হযরত ফাতেমা (সা.)-এর জন্মবার্ষিকী আজ

  • News Code : 682425
  • Source : IRIB
Brief

হযরত ফাতেমা (সা.) নিজ জীবনে পবিত্র কোরআনের শিক্ষা বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাঁর মাত্র প্রায় ১৮ বছরের জীবন এ ধরনের অনেক বরকতময় ঘটনায় ভরপুর।

২০ জমাদিউসসানি একটি ঐতিহাসিক দিন। রাসূলে খোদার নব্যুয়ত লাভের পাঁচ বছর পর আজকের এই দিনে উম্মুল মোমেনীন হয়রত খাদিজার গৃহ আলোকিত করে পৃথিবীতে আগমন করেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নারী হযরত ফাতেমাতুয যাহরা (সা.)। হযরত ফাতেমা ছিলেন মানুষের ব্যক্তি কিংবা সমাজ জীবন সর্বক্ষেত্রেই অনুকরণীয় আদর্শ ও দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ মাতা, একজন আদর্শ স্ত্রী বা গৃহিনী এবং একজন আদর্শ সমাজ-সেবিকা।
হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.) ছিলেন এমন এক মহামানবী যার তুলনা কেবল তিনি নিজেই। অতুলনীয় এই নারী কেবল নারী জাতিরই শ্রেষ্ঠ আদর্শ নন, একইসঙ্গে তিনি গোটা মানব জাতিরই শীর্ষস্থানীয় আদর্শ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিশ্বের অনেকেই এই মহীয়সী নারীর পবিত্র জীবন ও আদর্শ সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না। আর এজন্যই ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতা মরহুম ইমাম খোমেনী (রহঃ) হযরত ফাতিমার জন্মদিনকে ইরানে মা ও নারী দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন।
হযরত ফাতেমা (সা) এর মর্যাদা ছিল অনেক উর্ধ্বে। স্বয়ং নবীজী (সা.) ফাতেমাকে সম্মান করতেন। জন্মের পর থেকেই নবীজী তাঁর এই কন্যার সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করে বিশ্বে নারীর মূল্যবোধ এবং তাঁদের অবস্থান যে কতোটা মর্যাদাসম্পন্ন তা বাস্তবে দেখিয়ে গেছেন। মহানবী (সা.) বলেছেন, "ফাতেমা আমার দেহের অংশ, যা কিছু তাকে সন্তুষ্ট করে তা আমাকে সন্তুষ্ট করে এবং যা কিছু আমাকে সন্তুষ্ট করে তা আল্লাহকেও সন্তুষ্ট করে, আর যা কিছু ফাতেমাকে কষ্ট দেয়, তা আমাকে কষ্ট দেয়, আর যা আমাকে কষ্ট দেয়, তা আল্লাহকেও কষ্ট দেয়।" নবীজী আরো বলেছেন, "ফাতেমা আমার দেহের অঙ্গ, চোখের জ্যোতি, অন্তরের ফল এবং আমার রূহস্বরূপ। সে হচ্ছে মানুষরূপী স্বর্গীয় হুর।" হযরত ফাতেমা (সা.) বেহেশতে সর্ব প্রথম প্রবেশ করবেন বলেও বিশ্বনবী (সা.) উল্লেখ করেছেন।
সত্যি বলতে কী, হযরত ফাতেমা (সা.) নারীদের ব্যাপারে জাহেলি যুগের চিন্তাভাবনাগুলোকে পাল্টে দিয়ে সমাজে নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক অবস্থান, সমাজে তাদের প্রশিক্ষণমূলক ভূমিকা, তাদের আত্মিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি তুলে ধরেছেন। হযরত ফাতেমা (সা.) এর জীবন কেটেছে এমন এক গৃহে যেটি ছিল মোনাফেকি, শিরক এবং কুফরির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রাণকেন্দ্র। তাঁর পিতা হযরত মুহাম্মদ এবং স্বামী-হযরত আলী (আ.)