?>

মাওলা আলী (আ.) এর শাহাদত

মাওলা আলী (আ.) এর শাহাদত

কেউ আলীর জ্ঞানের সমুদ্রে ডুব দিয়ে তাকে পরোখ করতে চেয়েছে? যখন তিনি সকল প্রশ্নের উত্তর প্রদানের জন্য নিজের প্রস্তুতির কথা ঘোষণা করেছেন তখন বুদ্ধু লোকগুলো আলী সত্যি বলছে কি না তা পরীক্ষা করার খেলায় মেতেছে।

তখনও নিস্তব্ধ কুফার আকাশে রাতের আঁধার। বেরিয়ে এলেন মুসলিম জাহানের খলিফা আলী; প্রিয় মেহরাবে দাঁড়িয়ে আজান দিলেন- ‘আল্লাহু আকবার’। কুফাবাসী শুনলো আল্লাহর রাসুল (স.) এর পর মুসলমানদের অভিভাবকের কণ্ঠে শেষ আজান। আর কখনও ঐ হৃদয়গ্রাহী আওয়াজ শোনা যাবে না। পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও কঠিন অন্তরের অভিশপ্ত ইবনে মুলজিম হত্যা করেছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (স.) এর সবচেয়ে কাছের মানুষটিকে। হাসান ও হুসাইন, যায়নাব, আব্বাস, উম্মে কুলসুম, আব্বাসকে এতিম করে বিদায় নিলেন আলী (আ.)। ইতিহাস হারালো এমন এক নক্ষত্র যার প্রস্থানের ক্ষতি কখনই পূরণ হবার নয়।
মিত্র ও শত্রু উভয়ের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় মানবিক ও আধ্যাত্মিক পূর্ণতায় আমিরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-এর ন্যূনতম ঘাটতি ছিল না। তাঁর মাঝে উপস্থিত ছিল মহানবি (স.)-এর সমস্ত ঐশী শিক্ষা। তাইতো জনৈক সাহাবি আল্লাহর রাসুল (স.) এর ইন্তেকালের বহুবছর পর হজরত আলী (আ.) এর ইমামতিতে নামাজ আদায় করে এ কথা স্বীকার করেছিলেন, ‘বহুদিন পর আল্লাহর রাসুল (স.) এর নামাজ মনে পড়ে গেল’।
শুধু শিয়া-সুন্নি কেন তাঁর পূর্ণতা ও কৃতিত্বে মুগ্ধ হয়ে অপর ধর্মের অনুসারীরাও রচনা করেছেন বহু গ্রন্থ। কেনই বা লিখবেন না বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মানব হজরত রাসুলে আকরাম (স.) এর শ্রেষ্ঠ শাগরেদ যে তিনিই। শুধু রাসুলের সোহবত (সান্নিধ্য)-ই তার জীবনে পরম পাওয়া নয়। বরং ভালভাবে বুঝতে শেখার আগ থেকেই তো নবির সোহবত লাভের পাশাপাশি তার জীবনের প্রতিটি শিক্ষার হাতে খড়ি যে স্বয়ং আল্লাহর নবি (স.) থেকেই। আর তাই তো এ অনুসরণকে তিনি এভাবে আখ্যা দিয়েছেন:
‘আমি তাঁকে অনুসরণ করে চলতাম যেভাবে একটা উষ্ট্র - শাবক। তার মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। প্রতিদিন তিনি ব্যানার আকারে তাঁর কিছু বৈশিষ্ট্য আমাকে দেখাতেন এবং তা অনুসরণ করতে আমাকে আদেশ দিতেন’।
মহানবি (স.) থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাগুলো জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিজেকে এমন উচ্চ স্থানে আসীন করেছেন যে, আল্লাহর রাসুল (স.) তাঁর সম্পর্কে বলেছেন: ‘হে আলী আমি ও তুমি ব্যতীত আল্লাহকে কেউ চেনেনি, আল্লাহ্ ও তুমি ব্যতীত আমাকে কেউ চেনেনি এবং আল্লাহ্ ও আমি ব্যতীত তোমাকে কেউ চিনতে পারেনি।’
আল্লাহর রাসুল (স.) যথার্থই বলেছেন, আলী (আ.) কে আল্লাহ্ এবং তিনি ব্যতীত আর কেউই চিনতে পারেনি। মুসলমানরা কখনও কি আলীর (আ.), খোদাভিরুতা জ্ঞান, বীরত্ব, আত্মত্যাগ, আল্লাহ্ এবং নবির নির্দেশের সামনে কিভাবে মাথা পেতে নিতে হয় ইত্যাদি বিষয়গুলো ভেবেছে বা চিনেছে?
