?>
মিলাদুন্নাবী (স.) উপলক্ষে সর্বোচ্চ নেতার বক্তব্য;

‘ইসলামের সার্বিক অধিকার আদায়’ ও ‘ইসলামি ঐক্য প্রতিষ্ঠা’ মুসলিম উম্মাহ’র ২ গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য : সর্বোচ্চ নেতা

‘ইসলামের সার্বিক অধিকার আদায়’ ও ‘ইসলামি ঐক্য প্রতিষ্ঠা’ মুসলিম উম্মাহ’র ২ গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য : সর্বোচ্চ নেতা

ইসলামি বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা বলেছেন: মহানবি (স.)-এর জন্ম ইতিহাসের এক মহা ঘটনা। মহান আল্লাহ্ মানুষের সৌভাগ্য ও সফলতার পূর্ণ কর্মসূচী নবি (স.)-কে প্রদান করে তাঁকে তা বাস্তবায়ন এবং তার অনুসারীদেরকেও তা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব, প্রত্যেক যুগের মু’মিনগণের উচিত নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা এবং সেগুলো বাস্তবায়ন করা ও সেগুলোর উপর আমল করা।

হলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): মহানবি হজরত মুহাম্মাদ (স.) ও তাঁর বংশধারার ষষ্ঠ ইমাম হজরত জাফর সাদিক (আ.)-এর পবিত্র জন্মবার্ষিকীতে ইসলামি বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আল-উজমা সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং আন্তর্জাতিক ইসলামি ঐক্য সম্মেলনে অংশগ্রহণ করতে আগত দেশী-বিদেশী অতিথিদের উদ্দেশ্যে গুরত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন। তিনি তার বক্তব্যে ‘মানব জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলাম ধর্মের সার্বিক অধিকার আদায় ও এর প্রসার’ এবং ‘ইসলামি ঐক্য প্রতিষ্ঠা’ -মুসলিম উম্মাহ’র দুই গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য বলে আখ্যায়িত করে বলেন: ‘ইসলামি ঐক্য একটি মৌলিক বিষয়, পবিত্র কুরআনে যা আমাদের জন্য ফরজ ঘোষণা করা হয়েছে এবং নব ইসলামি সভ্যতা প্রতিষ্ঠার সুউচ্চ লক্ষ্যে শিয়া ও সুন্নির মধ্যকার ঐক্যের বিকল্প নেই।

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নাবী (স.) উপলক্ষে ইরানি জাতি, মুসলিম উম্মাহ এবং বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষদের প্রতি মোবারকবাদ জ্ঞাপন করে মহানবি (স.)-এর আগমনকে মানব জীবনে ঐশী অনুগ্রহ ও কৃপা বর্ষণের নতুন যুগের সূচনার একটি মহাঘটনা বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন: মহান আল্লাহ্ মানুষের সৌভাগ্যের পূর্ণ কর্মসূচী নবি (স.)-কে প্রদান করে তাঁকে তা বাস্তবায়ন এবং তার অনুসারীদেরকেও তা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব, প্রত্যেক যুগের মু’মিনগণের উচিত নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা এবং সেগুলো বাস্তবায়ন করা ও সেগুলোর উপর আমল করা।

মানব জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলাম ধর্মের সার্বিক অধিকার আদায় ও এর প্রসার’ এবং ‘ইসলামি ঐক্য প্রতিষ্ঠা’ মুসলিম উম্মাহ’র ২ গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য বলে উল্লেখ করে প্রথম কর্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন: বস্তুবাদী ও রাজনৈতিক শক্তিগুলো পূর্ব থেকে ইসলাম ধর্মকে মানবজীবনের সর্বক্ষেত্রে বিরাজমান কর্মসূচীর সমষ্টি হিসেবে উল্লেখ না করে এটাকে ব্যক্তিগত আমল এবং অন্তরের বিশ্বাস বলে পরিচয় করানোর সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে আসছে। তারা বোঝাতে চায় যে, ‘নতুন সভ্যতা প্রতিষ্ঠা ও সমাজ পরিচালনা’, ‘অর্থনীতি এবং সম্পদ ও ক্ষমতা বন্টন’, ‘যুদ্ধ ও সন্ধি’, ‘দেশীয় ও পররাষ্ট্র নীতি’, ‘ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা এবং জুলুম ও অত্যাচারীদের মোকাবিলা’-এর মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইসলাম ধর্ম না চিন্তাগত দিক থেকে আমাদের শরণাপন্ন হওয়ার স্থান হতে পারে আর না ব্যবহারিক কোন নির্দেশিকা। ইসলামি গ্রন্থগুলি ইসলাম থেকে এ ধরনের উপলব্ধিকে স্পষ্ট ভাষায় প্রত্যাখ্যান করে।

