১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ২৩:৫০
অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা থেকে আলাদা নয়।

আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা থেকে আলাদা নয়। কোনো দেশের বাণিজ্য, জ্বালানি, অবকাঠামো বা আর্থিক ব্যবস্থা রাজনৈতিক-সামরিক চাপের মুখে পড়লে তার প্রভাব ওই দেশের সীমানা ছাড়িয়ে যায়।

ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের অর্থনৈতিক ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার সময় পেজেশকিয়ান বলেন, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগে অর্থনৈতিক হাতিয়ারের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার দেশগুলোর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে।

তিনি বলেন, ব্রিকসের প্রকৃত শক্তি শুধু সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক আকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থায়নের একটি যৌথ নেটওয়ার্কে এই সক্ষমতাগুলোকে রূপান্তর করার মধ্যেই এর প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পাবে।

পেজেশকিয়ান বলেন, বাণিজ্যিক অংশীদার, অর্থায়ন এবং অর্থ পরিশোধের পথের বৈচিত্র্য ছাড়া অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা সম্ভব নয়। ইরান গত কয়েক বছর ধরে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনের কারণে এই চাপ আরও কঠিন ও বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

তিনি আরও বলেন, এই আগ্রাসন মানবিক ও বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা আবারও স্পষ্ট করেছে—অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। কোনো দেশের বাণিজ্য, জ্বালানি, অবকাঠামো বা আর্থিক ব্যবস্থা রাজনৈতিক-সামরিক চাপের মুখে পড়লে এর প্রভাব সীমান্ত ছাড়িয়ে আঞ্চলিক এমনকি বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও পড়বে।

পেজেশকিয়ান প্রস্তাব করেন, ব্রিকসকে সদস্য দেশ ও বৈশ্বিক দক্ষিণের অর্থনীতির জন্য আরও স্থিতিস্থাপক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো দেশ একক কোনো আর্থিক বা প্রযুক্তিগত হাতিয়ারের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে অন্য দেশের বৈধ বাণিজ্য ব্যাহত করতে না পারে।

তিনি বলেন, ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য বাড়াতে বিচ্ছিন্ন সহযোগিতা থেকে ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক অবকাঠামোর সমন্বয়ের দিকে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশন, কাস্টমস প্রক্রিয়ার সমন্বয়, বাণিজ্য সহজীকরণ, নিয়ন্ত্রক ও প্রশাসনিক বাধা কমানো, বাজার সম্প্রসারণ এবং বেসরকারি খাতে যৌথ বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ।

পেজেশকিয়ান আরও বলেন, কাঁচামাল বিনিময়ের বাজার থেকে ব্রিকসকে যৌথ মূল্য ব্যবস্থা ও উৎপাদনের নেটওয়ার্কে পরিণত করতে মান নির্ধারণে সহযোগিতা জোরদার করা দরকার।

তিনি বলেন, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা অর্থনৈতিক নিরাপত্তার দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। বিপুল জ্বালানি মজুত ও কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইরান ব্রিকসের জ্বালানি, খাদ্য ও পরিবহন সরবরাহ ব্যবস্থায় কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ভূমিকা পালনে প্রস্তুত।

ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যে জাতীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানো অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। পাশাপাশি মুদ্রা বিনিময়ের ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

তিনি প্রস্তাব করেন, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বিশেষ ঋণসুবিধা, স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য গ্যারান্টি ব্যবস্থার মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে অর্থায়নের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।

পেজেশকিয়ান আরও একটি প্রস্তাব দেন—১০ বিলিয়ন ডলার প্রাথমিক মূলধন নিয়ে একটি যৌথ ব্রিকস পুনর্বীমা কোম্পানি গঠন করা। এর মাধ্যমে বড় অবকাঠামো ও জ্বালানি প্রকল্পের ঝুঁকি কমিয়ে বেসরকারি খাতের আস্থা বাড়ানো সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রবেশের ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন ঘটছে। ব্রিকসের শুধু প্রযুক্তির ভোক্তা হওয়া উচিত নয়; বরং জ্ঞান উৎপাদন ও ডিজিটাল অর্থনীতির মানদণ্ড নির্ধারণেও ভূমিকা রাখা উচিত। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সাইবার নিরাপত্তাও জোরদার করতে হবে।

পেজেশকিয়ান বলেন, ব্রিকস বিজনেস কাউন্সিলকে শুধু আলোচনার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে না রেখে অর্থনৈতিক সহযোগিতার কার্যকর চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে হবে। অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্যে জাতীয় মুদ্রার অংশ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণের মতো পরিমাপযোগ্য সূচকের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত।

তিনি বলেন, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান ও জ্বালানি সম্পদের কারণে ইরান অর্থনৈতিক সংযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হতে প্রস্তুত। ব্রিকস তখনই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রকৃত শক্তিতে পরিণত হবে, যখন এর সহযোগিতার সুফল চুক্তি, কারখানা, বন্দর এবং সদস্য দেশগুলোর মানুষের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক জীবনে দৃশ্যমান হবে।

পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান ব্রিকসের সব সদস্যের সঙ্গে মিলে আরও উন্মুক্ত, স্থিতিস্থাপক ও ন্যায়সঙ্গত অর্থনীতি গড়ে তুলতে কাজ করতে প্রস্তুত।

Tags

Your Comment

You are replying to: .
captcha