'খলিফা' ও মার্কিন সন্ত্রাস-সন্ত্রাস খেলার রহস্য

  • News Code : 632808
  • Source : IRIB
Brief

'অন্যের ক্ষতি করার জন্য গর্ত খুঁড়লে সেই গর্তে নিজেকেই পড়তে হয়'-এ জাতীয় প্রবাদ বাক্য থেকে কখনও শিক্ষা নেয়নি মার্কিন ও পশ্চিমা কিছু সরকার এবং তাদের তাবেদার বা সেবাদাস সরকারগুলো।

আবনা : 'অন্যের ক্ষতি করার জন্য গর্ত খুঁড়লে সেই গর্তে নিজেকেই পড়তে হয়'-এ জাতীয় প্রবাদ বাক্য থেকে কখনও শিক্ষা নেয়নি মার্কিন ও পশ্চিমা কিছু সরকার এবং তাদের তাবেদার বা সেবাদাস সরকারগুলো।
আসলে ইতিহাসেরও একটি বড় শিক্ষা হল, এর শিক্ষাগুলো থেকে খুব কম শাসকরাই শিক্ষা নেন, ফলে পুনরাবৃত্তি ঘটে ইতিহাসের। সম্প্রতি 'আইএসআইএল' নামক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর এক সন্ত্রাসীর হাতে একজন মার্কিন সাংবাদিককে গলা কেটে হত্যা করার ঘটনা আমাদেরকে এইসব প্রবাদ বাক্য ও শিক্ষাগুলোর কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
মার্কিন সরকার জাদুর চেরাগ ঘষে যে দৈত্যের জন্ম দিয়েছিল কিংবা তার গোপন বাক্সে বন্দী থাকা যে দানবকে মুক্ত করে দিয়েছিল অন্যের ক্ষতি করার জন্য তা এখন তার নিজের জন্যই বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এ জন্যই এখন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হ্যাগেল বলেছেন, আমেরিকার জন্য ৯/১১-এর চেয়েও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসআইএল। মার্কিন সেনাপ্রধান জেনারেল মার্টিন ডেম্পসে’র সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেছেন তিনি।
হ্যাগেল আরো বলেন, আমেরিকা এ পর্যন্ত যে সব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মোকাবেলা করেছে তাদের তুলনায় আইএসআইএল অনেক বেশি আধুনিক এবং অনেক বেশি অর্থের যোগান তাদের রয়েছে ।
তিনি বলেছেন, একে নিছক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বলা যাবে না বরং তার চেয়েও তারা বেশি কিছু। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, আইএসআইএল-এর কথিত আদর্শ রয়েছে এবং একই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অত্যাধুনিক কৌশল ও সামরিক শক্তি। সব মিলিয়ে এটি আমেরিকার জন্য নতুন এক মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠেছে।
এদিকে, জেনারেল ডেম্পসে বলেন, সিরিয়ায় এ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হামলা চালানো ছাড়া আইএসআইএল সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। এ সংকট আমেরিকা ও তার মিত্রদেরকে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিকভাবে মোকাবেলা করতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলি দখলদারিত্বের বিরোধীদের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক শক্তি হিসেবে বিবেচিত সিরিয়ার আসাদ সরকারকে উৎখাতের জন্য যেসব সন্ত্রাসী দলকে সব ধরনের সহায়তা দিয়ে এসেছে মার্কিন সরকার ও তার পশ্চিমা মিত্র এবং স্থানীয় সেবাদাস সরকার তার মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ে উঠে এসেছে আইএসআইএল। এক সময় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ঠিক যেভাবে আল-কায়দা ও তালেবানদের সৃষ্টি করে তাদের মদদ দিয়েছে ঠিক সেভাবেই তারা সর্বাত্মক সহায়তা দিয়েছে এই তাকফিরি-ওয়াহাবি গোষ্ঠীকে।