‘ইসলাম ধর্মের অধিকার আদায়’ ব্যাখ্যা ও প্রচারের উপর নির্ভরশীল। মানব জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলাম বিরাজমান; অন্তরের গভীরের আকিদা ও ইবাদত সংক্রান্ত বিষয়াদি থেকে শুরু করে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বিষয়াদিসহ মানবজীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামের তৎপরতা ও হস্তক্ষেপ রয়েছে। সুতরাং যে কেউ এই অর্থ অস্বীকার করে নিশ্চিতভাবে সে পবিত্র কুরআনের স্পষ্ট বর্ণনা ও অসংখ্য আয়াতকে তোয়াক্কা করে নি।

হজরত আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী ‘মুসলিম উম্মাহ’র ঐক্যের প্রতি গুরুত্বারোপ করে ইসলাম ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অক্লান্ত তৎপরতা চালানো ব্যক্তিবর্গ মরহুম জনাব তাসখিরি, শহীদ মুহাম্মাদ রামাদ্বান আল-বুতি, মরহুম ওয়ায়েজ যাদে, শহীদ সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ বাকির হাকিম, মরহুম শাইখ আহমাদ আয-যাইন ও মরহুম শাইখ সাঈদ শা’বানের নাম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।

তিনি বলেন: ইসলামি ঐক্য একটি মৌলিক বিষয় যা পবিত্র কুরআনের আমাদের জন্য ফরজ ঘোষণা করা হয়েছে; এটা কোন কৌশলগত বা বিশেষ পরিস্থিতিতে বাস্তবায়নযোগ্য কোন বিষয় নয়। আর এ সমন্বয় মুসলমানদের শক্তিশালী হওয়ার কারণ হবে, যাতে শক্তিশালী অবস্থানে থেকে অমুসলিম দেশগুলোর সাথে পারস্পারিক সম্পর্কের বিষয়ে কথা বলা যায়।

২ কারণে বারবার ইসলামি ঐক্যের বিষয়টির প্রতি গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে; প্রথমতঃ মাযহাবসমূহের মধ্যকার দূরত্ব এবং দ্বিতীয়তঃ এ দূরত্ব বৃদ্ধিতে শত্রুদের আপ্রাণ চেষ্টা। বর্তমানে শিয়া ও সুন্নি শব্দদ্বয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বচনেও প্রবেশ করেছে। অথচ তারা ইসলাম ধর্মের বিরোধী ও শত্রু। মুসলিম বিশ্বের যেকোন প্রান্তে যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের প্রশিক্ষিতরা ফেতনা সৃষ্টির জন্য চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। আফগানিস্তানের মসজিদে নামাজরত মুসল্লিদের উপর মর্মান্তিক যে হামলা চালানো হয়েছে তা এর দৃষ্টান্ত মাত্র; যার নেপথ্যে রয়েছে দায়েশ (আইসিস), আর মার্কিনীরা তো স্পষ্ট ভাষায় এ কথা স্বীকার করেছিল যে, ‘আমরাই দায়েশকে সৃষ্টি করেছি’।

ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শুধুমাত্র বাৎসরিক সম্মেলন আয়োজন যথেষ্ঠ নয় -এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন: এ বিষয়ে নিরন্তর আলোচনা, ব্যাখ্যা, উৎসাহ, পরিকল্পনা ও স্থায়ীভাবে কাজ ভাগ করে নিতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ আফগানিস্তানের ঘটনার কথাই ধরি, এ ধরনের ঘটনার রুখতে দেশটির বর্তমান কর্মকর্তাদের বিভিন্ন মসজিদ ও ধর্মীয় কেন্দ্রে উপস্থিতি অথবা আহলে সুন্নত ভাইদেরকে যৌথ (শিয়া-সুন্নি) সমাবেশে অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহিত করা হতে পারে একটি সমাধান।

 হজরত আয়াতুল্লাহ আল-উজমা খামেনেয়ী বলেন: নতুন ইসলামি সভ্যতা গঠনের সুউচ্চ লক্ষ্যে পৌঁছুতে শিয়া ও সুন্নির মাঝে ঐক্যের বিকল্প নেই। ফিলিস্তিনের ইস্যু হতে পারে মুসলমানদের ঐক্যের প্রধান সূচক। ফিলিস্তিনীদের অধিকার আদায়ের বিষয়টিকে আমরা যতবেশী গুরুত্ব দেব ইসলামি ঐক্য ততবেশী শক্তিশালী হবে।

