?>

সৌদি আরবে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও বিদেশি শ্রমিকদের অবস্থা: পর্ব-পাঁচ

সৌদি আরবে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও বিদেশি শ্রমিকদের অবস্থা: পর্ব-পাঁচ

সৌদি আরবের আইন ও রাজনৈতিক কাঠামোয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কোনো গুরুত্ব বা মর্যাদা নেই এবং তাদেরকে হুমকি বলে মনে করা হয়। একটি গোষ্ঠী ও বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের দ্বারা পরিচালিত সৌদি শাসন কাঠামোয় ভাষাগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিজস্ব বিশ্বাস নিয়ে টিকে থাকার কোনো রকম পরিবেশ নেই। সৌদি শাসকরা মনে করেন, তাদের সমালোচকরা শুধু যে রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধাচরণ করছে তাই নয় একইসঙ্গে সেদেশে প্রচলিত শরীয়া আইনকেও উপেক্ষা করে চলেছে।

আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা) : সৌদি রাজ পরিবারের প্রভাবশালী সদস্যরা জনসাধারণের বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও বিদেশী শ্রমিকদের পক্ষ থেকে সমালোচনার ব্যাপারে খুবই স্পর্শকাতর। শুধুমাত্র সরকারের নীতির সমালোচনা করার কারণে বহু মানুষকে জেল জরিমানা দেয়া হয়েছে এবং অনেকের বিদেশে যাতায়াতের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সৌদি আরবে সংখ্যালঘুদের দুরবস্থার ব্যাপারে কোনো কথা বলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু অনেক দেশই সেটা মানছে না। সৌদি আরবে বহু বছর ধরে সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হয়ে আসছে। ওই দেশটিতে সংখ্যালঘুদের অধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে উত্থাপিত অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক সমাজের পরামর্শের ব্যাপারে সৌদি সরকারের প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায় রিয়াদ কারো পরামর্শ কিংবা অভিযোগের ধার ধারে না এবং তারা সংখ্যালঘুদের মৌলিক অধিকারের বিষয়টিকে মোটেও আমলে নিচ্ছে না। ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অধিকার বিষয়ক বিভাগের অধ্যাপক সাইয়্যেদ আলী সাদাত আখাভি এ ব্যাপারে এক নিবন্ধে লিখেছেন, ২০০৯ ও ২০১৩ সালে সৌদি আরবে মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর পরিচালিত এক গবেষণা রিপোর্ট দেখা গেছে মানবাধিকার রক্ষার জন্য মানবাধিকার পরিষদের সদস্য দেশগুলোর পক্ষ থেকে সৌদি সরকারকে অসংখ্যবার পরামর্শ ও অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু সেসব অনুরোধকে আমলে নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ২০০৮ থেকে ২০১৪ সালে সৌদি আরবে সংখ্যালঘুদের অবস্থার ওপর পরিচালিত এক গবেষণা রিপোর্টে দেখা গেছে, সেখানে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। ধর্মীয় স্বাধীনতা হরণ, যাকে তাকে যখন তখন গ্রেফতার, অভিবাসীদের অধিকার লঙ্ঘন, গুম হয়ে যাওয়া, মানবাধিকার আন্দোলনকারীদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি, সরকার বিরোধীদের ওপর নির্যাতন চালানো ও তাদের সাথে অমানবিক আচরণ করা, বাকস্বাধীনতা হরণ প্রভৃতি সেখানে স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ওই গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছে, এ পরিস্থিতির জন্য সৌদি শাসকবর্গ দায়ী। এ প্রসঙ্গে ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ে বিশেষ প্রতিবেদক মিসেস আসমা জাহাঙ্গিরকে গ্রেফতার এবং আহমদিয়া সম্প্রদায়ের ২২জনকে সেদেশ থেকে বহিষ্কারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে ওই গবেষণা প্রতিবেদনে। 

