে নায়েফ পদত্যাগ করতে রাজি হন। এরপরই মোহাম্মদ বিন সালমানকে তার হস্ত চুম্বন করার ভিডিও করা হয়। তিনি নায়েফকে বলেন, ‘আমরা সবসময় আপনার উপদেশ মতো চলব।’ নায়েফ বলেন, ‘আল্লাহর ইচ্ছায় তোমার কল্যাণ হোক।’ পরে নায়েফ লোহিত সাগরের তীরে জেদ্দায় তার প্রাসাদে ফিরে যান। এরপর আর বের হতে দেয়া হয়নি তাকে। আমেরিকার একজন কর্মকর্তা বলেন, কাতারের ওপর অবরোধ অরোপের বিরোধিতা করেছিলেন নায়েফ। এ কারণে তাকে দ্রুতই সরানো হয়।


আপনার মন্তব্য প্রেরণ করুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ফিল্ডসমূহ * এর মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে

*