?>

স্পাইকার ক্যাম্প ম্যাসাকার; ২০০০ ছাত্রকে নির্মমভাবে হত্যা করে দায়েশ

স্পাইকার ক্যাম্প ম্যাসাকার; ২০০০ ছাত্রকে নির্মমভাবে হত্যা করে দায়েশ

যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন ঠিক এখানেই এ্যারোস্পেস ইউনিভার্সিটির প্রায় ২০০০ প্রতিভাবান ছাত্রকে গাড়ী থেকে নামানো হয়, এরপর তাদেরকে ৩টি দলে ভাগ করে ৩ স্থানে নিয়ে অবর্ণনীয় বর্বরতার মাধ্যমে হত্যা করে দায়েশ (আইএসআইএস)।

হলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): ইরাকের তিকরিতে অবস্থিত স্পাইকার ক্যাম্পের প্রায় ২০০০ প্রতিভাবান ইরাকি ছাত্রকে হত্যা করেছিল মানবতার শত্রু দায়েশ সন্ত্রাসীরা। লোমহর্ষক সেই হত্যাকাণ্ডের বিবরণ নিয়ে আমাদের আজকের এ প্রতিবেদন। ‘স্পাইকার ক্যাম্প ম্যাসাকার’ নামে যে গণহত্যার পরিচিতি রয়েছে।

বর্বরতা ও নৃশংসতার পর্যায় এতটা চরম ছিল যে, এ গণহত্যা সনদহীন হলোকাস্টের মতো ঘটনাগুলিকেও ছাপিয়ে যাবে। কিন্তু এ ধরণের গণ ও প্রজন্ম হত্যার ঘটনা মানুষ অতিদ্রুতই মানুষ ভুলে যায়। এতবড় একটা ঘটনা কিন্তু দেশীয় মিডিয়াতে  প্রচার হয়নি বললেও চলে, ফলশ্রুতিতে সাধারণ জনগণ এ বিষয় সম্পর্কে হয়ত জানেই না অথবা জানলেও তা কিছুদিন পর ভুলে গেছে। এমনকি দায়েশের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত গণমাধ্যমগুলোও এই ঘটনা সম্পর্কে মানুষকে যেভাবে অবগত করা উচিত ছিল সে দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছে। পাশাপাশি নৃশংস এই গণহত্যার ঘটনাকে বিকৃত করতে এবং একে নিছক ছোট একটি ঘটনা হিসেবে উপস্থাপনের লক্ষ্যে শহীদদের সংখ্যা প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে কম দেখিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইরাক বিমানবাহিনীর তত্ত্বাবধানাধীন দেশটির উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত একটি ক্যাম্প বা ঘাঁটির নাম স্পাইকার; যা  অ্যারোস্পেস সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি হিসেবে ব্যবহৃত হত। ইরাকের বিভিন্ন শহর থেকে আগত মেধাবী ছাত্ররা এতে অবস্থিত ইউনিভার্সিটিতে ফ্লাইয়িং টেকনিক শেখার পাশাপাশি এরোস্পেস সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ইরাকি বিমানবাহিনীতে যোগ দিত।

স্পাইকার ম্যাসাকার ২০১৪ সালের ১১-১৫ জুনের মধ্যে ঘটেছিল। সাদ্দামের বাথ পার্টির কিছু সমর্থক এবং স্থানীয় কয়েকটি গোত্রের সহযোগিতায় ছাত্র, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরকে স্পাইকার ক্যাম্প থেকে প্রতারণার মাধ্যমে বের করে চরম বর্বরতার সাথে তাদেরকে হত্যা করে মানবতার শত্রু দায়েশ সন্ত্রাসীরা। ঐ শিক্ষার্থীরা ছিল সম্পূর্ণ নিরস্ত্র। তারা যে অপ্রস্তুত অবস্থায় তাড়াহুড়া করে ক্যাম্প ত্যাগ করেছিল তা তাদের অনেকের পরিহিত বিশ্রামের পোশাকই বলে দেয়।

