?>

হজরত ফাতেমা (আ.) এর ওসিয়ত (পর্ব ০২)

হজরত ফাতেমা (আ.) এর ওসিয়ত (পর্ব ০২)

এরপর তিনি বললেন: আমার পরবর্তী ওসিয়ত হল, যারা আমার উপর জুলুম করেছে এবং আমার অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছে তারা কেউ যেন আমার জানাযা এবং অন্যান্য (দাফন) অনুষ্ঠানে উপস্থিত না হয়। কারণ এরা হচ্ছে আমার শত্রু এবং আল্লাহর রাসুলের (স.) শত্রু।

হলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): হজরত ফাতেমা যাহরা (সা. আ.) এর ওসিয়ত সংশ্লিষ্ট এই প্রবন্ধটির  দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব।

(২য় ও শেষ পর্ব)

ফাতেমা (সা. আ.) বললেন: মহান আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন হে আল্লাহর রাসূলের চাচাতো ভাই। আমার প্রথম ওসিয়ত হল, আমার পর ‘আমার বোনের কন্যা উমামাহ’র সাথে বিয়ে করবে। আমার সন্তানদের বিষয়ে সে আমার মতই দয়ালু। আর পুরুষরা কোন না কোন নারীকে স্ত্রী হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য।

এরপর তিনি বললেন: আমার পরবর্তী ওসিয়ত হল, যারা আমার উপর জুলুম করেছে এবং আমার অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছে তারা কেউ যেন আমার জানাযা এবং অন্যান্য (দাফন) অনুষ্ঠানে উপস্থিত না হয়। কারণ এরা হচ্ছে আমার শত্রু এবং আল্লাহর রাসুলের (স.) শত্রু। সতর্ক থেক তাদের কেউ বা তাদের অনুসারীদের কেউ যেন আমার উপর জানাযার নামায না পড়ে... আমাকে রাতের আঁধারে দাফন কর যখন সকলের চোখ ঘুমে নিমগ্ন।[১]

 

হজরত ফাতেমার (সা. আ.) লিখিত ওসিয়ত

অপর এক বর্ণনায় এসেছে যে, হজরত ফাতেমা (সা. আ.) নিজের ওসিয়ত একটি রুকআহ’তে (তুলা বিশেষ যা কাপড়ের সাথে সেলাই করে দেয়া হয় বা টুকরো কাগজ) লিখে নিজের মাথার (বালিশের) নিচে রেখে দেন। তাঁর বিদায়ের পর আলী (আ.) ঐ রুকআহ বের করে দেখেন নিম্নোক্ত বাক্যাবলি তাতে লেখা রয়েছে:

«بسم الله الرحمن الرحيم، هذا ما اوصت‌ به فاطمة بنت رسول الله، اوصت و هى تشهد ان لا اله الا الله، و ان محمدا عبده و رسوله، و ان الجنة حق و النار حق، و ان الساعة آتية لا ريب فيها، و ان الله يبعث من فى القبور. يا على انا فاطمة بنت محمد زوجنى الله منك لاكون لك فى الدنيا و الآخرة، انت اولى بى من غيرى، حنطنى و غسلنى و كفنى بالليل، و صل على و ادفنى بالليل و لا تعلم احدا، و استودعك الله و اقرء على ولدى السلام الى يوم القيامة‌». [۱۳]

‘পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে। এ হচ্ছে ফাতেমা বিনতে রাসুলুল্লাহ’র (স.) ওসিয়ত। তিনি ওসিয়ত করেছেন এ কথা সাক্ষ্যদানরত অবস্থায় যে, এক আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। তিনি আরও সাক্ষী দিয়েছেন নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ (স.) হলেন তাঁর বান্দা ও রাসুল, (সাক্ষ্য দিয়েছেন) বেহেশত সত্য, জাহান্নাম সত্য, কেয়ামত অবশ্যই আসবে এতে কোন সন্দেহ নেই এবং নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ কবরে থাকা সকল ব্যক্তিকে উত্থিত করবেন।

