?>
উম্মুল মু'মিনীনের ওফাত বার্ষিকী;

মহিয়সী হযরত খাদিজা (সা. আ.) এর ফজিলত

মহিয়সী হযরত খাদিজা (সা. আ.) এর ফজিলত

এমন সময় হযরত জীব্রাইল (আ.) অবতীর্ণ হয়ে বললেন: মহান আল্লাহ্ আপনার উদ্দেশ্যে সালাম প্রেরণ করে বলেছেন: ‘যাহরা কে বলো, তোমারা মা বেহেশতে একটি স্বর্ণের প্রাসাদে অবস্থান করছেন যার পিলারগুলো লাল ইয়াকুতের তৈরী। যার পাশে রয়েছেন আসিয়া ও মারিয়াম (আলাইহিমাস সালাম)।

আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): নবুয়্যত প্রাপ্তির ১০ম বছরের ১০ই রমজান হযরত মহানবি (স.) এর সবচেয়ে কাছের ও প্রাণের স্ত্রী হজরত খাদিজা (সা. আ.) ইন্তিকাল করেন। আমাদের দেশে বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসা ও মহল্লায় আয়োজিত সভা-জলসাতে নবী (স.) এর অন্যান্য স্ত্রীদের নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলেও হজরত খাদিজা (সা. আ.) এর সম্পর্কে আলোচনা একেবারে শোনা যায়না বল্লেই চলে।

এ নিবন্ধে তার বরকতময় জীবনের কিছু দিক, তার ঐশী কাফন, বেহেশতে তার স্থান এবং তাঁর কিছু ফজিলত তুলে ধরা হল।

 

খাদিজার (সা. আ.) স্মরণ

যদিও আল্লাহর রাসুল (স.) হযরত খাদিজা (সা. আ.) এর ইন্তেকালের পর আরও কয়েকজনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু কখনও তিনি হযরত খাদিজা (সা. আ.) কে ভোলেন নি।

হযরত আয়েশা বলেন: যখন মহানবি (স.) খাদিজার কথা স্মরণ করতেন বিমর্ষ হয়ে পড়তেন এবং তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেন।

একদিন আমি ঈর্ষান্বিত হয়ে বললাম: হে আল্লাহর রাসূল, ঐ বৃদ্ধার পরিবর্তে মহান আল্লাহ্ অধিক সুন্দরী নারী আপনাকে দান করেছেন।

মহানবি (স.) এ কথা শুনে আমার হাতে মৃদ আঘাত করে বললেন: যখন সবাই আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিত, সে আমার পাশে থাকতো; যখন সবাই আমার থেকে পলায়ন করতো, সে আমাকে ভালবাসতো। যখন সকলে আমার দাওয়াতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, সে আমার প্রতি ঈমান এনেছে এবং আমাকে সত্যায়িত করেছে। জীবনের বিভিন্ন সমস্যাতে সে আমাকে সাহায্য করেছে। সে নিজের সম্পদ থেকে সাহায্য করতো এবং আমার অন্তর থেকে দুঃখ দূর করে দিত।

বেহেশতে হযরত আসিয়া ও মারিয়ামের পাশে

নবি বংশের ষষ্ঠ পুরুষ হযরত ইমাম সাদিক (আ.) বলেন: যখন হযরত খাদিজা (সা. আ.) ইন্তেকাল করেন তখন হযরত ফাতেমা (সা. আ.) ছোট ছিলেন। তিনি বাবার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল (স.)! আমার মা কোথায়?

মহানবি (স.) কোন উত্তর দিলেন না। এমন সময় হযরত জীব্রাইল (আ.) অবতীর্ণ হয়ে বললেন: মহান আল্লাহ্ আপনার উদ্দেশ্যে সালাম প্রেরণ করে বলেছেন: ‘যাহরা কে বলো, তোমারা মা বেহেশতে একটি স্বর্ণের প্রাসাদে অবস্থান করছেন যার পিলারগুলো লাল ইয়াকুতের তৈরী। যার পাশে রয়েছেন আসিয়া ও মারিয়াম (আলাইহিমাস সালাম)।

হযরত খাদিজার কতিপয় বৈশিষ্ট

হযরত খাদিজা (সা. আ.) সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী নারী। যেভাবে হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (কা.) ছিলেন পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী। তিনি প্রথম নামাজ আদায়কারী নারী। তিনি বিশেষ দূরদর্শিতা অধিকারী ছিলেন। আধ্যাত্মিকতার প্রতি তার ছিল বিশেষ ঝোঁক। অত্যন্ত ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন, সত্যের প্রতি বিশ্বাসী এবং আসমানী সংবাদের প্রতি তার আকর্ষণ ছিল চোখে পড়ার মত। তার ফজিলত বর্ণনার ক্ষেত্রে এতটুকু বলাই যথেষ্ট যে, আল্লাহর রাসুল (স.) তাঁকে অন্য সকলের তুলনায় অধিক ভালবাসতেন।

তিনি আসমানি গ্রন্থসমূহ সম্পর্কে অবগত ছিলেন। সম্পদশালী হওয়ার পাশাপাশি ‘মালাকায়ে বুতহা’ নামেও তার সুখ্যাতী ছিল। ইসলাম আগমনের পূর্বে ‘তাহেরাহ’, ‘মুবারাকাহ’, ও ‘সাইয়্যিদাতুন নিসা’ নামেও তাকে ডাকা হত।

মজার বিষয় হল, তিনি মহানবি (স.) এর আগমনের অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিদের অন্যতম। তিনি ওয়ারাকাহ বিন নওফেল ও অন্যান্য জ্ঞানীজনদের কাছে নবুয়্যতের আলামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন।