কেউ আলীর জ্ঞানের সমুদ্রে ডুব দিয়ে তাকে পরোখ করতে চেয়েছে? যখন তিনি সকল প্রশ্নের উত্তর প্রদানের জন্য নিজের প্রস্তুতির কথা ঘোষণা করেছেন তখন বুদ্ধু লোকগুলো আলী সত্যি বলছে কি না তা পরীক্ষা করার খেলায় মেতেছে।
তার বীরত্বের বিষয়টি সামনে এসেছে তখন শুধুমাত্র তাঁর তলোয়ার দিয়ে তাঁর বীরত্বকে মেপেছে। কিন্তু তাঁর বীরত্বের নজীর তো তলোয়ারের চেয়ে অন্য খানে বেশী দেখা যায়, যেখান অন্যান্যদের খুঁজে পাওয়া যায় না। নামধারী মুশরিক শত্রুকে বাগে পেয়েও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাকে ছেড়ে দেয়ার নাম বীরত্ব। চোখের সামনে নিজের অধিকার হরণ হতে দেখেও ইসলামকে বাঁচানোর স্বার্থে আল্লাহর এ সিংহের গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান করা হচ্ছে বীরত্ব। যুদ্ধের সময় একমাত্র পানির উৎস দখলের পর শত্রুদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হচ্ছে বীরত্ব। খেলাফতের মসনদে ফাঁকা পেয়েও সেটা তছরুপ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখার নাম বীরত্ব।
আর তলোয়ার হাতে যুদ্ধের ময়দানে শত্রু সৈন্যদের কলিজায় কাঁপন ধরানো তাঁর বীরত্ব তো সেই বদর থেকেই শুরু যা আর কখনই অস্তমিত হয়নি।
-কখনও তাকে যুদ্ধের ময়দান থেকে পালাতে দেখেনি কেউ।
-কোন শত্রুর ভয়ে তিনি পলায়ন করেননি। কোন শত্রু তার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে জান নিয়ে ফেরত যায় নি।
-যুদ্ধের ময়দানে এমন নির্ভিক মহামানবকে মানবেতিহাস আর কখনও দেখেনি।
-নিজ সৈন্যদলের সংখ্যা নিয়ে বড়াই করার চেয়ে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সন্তুষ্টি ও শাহাদতের চেতনাকে বুকে নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে শত্রুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন এবং বিজয় ছিনিয়ে আনতেন।
-কোন শত্রু কখনই তার উপর বিজয়ী হতে পারে নি।
আলীর মোকাবিলায় নকল বীরদেরকে ঐতিহাসিকরা জন্ম দিতে চেয়েও ব্যর্থ হয়েছে। কেননা আলী (আ.) তার ৬৩ বছরের জীবনে এমন সব নজীর স্থাপন করেছেন যে, কেয়ামত পর্যন্ত বীরত্ব শব্দটি তার পরিবর্তে অন্য কারো নামের পাশে যে বড্ড বেমানান।
আলীর তাকওয়াকে মুসলমানরা শুধু তার তাঁর নামাজ ও নামাজরত অবস্থায় তাঁর পা থেকে তীর টেনে বের করার ঘটনার মাঝে খুঁজেছে। কিন্তু আলীর তাকওয়া কি শুধু এর মাঝেই নিহিত?!
তার জ্ঞানের বিষয়ে বলতে হয়, রাসুল (স.) এর জ্ঞানকে শুধুমাত্র কিছু সংখ্যক হাদিসের মধ্যে সীমাবদ্ধকারীরা আলীর জ্ঞানের গভীরতায় ডুব দেবে কিভাবে। জ্ঞানের শহরের জ্ঞানের পরিধির সংজ্ঞা যাদের কাছে এতটা তুচ্ছ তাদের কাছে দরজার মূল্য কি-ই বা হতে পারে।
হয়ত অনেকে অবাক হচ্ছেন আজ এত আলী বন্দনায় মেতেছি কেন, কে মাতেনি বলুন তো? যার মধ্যে ন্যূনতম ইনসাফ ছিল সে-ই তো মেতেছে আলী বন্দনায়।
নবি পরিবারের পবিত্রতার যে ঘোষণা এল, তাদের একজন আলী। খ্রিষ্টানদের আধ্যাত্মিক নেতাদের সাথে মুবাহালায় আত্মিক দিক থেকে সবচেয়ে পবিত্র ও শুদ্ধ ব্যক্তিত্বদেরকে নিয়ে মহানবি (স.) মুবাহালার মাঠে অবতীর্ণ হয়েছে, তাদের একজন আলী। আলীর (আ.) শিয়া তথা অনুসারীদেরকে সফলকাম বলে আখ্যায়িত করেছেন স্বয়ং মহানবি (স.) ।