হে আলী! আমি মুহাম্মাদের (স.) কন্যা ফাতেমা, মহান আল্লাহ্ তোমার সাথে আমাকে বিবাহ দিয়েছেন যাতে আমি দুনিয়া ও আখেরাতে তোমার হতে পারি। আমার (জানাজার) কার্যাদি সমাধার ক্ষেত্রে অন্যদের উপর তোমার অগ্রাধিকার রয়েছে! আমাকে রাতে হুনুত ও গোসল দিও এবং কাফন পরিয়ো। আর আমার উপর নামাজ পড়ে রাতের আঁধারেই আমাকে দাফন করে দিও, এ বিষয়ে কাউকে জানতে দিও না। তোমাকে আল্লাহর উপর সোপর্দ করলাম, আর আমি আমার সন্তানদের উপর কেয়ামত অবধি সালাম প্রেরণ করতে থাকবো। [১৩ ও ১৪]

শেইখ মুফিদের মাজালিস ও শাইখের আমালি’তে ইমাম হুসাইন (আ.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এরূপ বর্ণিত হয়েছে যে, ‘নবিকন্যা ফাতেমা (সা. আ.) অসুস্থ হলে আলী (আ.) কে ওসিয়ত করলেন: যেন তাঁর অবস্থার সংবাদ গোপন রাখেন। এমনকি এও বললেন যেন তার অসুস্থতার বিষয়ে কাউকে অবগত না করা হয়। আলীও (আ.) তাঁর কথামত কাউকে জানালেন না এবং নিজেই ফাতেমা (সা. আ.) এর সেবা-শশ্রুষা করতে লাগলেন। কখনো কখনো আসমা বিনতে উমাইস (রা.) গোপনে তাঁকে সাহায্য করতেন। যখন বিদায়ের মুহূর্ত ঘনিয়ে এল তিনি আলী (আ.) কে ওসিয়ত করলেন, যাতে তাঁর ইন্তেকালের পর তার কার্যাদি আলীই (আ.) সমাধা করেন। রাতের আঁধারে তাঁকে দাফন করেন, তাঁর কবরের স্থানটিও যেন গোপন রাখেন এবং তাঁর কবরের কোন চিহ্নই যেন না রাখেন। [১৫]

 

সম্পত্তি প্রসঙ্গে ওসিয়ত

দালায়েল-এ তাবারি গ্রন্থে ইমাম বাকির (আ.) এর উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: ফাতেমা (সা. আ.) ওসিয়ত করলেন যেন তার সম্পত্তি থেকে নবিপত্নীগণ (রা.) কে এবং বনি হাশিমের নারীদেরকে ১২ উকিয়াহ প্রদান করেন এবং ওমামাহ বিনতে আবিল আসকেও একই পরিমাণ প্রদান করা হয়।

অপর একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, যায়দ বিন আলী (আ.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ফাতেমা (সা. আ.) নিজের সম্পদ বনি হাশিম এবং আব্দুল মুত্তালিবের সন্তানদেরকে দান করে যান। আলীও (আ.) এ কাজ সম্পাদন করেছেন...। [১৬]

ইমাম বাকির (আ.) এর উদ্ধৃতি দিয়ে কাশফুল গুম্মাহ’তে বর্ণিত হয়েছে, হজরত ফাতেমা (সা. আ.) ওসিয়ত করেন: ‘হাওয়ায়েত-এ সাবআহ আলীর অধিনে থাকবে, তাঁর পর হাসান এবং তাঁর পর হুসাইনের নিকট পৌঁছুবে। তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্রের অধিনে থাকবে। এই ওসিয়ত নামাটি হজরত আলীর (আ.) হাতেই লেখা ছিল এবং মেকদাদ বিন আসওয়াদ ও যুবাইর বিন আওয়ামে তাতে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।