এরপর ৯/১১'র হামলার অজুহাত দেখিয়ে আল-কায়দা ও তালেবানের সন্ত্রাস দমনের নামে আফগানিস্তান ও ইরাকে আগ্রাসন চালিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল মার্কিন সরকার। কিন্তু তালেবানদের দমন করা মার্কিন সরকারের পক্ষে কখনও সম্ভব হয়নি। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়া তালেবানকে দমনের নামে এখনও প্রায়ই ড্রোন হামলা চালাচ্ছে আমেরিকা। অন্যদিকে আলকায়দার নেতা লাদেনকে হত্যার পর সেই আলকায়দার প্রেতাত্মাই আবার ভর করেছে আইএসআইএল ও আননুসরা নামের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর ব্যানারে।
মার্কিন সরকারের এইসব সন্ত্রাস-সন্ত্রাস খেলার উদ্দেশ্য এখন সবার কাছেই স্পষ্ট। কাল সাপ সৃষ্টিও করছে আমেরিকা এবং তা দমনের নামে দেশে দেশে হস্তক্ষেপও করছে আমেরিকা। অবশ্য আমেরিকার 'নতুন আল-কায়দা' প্রকল্পের মূল সহযোগী হল, ইসরাইল, ব্রিটেন এবং তাদের সেবাদাস কিছু আরব সরকার। সিরিয়া ও ইরাকে সন্ত্রাসবাদের প্রজনন কেন্দ্র জোরদারে ভূমিকা রেখেছে তুর্কি সরকারও।
সম্প্রতি সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা স্নোডেনের ফাঁস করা দলিল-প্রমাণে দেখা গেছে, ব্রিটেন, আমেরিকা ও ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের যৌথ প্রকল্প হিসেবে ইসরাইল বিরোধী শক্তিগুলোকে দুর্বল করার জন্যই গড়ে তোলা হয়েছে ধর্মান্ধ গোষ্ঠী আইএইআইএল। এই গোষ্ঠীর প্রধান কথিত খলিফা আবুবকরকে ধর্মীয়-বক্তৃতার কৌশলসহ নানা বিষয়ে এক বছর ধরে প্রশিক্ষণ দিয়েছে মোসাদ। আবুবকরের বাবা মাও ইহুদি এবং কথিত এই খলিফার আসল ইহুদি নামটিও হল 'শামউন ইয়লুত'। স্নোডেনের ফাঁস করা তথ্যে আরো জানা গেছে, ‘বোলতা বা ভিমরুলের বাসা’ শীর্ষক একটি পরিকল্পনার আওতায় দখলদার ইহুদিবাদী ইসরাইলকে রক্ষার জন্যই ইসলামী কিছু শ্লোগানের মোড়কে চরমপন্থী দল আইএসআইএল গড়ে তোলা হয়েছে যাতে সারা বিশ্ব থেকে সন্ত্রাসীদেরকে একটি বিশেষ অঞ্চলে সক্রিয় হতে আকৃষ্ট করা যায়। এইসব শ্লোগানের ভিত্তিতে এই গ্রুপ তার চিন্তার বিরোধী সব কিছুকে প্রত্যাখ্যান করে অথবা অন্য কোনো চিন্তাধারা-ভিত্তিক মতবাদকে প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে করে। স্নোডেন আরো জানান, এই গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যে ইসরাইলকে রক্ষার একমাত্র উপায় হল তার সীমান্ত-সংলগ্ন দেশগুলোতে এমন একটি গ্রুপ বা দল সৃষ্টি করা যাতে দলটি ইসরাইলের অস্তিত্বের বৈধতা অস্বীকারকারী মুসলিম দেশগুলোর বিরুদ্ধেই তার অস্ত্র প্রয়োগ করে।
জিহাদের নামে সারা বিশ্বের সরলমনা যুবকদের অপব্যবহার করে ইসরাইল-বিরোধী স্বাধীনচেতা দেশগুলোর ভেতরে সন্ত্রাসী তৎপরতা ছড়িয়ে দেয়ার পরই গাজায় ইহুদিবাদী ইসরাইলের চলমান হামলার ঘটনাও বেশ লক্ষণীয় বিষয়। আননুসরা এবং আইএসআইএল কখনও ইসরাইলের বিরুদ্ধে একটি বিবৃতিও দেয়নি ইসরাইলের দিকে গুলি ছোঁড়া তো দূরের কথা। আইএসআইএল তার নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ইসরাইল বিরোধী মিছিলও নিষিদ্ধ করেছে।