সম্প্রতি যে কয়টি বিষয় নিয়ে কাজ করার খুব ইচ্ছা ছিল স্পাইকার ম্যাসাকারের খুঁটিনাটি জানা ছিল সেগুলোর অন্যতম। কিন্তু ঘটনাস্থল ইরাকে এবং বিশেষকরে তিকরিতে হওয়ার কারণ সেখানে যাওয়া সহজ ছিল না।

তবে আমার সর্বশেষ ইরাক সফরে কয়েকটি সংস্থার সহযোগিতায় তিকরিত সফর এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে আলাপের একটা সুযোগ তৈরি হল।

বাগদাদ থেকে ইরাকের উত্তরে অবস্থিত স্পাইকার ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে বিকেলের দিকে ঐতিহাসিক পবিত্র সামেরা শহরে এসে পৌঁছুলাম। রাস্তা অনিরাপদ হওয়ায় সামেরাতে অবস্থিত ইমাম আলী নাকি (আ.) ও ইমাম আসকারি (আ.) এর মাজারের কাছেই রাত্রি যাপন শেষে খুব ভোরে তিকরিতের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। সশস্ত্র দু’টি গাড়ী আমাদেরকে স্কোট করছিল।

সেন্ট্রাল ইরাক ও দক্ষিণ ইরাকের চেয়ে উত্তর ইরাকের পরিস্থিতি ছিল ব্যতিক্রম। উত্তরের এলাকাগুলোতে এখনো সাদ্দামের বাথ পার্টির সমর্থকরা রয়েছে। পার্টির প্রতি তাদের আনুগত্য, দায়েশসহ অন্যান্য তাকফিরি ও সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোতে তাদের যোগদানের ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে। তাই ইরাকের অন্যান্য এলাকা নিরাপদ হলেও এখনও উত্তরের অনেক এলাকা অনিরাপদ রয়েই গেছে। এমনকি স্থানীয়রা একা একা উত্তরের এক শহর থেকে আরেক শহরে যাতায়াত করতে ভয় পায়।

বাগদাদের ১৪০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত তিকরিত। সামেরা থেকে তিকরিত এর পথে আর কোন বড় শহর নেই। জনমানব ও বৃক্ষহীন পথ ধরে এগিয়ে চলছে আমাদের গাড়ী। অনিরাপত্তার কথা ভেবে বুক কেঁপে উঠছে বারবার। দীর্ঘক্ষণ চলার পর সাদ্দামের কয়েকটি বিশালাকার প্রাসাদের উপর চোখ পড়তেই নিশ্চিত হলাম তিকরিত পৌঁছে গেছি।

 

সাদ্দামের প্রাসাদের আঙিনাগুলো ডাস্টবিনে রূপান্তরিত হয়েছে

সালাহ উদ্দীন প্রদেশের রাজধানী তিকরিত কয়েক হাজার বছরের স্মৃতি নিজ বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে। এমনকি হজরত ঈসা (আ.) এর জন্মেরও আগের এবং আশুর সভ্যতারও আগের নিদর্শন নিয়ে ঐতিহাসিক দজলা নদীর তীরে অবস্থিত স্বৈরাচারী সাদ্দামের জন্মভূমি তিকরিত।

তিকরিতের প্রশংসা শুনে প্রথমে মনে করেছিলাম হয়তবা সবুজ-শ্যামলে ঘেরা এবং সুসজ্জিত একটি শহর আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু কাছে এসে যুদ্ধের ফলে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া একটি শহরের মুখোমুখি হলাম, জীবন-যাপনের সামান্যতম সুবিধাও যেখানে নেই।

অবশ্য আগেই আমাদেরকে বলা হয়েছিল যে, সাদ্দাম নিজ জন্মভূমিকে মনের মত করে সাজিয়ে ছিলেন। কিন্তু মার্কিন বাহিনী ও তাকফিরীদের হামলা (বিশেষকরে দায়েশ) এবং তাদের সাথে ইরাকি সেনাবাহিনী ও হাশদ আশ-শাবির (গণবাহিনী) হামলা পাল্টা হামলায় শহরটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল।