রাসুলি মাহাল্লাতি লিখেছেন: ‘হাওয়ায়েত’ শব্দটি ‘হায়েত’ শব্দের বহুবচন; এমন বাগানকে বোঝায় যার চতুর্দিকে দেয়াল দিয়ে বেষ্টিত। আর এ রেওয়ায়েতে বর্ণিত ‘হাওয়ায়েত’-এ ফাতেমা হচ্ছে ‘মাবিত, আওয়াফ, দাল্লাল, হাসানি, বোরক্বাহ, সাফিয়াহ, মাশরাবাহ’ নামের ৭টি বাগান। ফাদাক ছাড়াও মহানবি (স.) এই বাগনগুলিকে হজরত ফাতেমা (সা. আ.) কে ওয়াকফ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে যা ফাতেমা (সা. আ.) এর সন্তানদের মওকুফা (ওয়াকফকৃত) সম্পত্তি হয়ে যায়।

আবার কারও কারও মতে ‘হাওয়ায়েত-এ সাবআহ’ হলে সেই বাগান যা কিছু কিছু রেওয়ায়েতে ‘আওয়ালি’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বাগানগুলো ‘মুখাইরিক’ নামক ইহুদি মারফত আল্লাহর রাসূল (স.) এর হস্তগত হয়। মুখাইরাক, ওহুদের যুদ্ধে মুসলমান হয়ে সেদিনই শাহাদাত বরণ করেন। তিনি রনাঙ্গনে যাবার আগ মুহূর্তে চিৎকার করে বলেন: ‘তোমরা সকলে সাক্ষী থেকো আমি মুসলমান হয়েছি। আমি যদি এ যুদ্ধে মারা যাই তাহলে আমার সকল সম্পত্তির অধিকারী হবে আল্লাহর রাসুল (স.)।’

ইতিহাস ও রেওয়ায়েতের বর্ণনায় এ বিষয়টি স্পষ্ট নয় যে, ঐ ৭টি বাগান হজরত ফাতেমা (সা. আ.) এর দখলে ছিল নাকি ফাদাকের মত সেগুলোকেও হজরত আবুবকর কেড়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু যদি উপরোক্ত রেওয়ায়েতটির সনদ বিশ্বস্ত হয়ে থাকে তবে এ সম্ভাবনা অমূলক নয় যে, উল্লেখিত বাগানগুলো হজরত ফাতেমা (সা. আ.) এর হাতে ছিল এবং সেগুলোর দায়িত্ব তিনি হজরত আলী (আ.) এর হাতে অর্পন করে সেগুলো প্রসঙ্গে ওসিয়ত করে যান।

 

যাইহোক ওসিয়তের আলোচনায় ফিরে আসি, অপ্রসিদ্ধ কিছু কিছু বর্ণনায় এসেছে যে, ফাতেমা (সা. আ.) হজরত আলী (আ.) কে যে সকল ওসিয়ত করেছিলেন, সেগুলো হল:

কিছু কিছু রেওয়ায়েতে এসেছে যে, ফাতেমা (সা. আ.) দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার পূর্বে গোসল করে নতুন পোশাক পরেন এবং আবু রাফে’র স্ত্রী সালমা’কে বলেন: ‘আমি গোসল করেছি, কেউ যেন আমার শরীরকে অনাবৃত না করে’। [১৭]

কিন্তু এখানে প্রাণিধান যোগ্য যে, এই রেওয়ায়েতে –যেভাবে মরহুম মাজলিসি ও অন্যান্যরা বলেছেন- হজরত ফাতেমা যাহরা (সা. আ.) এটা বোঝাতে চাননি যে, আমাকে গোসল দিও না; কেননা মৃত ব্যক্তির গোসল দান করা একটি ওয়াজিব কাজ এবং প্রত্যেক মুসলিম মৃত ব্যক্তির ক্ষেত্রে এ আমল আঞ্জাম দিতে হয়, এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও নেই। তবে যে রণক্ষেত্রে শহীদ হয়েছে তার বিষয়টি আলাদা। তবে এ ব্যতিক্রমটিও আবার শর্ত সাপেক্ষে; যেগুলো ফিকাহ সংশ্লিষ্ট গ্রন্থসমূহে উল্লেখিত হয়েছে। এছাড়া, বহুসংখ্যক প্রসিদ্ধ রেওয়ায়েত রয়েছে যে, আমরা জানি হজরত আলী (আ.) আসমার (রা.) সহযোগিতায় হজরত ফাতেমার (সা. আ.) জানাযা মোবারককে রাতের আঁধারে গোসল দান করেছিলেন।