আজ ২১ রমজান তার শাহাদত দিবস। মুসলমানদের মনে থাকার কথা নয়। কারণ আলীর (আ.) শত্রু ও বিরোধীদের সকল তথ্য তাদের কাছে থাকলেও আলী (আ.) এর কথা তারা ভুলে যায়। কিন্তু নবি পরিবারে কোন খুশির সংবাদে যেভাবে মহানবি (স.) আনন্দিত হন আমরা তাঁর সুন্নত অনুসরণ করতঃ আনন্দিত হই। আবার তার পরিবারে কোন দুঃখের সংবাদে তিনি যেভাবে ব্যথিত হন আমরাও তাঁর সুন্নত অনুকরণে ব্যথিত হই।
আজ নবির (স.) এর সবচেয়ে ঘনিষ্ট ও কাছের ব্যক্তি আমিরুল মু’মিনীন আলী (আ.) এর শাহাদাত বার্ষিকী। ২১শে রমজান নিজের শিয়াদেরকে এতিম করে তিনি মহান প্রতিপালকের দীদারে চলে যান।
তাঁর ঈমান, ইয়াকিন, খোদাভিরুতা, তাওয়াক্কুল, দানশীলতা, সত্যবাদিতা, একনিষ্টতা, সাহসিকতা ইত্যাদির প্রশংসায় সেই শুরু থেকেই লেখা হচ্ছে, আদৌ কি লেখকরা সেগুলো বলে শেষ করতে পেরেছে? এ বন্দনা ও স্তুতি শেষ হবার নয়, কারণ আলী নিজেকে মহান আল্লাহর কাছে সঁপে দিয়েছিলেন, প্রতিপালকের সন্তুষ্টির লক্ষ্যে সবকিছুকেই উজাড় করে দিয়েছিলেন। একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল মহান প্রভুর মর্জি। তাই তো কাবাগৃহে জন্মগ্রহণের সৌভাগ্য অর্জনকারী আলী (আ.) কুফা মসজিদের মেহরাবে যখন অভিশপ্ত ইবনে মুলজিমের বিষাক্ত তরবারির আঘাতে মাটিতে লুটে পড়লেন এবং তার মুখের দাড়িগুলো রক্তের রঙে লাল হয়ে গেল, তখন একটি বাক্যই উচ্চারণ করেছিলেন:
‘ফুযতু ওয়া রাব্বিল কাবা’ কাবার প্রভুর কসম আমি আজ সফলকাম হয়েছি।
শোকাবহ এ দিনে মহানবি (স.) এর সকল আশেককে জানাই আন্তরিক শোক ও সমবেদনা।
[মোঃ ইউনুস আলী গাজী]


আপনার মন্তব্য প্রেরণ করুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ফিল্ডসমূহ * এর মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে

*