অবশ্য তিকরিতের সৌন্দর্য বা এর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার দৃশ্য দেখতে আমারা এ সংকটপূর্ণ সফরে আসিনি। তাই কালক্ষেপণ না করে আমরা স্পাইকারের সেই ভয়াবহ বধ্যভূমি যেখানে একেকজন ছাত্রকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল সেই স্থানের দিকে রওনা হলাম। যে স্থানটি এক সময় সাদ্দামের প্রমোদ এবং বিনোদনের স্থান ছিল। প্রাসাদে পৌঁছানোর রাস্তা সহজ করতে দজলা নদীর উপর মজবুত একটি ব্রিজও নির্মাণ করেছিলেন সাদ্দাম। কিন্তু একসময়ের জনাকীর্ণ প্রাসাদ আজ পরিত্যক্ত; রূপান্তরিত হয়েছে স্পাইকার ক্যাম্পের শহীদদের জাদুঘরে।

 

সাদ্দামের নির্মিত প্রাসাদের একাংশ

টাইগ্রিস (দজলা) নদীর গা ঘেঁষে বিশালাকৃতির ৮টি প্রাসাদ। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া টাইগ্রিস ওখান থেকে দু’ভাগ হয়ে গিয়ে কয়েক কিলোমিটার পর আবারও মিশেছে। আর এতে দজলার বুক চিরে জন্মেছে ছোট একটি দ্বীপ। সাদ্দাম এ স্থানটিকেই প্রাসাদ বানানোর জন্য বেছে নেন। নদীর এ পাশে কয়েকটি প্রাসাদ এবং ওপাশে কয়েকটি। কয়েকটি আবার দ্বীপের মাঝখানে। কয়েকটি প্রাসাদও নির্মাণাধীন থাকা অবস্থায় সাদ্দামের পতন হওয়ায় নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়, আজও ঐ অবস্থায়ই পরিত্যক্ত পড়ে আছে সেগুলো।

 

গাড়ী থেকে নামার সময় অদ্ভূত দূর্গন্ধ নাকে এল। আমাদের সাথে থাকা গাইডের প্রথম ব্যাখ্যাও ছিল ঐ বিকট দূর্গন্ধ সম্পর্কে। ঠিকই ধরেছিলাম; গন্ধ একটি গণকরব থেকে উঠে আসা। হতভাগ্য ছাত্রদের একটি দলকে ঐ গণকবরে দাফন করা হয়েছিল। কয়েক বছর পার হয়ে গেলেও ঐ গন্ধ এখনও কমেনি।

পৌঁছা মাত্রই আমরা কাজ শুরু করে দিলাম। কেননা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা আগেই সতর্ক করেছেন, এলাকাটি অনিরাপদ। এখানে বেশিক্ষণ অবস্থান করা যাবে না এবং রাত নেমে আসার আগেই সামেরা অথবা বাগদাদে ফিরে যেতে হবে।

শুরুতে হত্যাকাণ্ড রিলেটেড কিছু সাইনবোর্ড, ছবি ও ব্যানারে চোখ পড়লো। সাইনবোর্ডগুলোর দিকে এগিয়ে গেলাম। এক ইরাকি এগিয়ে এসে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দেয়া শুরু করলো। ব্যানারগুলোর একটি ব্রিজের নীচে ঝুলন্ত ছিল।

রাস্তার ঠিক শেষ প্রান্তে একতলা বিশিষ্ট একটি ভবন; যেটা ছিল ইরাকের মোবিলাইজেশন ফোর্সের (হাশদাশ শাবি) ঘাঁটি। দায়েশ কয়েক বছর আগে এই এলাকা দখলে নেয়ার পর তাদের পতাকা ঐ ভবনের উপরই উড়িয়েছিল।