হজরত ফাতেমা (সা. আ.) ঐ ওসিয়তের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, আমার শরীর আলাদাভাবে পরিচ্ছন্ন করতে অনাবৃত করার প্রয়োজন নেই। এ কারণেই আগামীতে আগত একটি রেওয়ায়েতে উল্লেখিত হয়েছে যে, হজরত আলী (আ.) ফাতেমা (সা. আ.) এর জানাযা মোবারক পোশাকে আবৃত রেখেই গোসল দান করেছিলেন এবং নিজের সহধর্মিনীর এ ওসিয়ত তিনি পূরণ করেছিলেন।

যদিও কেউ কেউ বলতে চান: হয়তবা স্বামীর প্রতি তীব্র ভালবাসার কারণে এ ওসিয়ত তিনি করেছিলেন। তিনি (সা. আ.) চাননি যতদিন জীবিত আছেন ততদিন আলী (আ.) তাঁর আঘাতে ফুলে থাকা হাত, ভাঙ্গা পাঁজড় এবং কালশিটে পড়া শরীর দেখে আরও অধিক কষ্ট পান, তাই তিনি এরূপ ওসিয়ত করেছিলেন। কিন্তু যখন তিনি ওসিয়ত করলেন যে আলী (আ.) তাকে গোসল দান করবেন এবং অপর কেউ যেন এ কাজ না করে। মূলতঃ তিনি এ চিন্তায় ছিলেন যে, আলী (আ.) চান বা না চান যখন তাঁকে গোসল দেবেন তখন হজরত ফাতেমা যাহরা (সা. আ.) এর হাত, পাজড় এবং কালশিটে পড়া শরীর তাঁর চোখে পড়বে, তখন তিনি আরও বেশী শোকাতুর হয়ে পড়বেন। এ কারণেই তিনি এমন ওসিয়ত করেছিলেন এবং ওসিয়তের সাথে এ অংশটিও জুড়ে দিয়েছিলেন।  

কেউ কেউ আবার এ সম্ভাবনাও দিয়েছেন যে, রাতে গোসল দেয়ার বিষয়ে তাঁর ওসিয়তের কারণও হল, তার শরীরের বিভিন্ন আঘাতের চিহ্ন যেন আলী দেখে না ফেলে এবং তাঁর মৃত্যুর শোকের পাশে আলীর (আ.) জন্য যেন আবার একটি নতুন শোক যোগ না হয়।

যাইহোক, উপরে উল্লিখিত দু’টির যে কোন একটি হজরত ফাতেমা যাহরা (সা. আ.) এর ওসিয়তের কারণ হতে পারে। তিনি এটা বোঝাতে চাননি যে, তাঁকে গোসল দেয়ার প্রয়োজন নেই, বা এটাও বোঝাতে চাননি যে, তাঁকে যেন গোসল ছাড়াই দাফন করা হয়।

আর এর মাধ্যমে এ প্রশ্ন ও সংশয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায় যে, এ কেমন নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন? অথবা আলী (আ.) এ ওসিয়তের উপর আমল না করে ফাতেমাকে (সা. আ.) কে কেন গোসল দিয়েছিলেন।#176

[২ পর্বের এ লেখাটি ‘উইকি আহলুল বাইত’ (আ.) ওয়েব সাইট থেকে নেয়া হয়েছে। মূল লেখাটি রাসুলি মাহাল্লাতি রচিত ‘যিন্দেগানি হজরত ফাতেম যাহরা (সা. আ.) থেকে উদ্ধৃত।]

গ্রন্থসূত্র:

১. বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৪৩, পৃ. ১৯১-১৯২।

২ ও ৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ২১৪।

৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ২১১।

৫. প্রাগুক্ত পৃ. ২১৮।

৬. প্রাগুক্ত পৃ. ১৭২, ১৮৩ ও ১৮৭।


সম্পর্কিত প্রবন্ধসমূহ

আপনার মন্তব্য প্রেরণ করুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ফিল্ডসমূহ * এর মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে

*