ওফাত

হজরত খাদিজা (সা. আ.) হিজরতের ৩ বছর পূর্বে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার অসুস্থতা বৃদ্ধি পেলে তিনি বললেন: হে আল্লাহর রাসুল (স.) কয়েকটি বিষয়ে ওসিয়ত করতে চাই।

আমার প্রথম ওসিয়ত হচ্ছে, আপনার বিষয়ে আমি গাফিলতি করেছি, আমাকে ক্ষমা করবেন।

মহানবি (স.) উত্তরে বললেন: আমি তোমার পক্ষ থেকে কোন ত্রুটি দেখিনি। তুমি তোমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছো। আমার গৃহে অনেক বেশী ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত হয়েছে এবং তোমার সমস্ত সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় খরচ করেছো।

তিনি বললেন: হে আল্লাহর রাসূল (স.) আমার দ্বিতীয় ওসিয়ত হচ্ছে, আমার কন্যার দিকে খেয়াল রাখবেন; এরপর তিনি হজরত ফাতেমা (সা. আ.) এর দিকে ইশারা করলেন। কারণ সে আমার পরে ইয়াতিম ও অসহায় হয়ে যাবে। খেয়াল রাখবেন যেন কুরাইয়েশ নারীরা তাকে কষ্ট না দেয়। কেউ যেন তার মুখে চড় না মারে।  কেউ যেন তাকে বকা-ঝকা না করে, আর কেউ যেন তার সাথে কর্কষ আচরণ না করে।

তৃতীয় ওসিয়তটি বলতে আমি লজ্জা বোধ করছি। আমি সেটা ফাতেমাকে বলবো, সে আপনাকে বলবে। অতঃপর ফাতেমা (সা. আ.) কে ডেকে বললেন: হে আমার নয়নের জ্যোতি! তোমার পিতা আল্লাহর রাসূলকে বলো যে, মা বলেছে: ‘আমি কবর থেকে ভয় পাই। তাই আপনার কাছে অনুরোধ ঐ কাপড়ে আমাকে কাফন দেবেন যেটা ওহি অবতীর্ণ হওয়ার সময় আপনি পরে ছিলেন।

অতঃপর হজরত ফাতেমা (সা. আ.) বাইরে এসে তৃতীয় ওসিয়তটি বললে মহানবি (স.) ঐ কাপড়টি হজরত খাদিজার জন্য পাঠালেন। তিনি তা দেখে অত্যন্ত খুশী হলেন।

হজরত খাদিজার ওফাতের পর তার গোসল ও কাফনের দায়িত্ব নিজেই নিলেন। এসময় হজরত জীব্রাইল (আ.) বেহেশতি কাফন নিয়ে অবতীর্ণ হলেন। বললেন: হে আল্লাহর রাসুল (স.) মহান আল্লাহ্ আপনাকে সালাম দিয়ে বলেছেন: সে (খাদিজা) তার সমস্ত সম্পত্তিকে আমার রাস্তায় ব্যয় করেছে, তার কাফনের দায়িত্ব আমারই।

হজরত খাদিজা (সা. আ.) (মতান্তরে) ৬৫ বছর বয়সে নবুয়্যত প্রাপ্তির ১০ম বছরে পবিত্র রমজান মাসের ১০ তারিখে শো’বে আবু তালিবের বাইরে ইন্তিকাল করেন। মহানবি (স.) নিজেই হযরত খাদিজা (সা. আ.) কে গোসল দেন এবং হুনুত করেন। আর মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে হজরত জীবরাইল (আ.) যে কাপড় এনেছিলেন, তা দিয়ে কাফন করেন। আল্লাহর রাসূল (স.) নিজেই কবরে ভেতরে নামেন এবং হজরত খাদিজার দেহ মোবারক সেখানে রেখে দেন। এরপর কবরের উপর কবরের বিশেষ পাথর স্থাপন ও মজবুত করেন।

তিনি (স.) হজরত খাদিজা (সা. আ.) এর জন্য ক্রন্দন করতেন এবং তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেন।

হজরত খাদিজা (সা. আ.) এর বিয়োগ মহানবি (স.) এর জন্য ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এর কিছুদিন আগে তিনি স্বীয় চাচা হজরত আবু তালিব (আ.) কেও হারান। আর এ দুই মহান ব্যক্তিত্বের বিয়োগে মহানবি (স.) অত্যন্ত শোকার্ত ছিলেন। আর তাই ঐ বছরকে তিনি আমুল হুযন বা শোকের বছর নামে নামকরণ করেন।

মহানবি (স.) এর ভাষায় হজরত খাদিজা (সা. আ.)

রাসুল (স.) বলেছেন: " খাদিজা আমার জীবনের অর্ধাংশ, তাকে ছাড়া আমার জীবন অসম্পূর্ণ। "

তিনি (স.) আরও বলেন: "ইসলাম প্রচারের জন্য খাদিজা যে পরিমাণ সম্পদ দান করেছেন তা যদি এক পাল্লায় রাখা হয় আর সমস্ত উম্মতের খরচকে অপর পাল্লায়,তাহলে খাদিজার দানকৃত সম্পদের পাল্লা ভারী হবে। তার মত কেউ এতো বেশি দান করেনি ও করবে না।"

মহানবি (স.) আরো বলেন, " আল্লাহ খাদিজা কে ফাতিমার মাতা হওয়ার সৌভাগ্য দিয়েছেন যার মর্যাদা হচ্ছে সমস্ত নবী-রাসুলদের মাতা দের চেয়েও উত্তম । "


আপনার মন্তব্য প্রেরণ করুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ফিল্ডসমূহ * এর মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে

*