মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমেরিকার অপছায়া কি ক্রমেই সরে যাচ্ছে?

  • News Code : 801630
  • Source : ABNA
Brief

মধ্য এশিয়ার অন্য মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে মার্কিন সম্পর্কের চিড় ধরে ‘আরব বসন্তে’র সময়ে। এসব দেশের শাসকরা হোঁচট খেয়েছিল যখন আমেরিকার দীর্ঘদিনের সহযোগী দেশ মিশরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক ক্ষমতাচ্যুত হয়। এ ঘটনায় আমেরিকা যখন নিস্পৃহ নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করে, তখন তারা এ নিয়ে শঙ্কিত ছিল যে, তাদের বিপদ হলেও আমেরিকা একই আচরণ করবে কি না।

হলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা):- ২০১৬-এর সর্বশেষ পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্নটির উত্তর, হ্যাঁ-বোধক। মাত্র চার-বছর যেতে না যেতেই সিরিয়ার আলেপ্পো শহর আবার চলে এসেছে প্রেসিডেন্ট আসাদের কতৃত্বে। নিজ স্বার্থ সংরক্ষণ ও ইসরাইলের পথের-কাঁটা দূর করার লক্ষ্যে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদে’র বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় যুক্তরাষ্ট্র। অপর দিকে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদে’র পক্ষে সরাসরি পূর্ণ-সহযোগিতা দিতে থাকে রাশিয়া, ইরান, ও লেবানন (হিজবুল্লাহ)। আলেপ্পো ‘উদ্ধার’ যখন প্রায় চূড়ান্ত, সে মুহুর্তে মস্কোয় বৈঠকে মিলিত হয়েছেন রাশিয়া, ইরান ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। সেই বৈঠকে আমেরিকার বিষয়কে কেয়ারই করা হয়নি। পাস কাটানো হয়েছে জাতিসংঘকেও। বৈঠকটি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি রাশিয়া ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তারপরেও বৈঠক হয়েছে এবং এটা নিশ্চিত যে, প্রেসিডেন্ট আসাদের ক্ষমতাকে আরো মজবুত করতেই এই বৈঠক।

কিভাবে দৃশ্যপটগুলো এত দ্রুত বদলে যাচ্ছে? অপরাজেয় (!) মার্কিনীদের তল্পিবাহকরা কি ভাবে এত বড় ধাক্কা খেল এসব নিয়েই কিছু খণ্ডচিত্র তুলে ধরছি। খুব পিছিয়ে না গিয়ে, গত দু’দশকে মধ্যপ্রাচ্যে’র মুসলিম দেশগুলোর রাজনীতির দিকে তাকালে, এ অঞ্চলে আমেরিকার বিদ্বেষপূর্ণ ও দৈত-নীতির উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে জ্বলজ্বল করছে তা অনুমেয়। এ অঞ্চলের সব সঙ্কটের মূলে যে নামটি জড়িয়ে আছে সেটা হচ্ছে আমেরিকা। এমনকি বলা চলে আমেরিকার আগ্রাসী-পররাষ্ট্রনীতি এখন সঙ্কট জনক হয়ে উঠেছে। পাঁচ বছর আগে প্রেসিডেন্ট আসাদকে ক্ষমতাচ্যূত করার ডাক দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। সেই পরিবর্তনের অংশ হিসাবে তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে সেনা সরিয়ে নেন। এখন তিনি নিজেই বিদায়ী, সাথে তার অনেক ক্ষমতাধর বন্ধুবরও!

সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ বাঁধিয়ে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসবাদের বিস্তার ঘটিয়ে মূলতঃ ওবামা প্রশাসন চেয়েছিল ইসরাইল এর স্বার্থকে সংরক্ষণ করতে ও মুসলিম দেশগুলোর বিপুল সম্পদ অবৈধভাবে ভোগ-দখল অব্যহত রাখতে। শান্তির পথ বের করার নামে শিয়া-সুন্নি ইস্যুকে উস্কে দিয়ে ও পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী দেখিয়ে ঘোলা-পানিতে মাছ শিকারের নাটক দেখানোর আয়োজন করেছিল তারা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট আসাদকে ক্ষমতাচ্যূত করতে ব্যর্থ্য হওয়ায় মার্কিন প্রশাসনের সে গুড়ে বালি পড়ে। এটা মার্কিন কূটনীতির প্রকাশ্য পরাজয়ও বটে!!

এ দৃশ্য মুসলিম নামধারী স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী বিশেষ করে সৌদি আরব ও কাতারকে চরমভাবে হতাশ করেছে। এসব বর্ণচোরা মুসলিম শাসকগোষ্ঠী নিজেদের অবৈধ ক্ষমতার ভীতকে স্থায়ী করতে দেশ ও জনস্বার্থের বিরুদ্ধে ভূমিকা পালনে চিরকালই স্বিদ্ধহস্ত। এই তাবেদার মোসাহেব শাসকগোষ্ঠী (আলে-সৌদ) ও আমেরিকা মিলে একদিকে সন্ত্রাসী সংগঠন আইএসআইএল-এর বিরুদ্ধে লোক দেখানো জোট তৈরি, অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট আসাদে’র বিরোধিতা বজায় রাখতে গিয়ে আবার সেই সন্ত্রাসী সংগঠন আইএসআইএল’কে মদদ দেওয়ার কার্যক্রমে পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, তাদের এ সকল আয়োজন ছিল কেবল বিশ্ব জনমতকে ধোকা দেওয়া।

সন্ত্রাসী সংগঠন আইএসআইএল-এর বিরুদ্ধে প্রকৃত অর্থে যুদ্ধ করতে আমেরিকার দরকার ইরাক, ইরান, রাশিয়া, সিরিয়া ও লেবানন (হিজবুল্লাহ) এর সাহায্য;কারণ মূলতঃ তারাই আইএসআইএল বিরোধী যুদ্ধে ফ্রন্ট লাইনে রয়েছে। কিন্তু আমেরিকা ও তার বন্ধুদের জন্য সে চিন্তা তো বিষপানের মতো। আবার অন্যদিকে আসাদের বিরুদ্ধে আইএসআইএল’কে সাহায্য করতে গেলে নিজেদের শান্তিকামিতার মূখোশ খসে পড়ে অথবা সেই ইরাক, ইরান, রাশিয়া ও সিরিয়া জোটের বিরোধিতা করা লাগে। এসব দোটানা-দোমুখো কার্যক্রম সামাল দিতে গিয়ে আমেরিকা ও তার মিত্রদের নাজেহাল অবস্থা।

উপরন্তু ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক সমঝোতার বিষয়ে অন্যতম উদ্যোক্তার ভূমিকা নিতে বাধ্য হয় আমেরিকা। সৌদি আরব ছিল এই সমঝোতার ঘোর বিরোধী। ফলে শীতল হতে শুরু করে সৌদি-মার্কিন সম্পর্ক। পাশাপাশি স্বয়ং ইসারাইলও এই সমঝোতার কট্টর বিরোধী। কারণ দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পে বাগড়া দিয়ে এসেছে জায়নবাদ সমর্থিত ফিলিস্তিন দখলকারীরা।

মধ্য এশিয়ার অন্য মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে মার্কিন সম্পর্কের চিড় ধরে ‘আরব বসন্তে’র সময়ে। এসব দেশের শাসকরা হোঁচট খেয়েছিল যখন আমেরিকার দীর্ঘদিনের সহযোগী দেশ মিশরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক ক্ষমতাচ্যুত হয়। এ ঘটনায় আমেরিকা যখন নিস্পৃহ নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করে, তখন তারা এ নিয়ে শঙ্কিত ছিল যে, তাদের বিপদ হলেও আমেরিকা একই আচরণ করবে কি না। ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক সমঝোতা সেই শঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