 হত্যার উদ্দেশ্যে ছাত্রদেরকে বধ্যভূমিতে আনা হয়

একটি রুম থেকে আমাদের গাইড কয়েকটি ছবি এনে বলা শুরু করলেন, যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন ঠিক এখানেই এ্যারোস্পেস ইউনিভার্ষিটির প্রায় ২০০০ প্রতিভাবান ছাত্রকে গাড়ী থেকে নামিয়ে তাদেরকে কয়েকটি দলে ভাগ করা হয়। একটি দলকে প্রাসাদের সামনের উঠোনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং অপর দলটিকে এই ভবনের পাশ দিয়ে নদীর ধারে নেয়া হয়। ছবিগুলো হাতে নিয়ে হতভাগ্য ছাত্রগুলোকে যে পথ দিয়ে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেই পথ ধরে এগিয়ে চললাম।

ভবন পেরিয়ে এমন স্থানে এসে পৌঁছুলাম যা দেখে আমার বুক কেঁপে উঠলো। দায়েশ যে স্থানের ভিডিও প্রচার করেছিল এটা সেই জায়গা। ভিডিওটি বহুবার দেখার কারণে দেখামাত্রই জায়গাটি চিনে ফেললাম। টাইগ্রিসের ধারে ঐ জায়গাতেই যুবকদেরকে একে একে এনে তাদের মাথায় গুলি করে লাশ নদীতে ফেলে দিয়েছিলে দায়েশ সন্ত্রাসীরা।

 

অশ্রসজল চোখে গাইড বলেই চললেন সেদিনের সেই মর্মান্তিক ঘটনার কথা। যে বিষয়ে বলছিলেন সে সম্পর্কিত দু’একটা ছবিও দেখাচ্ছিলেন আমাদেরকে এবং স্বদেশী হতভাগ্য যুবকগুলোর জন্য কাঁদছিলেন। নদীর ধারে পৌঁছে এতক্ষণ জমে থাকা কষ্ট কমাতে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে চিৎকার করলেন ‘ইয়া হুসাইন’।  বললেন: ভাবতেও পারবেন না যে, এত বড় ও খরস্রোতা একটা নদীর পানিও সেদিন হতভাগ্য যুবকদের রক্তে লালবর্ণ ধারণ করেছিল।

 

হতভাগ্য যুবকদের রক্তে লাল টাইগ্রিস নদীর পানি

স্থানটি ছিল সাদ্দামের যুগে নির্মিত বড় একটি ব্রিজের ঠিক নীচে। ব্রিজের মাঝখানে মার্কিন বিমান থেকে ছোঁড়া রকেটের আঘাতের চিহ্ন এখনো রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ ব্রিজের মধ্যভাগ ভেঙ্গে ঝুলে পড়লে তা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে যায়। কিন্তু ব্রিজ এতটাই মজবুত ছিল যে, স্থানীয়রা কোন পিলার তৈরি ছাড়াই শুধুমাত্র লোহার শিট দিয়ে ব্রিজের দু’পাশকে সংযুক্ত করে ব্যবহার করছে। ব্রিজ থেকে বিচ্ছিন্ন অংশ এখনও ব্রিজের সাথে ঝুলে রয়েছে।

 

মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্থ টাইগ্রিস নদীর সেই ব্রিজ

গাইডকে জিজ্ঞেস করলাম: দায়েশ কিভাবে এতগুলো ছাত্রকে স্পাইকার থেকে বের করে এখানে নিয়ে এল?

গাইড বললেন: দায়েশিরা জানতো, স্পাইকার ক্যাম্পের সাথে সংঘর্ষ হলে হয় তারা পরাজিত হবে অথবা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়বে। এ কারণে বাথ পার্টির সমর্থক ও স্থানীয় গোত্রের সহযোগিতায় ছাত্রদেরকে ঐ ক্যাম্প থেকে বের করা এবং তাদেরকে নিরস্ত্র করার এক ফন্দি আটা হয়।

দায়েশ সন্ত্রাসীদের বেশ কয়েকজন স্থানীয় পোশাক পরে ঘাঁটির সামনে যেয়ে বলতে থাকে: ‘সর্বশক্তি নিয়ে ঘাঁটির দিকে ধেয়ে আসছে দায়েশ। যদি এ পর্যন্ত পৌঁছুতে পারে তবে আপনাদেরকে গণহারে হত্যা করবে। আমাদের সাথে আসুন, আমরা আপনাদেরকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেব।’