তিনি বলেন: দখলদার জায়নবাদীদের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করণে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু কিছু দেশ যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা পাপ ও গুনাহ। ঐ সকল দেশের সরকারের উচিত ইসলামি ঐক্য বিরোধী এ ধরণের পদক্ষেপ থেকে প্রত্যাবর্তন করা এবং নিজেদের বৃহৎ ভুলের কারণে সৃষ্ট ক্ষতি পূরণে সচেষ্ট হওয়া।

তিনি তার বক্তব্যের শেষাংশ ইরানের জনগণের উদ্দেশ্যে বলেন: মহানবি (স.)-এর অনুসরণ শুধুমাত্র তাঁকে অনুকরণ এবং তাঁকে নিজের জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণের মাধ্যমেই বাস্তবায়নযোগ্য; বিশেষতঃ ‘ধৈর্য’, ‘ন্যায়পরায়ণতা’ ও ‘নৈতিকতা’ তাঁর এ ৩ অনুপম বৈশিষ্ট্য। ধৈর্য হল; গুনাহ এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অলসতার বিপরীতে দৃঢ় থাকা ও নিজেকে সামলানো, একইভাবে শত্রু ও অন্যান্য দুর্ভোগের বিপরীতে দৃঢ় থাকা।

ইরানের কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন: বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্য যে কোন পদক্ষেপের চেয়ে প্রতিরোধ ও দৃঢ়তা জরুরী। বিভিন্ন চাপ ও সমস্যার বিপরীতে দৃঢ় থেকে তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে, কোন অবস্থাতেই থেমে থাকবেন না।

নবিগণ (আ.)-কে প্রেরণের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যগুলোর একটি হল ‘ন্যায়পরায়ণতা’র প্রসার –এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন: পবিত্র কুরআনে এমনকি শত্রুর সাথেও ন্যায়ভিত্তিক আচরণকে জরুরী ঘোষণা করা হয়েছে। ন্যায়ভিত্তিক আচরণের বিষয়ে কর্মকর্তারা সর্বাগ্রে দায়িত্বশীল। সকল সিদ্ধান্ত ও নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে অবশ্যই ন্যায়পরায়ণতাকে বিবেচনায় রাখতে হবে। ন্যায়ভিত্তিত নীতিকে শুধুমাত্র সম্পদ ও অর্থ বন্টনের মাঝে সীমাবদ্ধ না করে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে এর বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে।

কখনো কখনো সোশ্যাল মিডিয়াতে বাস্তবতা বিরোধী বিভিন্ন মন্তব্য করা হয় এবং অন্যের উপরঅপবাদ আরোপ করা হয় যা ন্যায়পরায়ণতা বিরোধী। এ ক্ষেত্রে যারা এই স্পেসে সক্রিয় এবং এ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা উভয়কেই সতর্ক থাকতে হবে।

ন্যায়নীতি ভিত্তিক আচরণ শিখতে হবে। এমনকি যদি কোন পরিস্থিতিতে আমরা কারো কথাকে গ্রহণ করতে না পারি তবে যেন নিজের বিরোধিতাকে অপবাদ, মিথ্যা ও অবমাননা মিশ্রিত করে উপস্থাপন না করি।

‘মহানবি (স.)-এর মহান নৈতিকতা’ সম্পর্কে তিনি বলেন: ইসলামি নৈতিকতা হল নম্রতা, ক্ষমা, ব্যক্তিগত বিষয়গুলোতে মোলায়েম আচরণ করা ও দয়া-অনুগ্রহ ইত্যাদি। এছাড়া মিথ্যা বলা, অপবাদ আরোপ করা, ও মু’মিনের প্রতি কুধারণা পোষণের মত বিষয়াদি পরিহার করার বিষয়টি যেন আমাদের জীবনের স্থায়ী কর্মসূচী হিসেবে বিবেচিত হয়।

তিনি বলেন: আমরা মুসলিম এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের (অধিকারী) হওয়ার যে দাবী করি তা আমাদের পদক্ষেপ ও কাজকর্ম ফুটে উঠবে এবং আমলে আমাদেরকে মহানবি (স.)-এর অনুসারী হতে হবে।

ইসলামি বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতার বক্তব্যের আগে ইরানের প্রেসিডেন্ট হুজ্জাতুল ইসলাম ড. রায়িসি মহানবি (স.)-কে মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বড় নেয়ামত এবং পরিবর্তনের চূড়া হিসেবে আখ্যায়িত করেন।#176


সম্পর্কিত প্রবন্ধসমূহ

আপনার মন্তব্য প্রেরণ করুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ফিল্ডসমূহ * এর মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে

*