এক সময় ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে দুর্বল করার জন্য মার্কিন সরকার ইরাকের সাদ্দাম সরকারকে দিয়ে ইসলামী এই দেশটির ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল ভয়াবহ যুদ্ধ। সে সময় প্রতিক্রিয়াশীল আরব রাজা বাদশাহরাও তাদের অর্থের ও অস্ত্রের ভাণ্ডার খুলে দিয়েছিল ইরানের বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট ও এক সময়কার নাস্তিক সাদ্দামকে। কিন্তু সেই সাদ্দাম কুয়েতের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আবার সাদ্দামকে রাসায়নিক ও এমনকি পরমাণু প্রযুক্তি দেয়ার পর ইঙ্গ-মার্কিন সরকারই সেইসব গণ-বিধ্বংসী অস্ত্র ধ্বংসের অজুহাতে সাদ্দামকে নির্মূল করার পদক্ষেপ নেয়।
এভাবে দেখা যায়, মার্কিন সরকারই কখনও সাদ্দাম, কখনও লাগেন ও কখনও 'আবুবকরদের' হিরো বানায় এবং তাদেরকে বড় মাপের ইসলামী নেতা বলে প্রচারণা চালানোর সুযোগ করে দেয়। আর তাদেরকে দিয়ে কাজ হাসিল করা বা স্বার্থ উদ্ধারের পর ছুঁড়ে ফেলে দেয় পরিত্যক্ত আবর্জনার মতই। এরপর মহা-শয়তান মার্কিন সরকারই তাদেরকে শয়তান বা দুর্বৃত্ত বলে উল্লেখ করে তাদের পতন ঘটায়।
ইরান, সিরিয়া ও হিজবুল্লাহ বার বার সিরিয়ায় সক্রিয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা দেয়ার পরিণতি সম্পর্কে পশ্চিমা শক্তিগুলো এবং তাদের স্থানীয় মিত্রদের হুঁশিয়ারি দিয়ে এসেছে। সারা বিশ্বের কথিত সরলমনা জিহাদিদের দিয়ে সিরিয়া ও ইরাকে সন্ত্রাসবাদের প্রজনন-কেন্দ্র খোলার কয়েক বছর পর এখন তারা পাশ্চাত্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে ওবামা ও ক্যামেরনদের এখন নাকি বোধোদয় ঘটছে! অথচ এখন থেকে কয়েক মাস আগেও পশ্চিমা এই নেতারা এদেরকেই সিরিয়ার আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইরত গণতান্ত্রিক শক্তি বলে মনে করতো এবং তাদের হাতে সাধারণ মানুষের গণহত্যা বা গলাকাটার দৃশ্যকে দেখেও না দেখার ভান করতো ! ইরাকের মুসেলে সন্ত্রাসীদের বিজয়কেও তারা শিয়া-সুন্নি-কুর্দি সংকট বলেই দেখাতে চেয়েছে এবং এই সংকটকে ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে চেয়েছে।
আসলে আলকায়দার নতুন সংস্করণ আইএসআইএল-এর সঙ্গে মার্কিন সরকার ও তার মিত্রদের হানিমুন পিরিয়ড বা মধুচন্দ্রিমার দিনগুলো মনে হয় শেষ হয়ে এসেছে। পাশ্চাত্য এখন আইএসআইএল-এর নৃশংসতার ঘটনাগুলো প্রচার করে এটাই দেখাতে চাইবে যে জিহাদ ও ইসলাম হল সন্ত্রাসেরই সমার্থক। তাই লন্ডনে হিজাবধারী মুসলিম নারীকে হত্যা কিংবা গাজাসহ বিশ্বের বহু অঞ্চলে মুসলমানদের ওপর অমুসলিমদের গণহত্যার ঘটনাগুলোও সহজেই বৈধতা পেয়ে যাবে। #


আপনার মন্তব্য প্রেরণ করুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ফিল্ডসমূহ * এর মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে

*

پیام رهبر انقلاب به مسلمانان جهان به مناسبت حج 1441 / 2020
conference-abu-talib
We are All Zakzaky