ছদ্মবেশী দায়েশ সন্ত্রাসীরা সংখ্যায়ও ছিল ভারী এবং তাদের অনেকের চেহারা দেখেও বোঝার উপায় ছিল না যে তারা মিথ্যা বলছে। যেভাবে জানা যায়, হয়তবা স্পাইকারের কমান্ডারই যুবকদেরকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, তোমাদেরকে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরিত করা হবে। এভাবেই ঘাঁটিতে উপস্থিত যুবকদেরকে বহু সংখ্যক গাড়ী, ট্রাক ও পিকআপে করে তিকরিতে সাদ্দামের ঐ প্রাসাদে আনা হয়। ওখানে পৌঁছার পর তারা বুঝতে পারে, দায়েশের থাবায় আটকা পড়েছে তারা। তখন আর তাদের করার কিছুই ছিল না।

 

তিকরিতে স্থানান্তর এবং ভয়াবহ পরিণতি

যুবকরা জীবন বাঁচাতে এক পোশাকেই ক্যাম্প ত্যাগ করে গাড়ীতে চেপে বসেছিল, তাদের অনেকে বিশ্রামের পোশাকও পাল্টানোর সুযোগ পায় নি। দলে দলে তাদেরকে এ বধ্যভূমিতে আনা হচ্ছিল, কিন্তু তারা জানতো না কি ভয়াবহ পরিণতি তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। 

শুরুতেই তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হল তোমাদের মধ্যে শিয়া কারা? প্রথমদিকে তারা নিরব থাকলেও ছাত্রদের মধ্য থেকে কয়েকজন শিয়াদেরকে চিহ্নিত করা শুরু করে। এভাবে শিয়া ছাত্রদেরকে আলাদা করা হয়। অতঃপর তাদেরকে দলে দলে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হয়। কিছু ছাত্রকে দজলার ধারে আবার কিছু ছাত্রকে আগে থেকে প্রস্তুত করে রাখা গণকবরের পাশে, আবার কিছু ছাত্রকে প্রাসাদের পেছনে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ঠান্ডা মাথায় একে একে সবাইকে হত্যা করা হয়।

গাইড তখনও কাঁদছিলেন এবং সবিস্তারে ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন। এলাকা দায়েশের কবল থেকে মুক্ত হওয়ার পর প্রথম যে দলটি তিকরিত এসেছিল তিনিও সেই দলে ছিলেন। তিনিও এসে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সারি সারি লাশের স্তূপ দেখেছেন।

তাকে জিজ্ঞেস করলাম, এখানে শহীদ হওয়া ছাত্রদের সঠিক সংখ্যা কত?

উত্তরে বললেন: গণমাধ্যমে যে সংখ্যা প্রাকাশিত হয়েছে -১৭০০ জন- দুঃখজনভাবে তা সঠিক নয়। এ পর্যন্ত আমরা ১৯৩৫ জনকে সনাক্ত করেছি, তবে শহীদদের সংখ্যা আরও বেশী হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল; যাদের সকলেই ছিল শিয়া মাযহাবের অনুসারী। স্পাইকার ক্যাম্পে অধ্যয়নাধীন ও প্রশিক্ষণাধীন ইরাকের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাছাইকৃত মেধাবী ছাত্রদেরকে গণহত্যার মাধ্যমে ইরাককে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছে দায়েশ। আর এটা জানা নেই যে, এ ক্ষতি পূরণ করতে ইরাকের কত বছর সময় লাগবে।

 ঠিকানাসহ ১৯৩৫ শহীদের পরিচয় সনাক্ত করা গেছে

আরেকটু এগিয়ে সাদ্দামের আরেকটি প্রাসাদের কাছে গেলাম; মূল ফটকে লেখা ছিল ‘কাসর-এ সালাহ উদ্দীন’। প্রাসাদটি এতটা মজবুত নির্মাণ করা হয়েছিল যে, মার্কিন বিমান থেকে ছোঁড়া রকেটগুলো দেয়ালে শুধু একটি গর্ত তৈরী করতে পেরেছিল।