সৌদি আরবে ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রসঙ্গে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের বিশেষ প্রতিবেদক ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সাথে বৈষম্যের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, বাহরাইনের দুজন শিয়া মুসলিম শিক্ষক রিয়াদে বেড়াতে গিয়েছিলেন। কিন্তু বেআইনিভাবে সামরিক এলাকায় প্রবেশের মিথ্যা অভিযোগে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাদের আটক করে এবং ৫৫দিন আটক রাখার পর তাদেরকে সৌদি আরব থেকে বহিষ্কার করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয় আটক মিসেস আসমা জাহাঙ্গির সংখ্যালঘু অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১৩৫/৪৭ নম্বর প্রস্তাব অথবা ১৯৯২ সালের ঘোষণা মেনে চলতে সৌদি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে সৌদি আরবের শিয়া মুসলমানদের সাথে চরম বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ তোলা হয়। এমনকি স্কুল কিংবা শিশু প্রতিপালন কেন্দ্রেও শিয়া মুসলমানদের কাজ করার অনুমতি নেই। এ ছাড়া, মন্ত্রিত্ব, মেয়র, কূটনীতিক কিংবা আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থায় সরকারের প্রতিনিধিত্ব করারও কোনো সুযোগ নেই শিয়া মুসলমানদের।

জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রতিবেদক জর্জ জি বোস্তামান্তে তার প্রতিবেদনে সৌদি আরবে অভিবাসী ও বিদেশি শ্রমিকদের অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টিও তুলে ধরেছেন।  তিনি বলেছেন, অনেককে গুম করা হয়েছে, অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে।

সৌদি আরবে নারীদের সাথে সহিংস আচরণ বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক ইয়াকিন আর্থোক বলেছেন, ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি সেদেশ সফরে যান। তিনি তার প্রতিবেদনে সৌদি আরবে কর্মরত বিদেশী নারীদের দুরবস্থা ও তাদের সাথে সহিংস  আচরণের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেন। সেদেশে কর্মরত অধিকাংশ নারী গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে। বহু নারীর ওপর যৌন নিপীড়ন চালানোর অভিযোগ রয়েছে। শুরুতে তাদের পাসপোর্ট ও অন্যান্য পরিচয়পত্র কেড়ে নেয়া হয় এবং তাদেরকে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হতে বাধ্য করা হয়। এ কারণে এসব নারীরা সুযোগ মতো সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।

কাজের সন্ধানে সৌদি আরবে পাড়ি দেয়া নারীদের ২৭ শতাংশই বেতন পায় না, ১৫ শতাংশ শারীরিকভাবে নির্যাতিত হয়, পরিচর্যার অভাবে ১১ শতাংশ নারী নানান ধরনের অসুখে ভুগছে এবং ৪৭ শতাংশের ঘাড়ে অতিরিক্ত কাজের বোঝা চাপানো হয়। যৌন নিপীড়ন চালানো ছাড়াও অনেককে ঠিক মতো খাবার দেয়া হয় না এবং খুবই অমানবিকভাবে সেখানে দিন যাপন করতে তারা বাধ্য হয়।

খোদ সৌদি আরবের নারীদের সঙ্গেও দাসীর মত আচরণ করা হয়। সেখানে তাদের কোন স্বাধীনতা নেই। নারীরা সেখানে পুরুষদের ভোগের বস্তু। সম্প্রতি এমনটি জানিয়েছেন সৌদি থেকে পালানো দুই বোন। সিএনএনকে ওই দুই বোন জানায়, 'তারা জন্মের পর থেকে কড়া অনুশাসনের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করেছেন এবং শারীরিক ভাবে চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সৌদিতে নারীদের কোন ভবিষ্যৎ নেই। সেকারণে তারা ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করেছে।'

তাদের পরিবার থেকে পালানোর কারণ হিসেবে দুই বোন জানায়, আমরা আমাদের পরিবারের কাছে অনেক ভাল মেয়ে হিসেবে ছিলাম। কেননা পরিবারের সব কথা আমাদের মেনে চলতে হতো। তারা ঘরের সব কাজই করতো। তারা আরও জানান, তবে ছেলেদের বেলায় এমনটা হত না। ছেলেরা তাদের ইচ্ছেমত চলে।

গত কয়েক বছর ধরে সৌদি আরব থেকে নারীদের বাড়ি ছেড়ে পালানোর সংখ্যা ক্রমশই বাড়ছে। সম্প্রতি এক গবেষণায় জানা যায়, দেশটিতে মোহাম্মদ বিন সালমান যুবরাজ হিসেবে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে নারীদের সৌদি থেকে পালানোর হার তুলনামূলক বেশি।#

342/


আপনার মন্তব্য প্রেরণ করুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ফিল্ডসমূহ * এর মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে

*