এ দিকে কুর্দিদের সঙ্গে আবার তুরস্কের সম্পর্ক সাপ-নেউলের। তুরস্কের এক অংশে স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘ দিন ধরে লড়ছে কুর্দিরা। সেই কুর্দিদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়তে তুরস্কের আপত্তি ছিল। ফলে প্রেসিডেন্ট আসাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তুরস্কের কাছ থেকেও সে ভাবে সহযোগিতা পায়নি আমেরিকা। আর সামরিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পরে, আমেরিকার আশ্রয়ে থাকা তুর্কি নেতা গুলেনকে ফিরে পেতে আমেরিকার উপরে চাপ বাড়ান প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান। এতে রাজি না হওয়ায় দু’দেশের পরস্পরের উপর আস্থায় ভাঙন ধরে।

তার উপরে প্রবলভাবে জুড়ে যায় রাশিয়া ফ্যাক্টর। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে রাশিয়ার অংশগ্রহণ পুরো ছকটিকেই বদলে দেয়। ওবামার কৌশলকে কফিনবন্দি করে যেন শেষ পেরেকটিও পুঁতে দেওয়া হলো। কয়েক দিন আগে রাশিয়া, ইরান ও লেবানন (হিজবুল্লাহ)-এর সাহায্যে সিরিয়ার আলেপ্পো শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে আসাদের সেনারা। অন্যদিকে যে তুরস্ক এতদিন আসাদের বিরোধিতা করে আমেরিকা, ইসরাইল ও সৌদির সাথে জোটবদ্ধ থেকেছে, সেই তুরস্কও মস্কোর বৈঠকে অংশ নিয়ে ব্যক্ত করেছে সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট আসাদের অবস্থানকে মেনে নেওয়ার অভিপ্রায়। শয়তানের প্রতিশ্রুতি যে প্রতারনা ছাড়া কিছু নয় সেটা দেরিতে হলেও তুরস্ক উপলব্ধি করতে শুরু করেছে।

এখন অঘোষিত জোট ইরান, ইরাক, রাশিয়া, সিরিয়া, তুরস্ক এবং লেবাননও (হিজবুল্লাহ)। তাদের সাথে রয়েছে বিশ্ব-জনমতের একটি বিরাট অংশ; যারা পাশ্চাত্য নির্ভর গনমাধ্যমগুলোর অপপ্রচারের স্বীকার নন। অন্য দিকে এ জোটের বাইরে ফিলিপাইন, উত্তর কোরিয়া, চীন, কিউবা ও বলিভিয়াসহ অন্যান্য মার্কিন বিরোধী দেশের সংখ্যা ও সক্ষমতা নিতান্ত কম নয়। এসব দেশের অধিকাংশই সক্ষমতা অথবা পরিস্থতি অনুকূলে না থাকায় কেবল ‘মামার জয়’ ‘মামার জয়’ করে যাচ্ছে এবং মার্কিনী একচোখা নীতি সহ্য করছে। সার্বিক বিশ্লেষণে বলা যায় বিশ্বব্যবস্থা এখন আর এক-কেন্দ্রীক ও ভারসাম্যহীন অবস্থায় নেই৷ সক্ষমতা এখন বহুমূখী এবং এর সূফলও দৃশ্যমান।

সব মিলিয়ে বছর শেষে দেখা যাচ্ছে, একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা তার মিত্র-রাষ্ট্রগুলোর কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে ও পুরনো বন্ধুদের হারাচ্ছে; অন্য দিকে নতুন বন্ধুও জোটেনি। কথায় বলে... ‘আমও গেল, ছালাও গেল’দশা! বা অতি চালাকের গলায় দড়ি!

(মোঃ কামরুল হাসান)


আপনার মন্তব্য প্রেরণ করুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ফিল্ডসমূহ * এর মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে

*

پیام رهبر انقلاب به مسلمانان جهان به مناسبت حج 1441 / 2020
conference-abu-talib
We are All Zakzaky