কৌতুহল বশত দায়িত্বরত কর্মকর্তাকে প্রাসাদের ভেতরে ঢোকার ইচ্ছার কথা জানালাম। অনুমতি নিয়ে এক সাথে প্রাসাদের ভেতরে ঢুকলাম। আড়ম্বর প্রাসাদটি এক সময় ইরাকের স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট সাদ্দামের বিলাসিতা ও প্রমোদ কেন্দ্র ছিল; যা বর্তমানে একটি পরিত্যক্ত ভবনে পরিণত হয়েছে। শুরুর সেই জৌলুসও হারিয়েছে বহু আগে। সাজ-সজ্জা বলতে উপরে তাকিয়ে অযত্নে ঝুলে ভরা মাত্র একটি ঝুলন্ত ঝাড়বাতি দেখলাম।

 

সাদ্দামের প্রাসাদের ভেতরের দৃশ্য এবং ঝুলে ভরা ঝাড়বাতি

প্রাসাদগুলো সম্পর্কে গাইডকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বললেন: সাদ্দামের পতনের আগে এই প্রাসাদগুলো ছিল অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন ও আড়ম্বর। আর এ অঞ্চলটিও ছিল সবুজ, সুসজ্জিত ও গোছানো। কিন্তু সাদ্দামের পতনের সংবাদ প্রচার হওয়ার সাথে সাথে লোকজন প্রাসাদে যা কিছু ছিল লুট করে নিয়ে যায়। এই ঝাড়বাতির উচ্চতা বেশী হওয়ায় সেটা তারা নিতে পারে নি। কালের আবর্তে সেটাও এখন জীর্ণ। ঐ সময় প্রায় সবকটি প্রাসাদই মার্কিনীদের হামলার মুখে পড়ে এবং আস্তে আস্তে পরিত্যক্ত হয়ে যায়।

 

মার্কিন বিমান থেকে ছোঁড়া রকেট হামলায় প্রাসাদে তৈরি গর্ত

ভাবছিলাম, সাদ্দামের এ ধরনের প্রাসাদ তৈরি ও বিলাসিতা ইরাকের জনগণের জন্য দারিদ্রতা বয়ে এনেছে। সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধে তিনি লিপ্ত হয়েছেন, কিন্তু তার মূল আবাসন বাগদাদে হওয়ায় হয়ত হাতে গোনা কয়েকটি দিনও তিনি এ প্রাসাদগুলোতে কাটাতে পারেন নি।

গাইড বলছিলেন, ইরাকের বিভিন্ন স্থানে সাদ্দাম এ ধরনের প্রাসাদ তৈরি করেছেন, কিন্তু জনগণের উপর এত জুলুম, অত্যাচার ও লুটপাট করে যা তিনি তৈরি করেছিলেন তা ভোগ করতে পারেন নি। সাদ্দাম মারা গেছেন, আর তার অত্যাচারের সাক্ষী পরিত্যক্ত প্রাসাদগুলো পড়ে আছে।

কাসর-এ সালাহ উদ্দীন থেকে বেরিয়ে প্রাসাদের কাছেই একটি গণকবরের দিকে এগিয়ে গেলাম। ঐ কবর থেকে উঠে আসা দূর্গন্ধ দূর থেকেও আমাদের নাকে আসছিল। গাইড বললেন: এখনও অনেক শহীদের লাশ কবরে রয়ে গেছে। তাদের লাশ উত্তোলন ও ডিএনএ পরীক্ষার প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর গতিতে এগুচ্ছে। অথচ তাদের পরিবারগুলো একটি সংবাদ অথবা তাদের কলিজার টুকরোর শরীরের অবশিষ্ট কয়েকটি হাড়ের আশায় দিনের পর দিন পথ চেয়ে থাকে। অবশ্য বহুসংখ্যক লাশ সনাক্ত এবং তাদের পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে, কিন্তু এখনও বহু পরিবার তাদের সন্তানদের সম্পর্কে একটি সংবাদের অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছে।

 

একটি গণকবর দৃশ্য; যেখান থেকে শহীদদের হাড়-হাড্ডি এখনও দেখা যায়

গণকবরের মাটির মাঝে এখনও ছেঁড়া পোশাক, জুতা, স্যান্ডেল এমনকি শহীদদের লাশের অবশিষ্ট অংশও দেখা যাচ্ছিল। গাইড বললেন: যদি দজলার পাশ দিয়ে হাটতে থাকেন তাহলে হয়তবা নদীর ধারে বেত বনের মাঝে এখনও শহীদের লাশ দেখতে পাবেন। আফসোস! যদি শহীদদের লাশগুলো দ্রুত সনাক্ত এবং তাদের পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা যেত।

 

গণকবরে রয়ে যাওয়া শহীদদের চিহ্ন

পথ ধরে এগিয়ে মোটামুটি প্রশস্ত একটি জায়গায় এসে পৌঁছুলাম। উপস্থিতদের একজন বললেন: এখানে যুবকদেরকে এক এক করে ছেড়ে দিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। হতভাগ্য ঐ যুবকদের সংখ্যা এত বেশী ছিল যে, কয়েকশ’ মিটারের এই জায়গাটি সারি সারি লাশের স্তূপ তৈরি হয়েছিল। ঐ অবিশ্বাস্য বর্বরতা ও বিভৎস গণহত্যার ছবিগুলো দেখাটাও ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক এক অভিজ্ঞতা। যা মানুষের হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি করে।

 

হত্যার আরেকটি স্থান

কিভাবে মানুষ এমন ঠাণ্ডা মাথায় হাজার হাজার প্রতিভাবান ও মেধাবী শিক্ষার্থীকে বিনা দোষ ও কারণে হত্যা করতে পারে, তা ভেবেই সত্যিই অবাক হয়েছি। সেটাও আবার এমন স্থানে যা ছিল স্বয়ং সাদ্দামের করুণ পরিণতি সম্পর্কে অন্য মানুষদের জন্য শিক্ষণীয়। বিনোদনের জন্যই প্রাসাদগুলো নির্মাণ করেছিলেন সাদ্দাম। কিন্তু বহু হত্যাযজ্ঞ ও অপরাধের পর নিজেও ধ্বংস হয়ে গেলেন। সন্ত্রাসী দায়েশিদের জন্য ইতিহাসের পূনরাবৃত্তি ঘটলো এবং অবশেষে সাদ্দামের মত তারাও ধ্বংস হয়ে গেল।

দিনের আলো কমে আসার সাথে সাথে আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা অফিসার দ্রুত ঐ স্থান ত্যাগ করার জন্য তাগাদা দিচ্ছিলেন। কিন্তু ঐ হত্যাকাণ্ডের নতুন কিছু  উদ্ঘাটন করার যায় কি না, তাই আমরা আরও কিছু সময় সেখানে থাকতে চাইছিলাম। অবশেষে প্রায় সন্ধার দিকে আমরা বাগদাদের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।

পিচ ঢালা সরু ও নির্জন পথ ধরে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলছে। রাতের আঁধার এবং ঐ যুবকগুলোর অকালে হারিয়ে যাওয়ার স্মৃতি আমাদের মুহূর্তগুলোকে বিষন্ন করে তুলেছিল। সবাই নিরব, রাতের আঁধার ও নিরবতাকে ভেঙ্গে আমাদের গাড়ী বাগদাদের দিকে ছুটে চললো। আর পেছনে পড়ে রইল ২০০০ প্রতিভাবান যুবকের ভঙ্গ হয়ে যাওয়া স্বপ্ন। হয়তবা যখন তারা নিশ্চিত মৃত্যু সম্পর্কে বুঝতে পেরেছিল তখন মহান আল্লাহর দরবারে এই ফরিয়াদই করছিল ‘প্রতিপালক! কি অপরাধে আমাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে!’।#১৭৬ (ফার্সনিউজের প্রতিবেদন অবলম্বনে)


সম্পর্কিত প্রবন্ধসমূহ

আপনার মন্তব্য প্রেরণ করুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ফিল্ডসমূহ * এর মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে

*