-কুফরির বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও জিহাদে বীরত্বের সাথে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং ফাতেমা (সা) সবসময় তাঁদের সহযোগী ছিলেন। পিতা এবং স্বামীর সঙ্গে জেহাদে অংশ নেওয়া থেকেই তাঁর সামাজিক ভূমিকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। ছোট্টবেলা থেকেই তৎকালীন বিচিত্র প্রতিকূল অবস্থা তিনি স্বচক্ষে দেখেছেন এবং কী করে সেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেদের উপস্থিতি বজায় রাখা যায় সেসব জীবন বাস্তবতার আলোকে শিখেছেন।
হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.) ছিলেন গোটা মানব জাতির জন্য অসাধারণ ত্যাগ, বিশ্বস্ততা,সততা,দানশীলতা, ধৈর্য, পবিত্রতা, আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টিসহ অনেক স্বর্গীয় গুণের আদর্শ। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) তাঁকে সকল যুগের নারীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে উল্লেখ করেছেন।
আমরা আগেই বলেছি, হযরত ফাতেমা ছিলেন একজন আদর্শ জননী, একজন আদর্শ স্ত্রী এবং একজন আদর্শ কন্যা। তিনি জন্ম নিয়েছিলেন এমন এক যুগে যখন নারীর জন্মকে আরবরা কলঙ্ক বলে মনে করতো। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও নারীরা ছিল অবহেলিত ও উপেক্ষিত এবং এমনকি মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত। বিশ্বনবী (সা.)'র কোনো পুত্র সন্তান না থাকায় মক্কার মুশরিক আরবরা তাঁকে নির্বংশ বা আবতার বলে উপহাস করত। কিন্তু মহান আল্লাহ এসব উপহাসের জবাব দিয়েছেন সূরা কাওসারে। এ সূরায় হযরত ফাতেমা (সা.)কে কাওসার বা প্রাচুর্য্য বলে উল্লেখ করে মহান আল্লাহ কাফেররাই নির্বংশ হবে বলে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
নারীরা যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে সে দৃষ্টান্ত দেখিয়ে গেছেন হযরত ফাতেমা (সা.)। তিনি ইমামত বা বেলায়েতের দায়িত্বপ্রাপ্ত না হলেও হযরত আলী (আঃ) ছাড়া আহলে বাইতের অন্য ১১ জন সদস্য বা ইমামের জন্য তিনি ছিলেন আদর্শিক পূর্বসূরী। বিশ্বনবী (সা.)'র ওফাতের পরও তিনি মুসলমানদেরকে পথ-নির্দেশনা দান অব্যাহত রেখেছিলেন। পবিত্র কোরআন ও রাসূল (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতকে অনুসরণ করার জন্য বিশ্বনবীর তাগিদ সত্ত্বেও পিতার ওফাতের পর সৃষ্ট জটিল ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি দেখতে পেয়ে তিনি পিতার উম্মতকে পথ নির্দেশনা দেয়ার জন্য বলেছিলেন, তোমরা কেন বিপথে যাচ্ছ? অথচ তোমাদের মধ্যে কোরআন রয়েছে। কোরআনের বক্তব্য ও বিধি-বিধান সুস্পষ্ট। এ মহাগ্রন্থের দেখানো পথ-নির্দেশনাগুলো স্পষ্ট এবং সতর্কবাণীগুলোও স্পষ্ট।
হযরত ফাতেমা (সা.) নিজ জীবনে পবিত্র কোরআনের শিক্ষা বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাঁর মাত্র প্রায় ১৮ বছরের জীবন এ ধরনের অনেক বরকতময় ঘটনায় ভরপুর। যেমন, আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী (আঃ)'র সঙ্গে তাঁর বিয়ের অনুষ্ঠানের প্রাক্কালে এক দরিদ্র মহিলা তাঁর কাছে পোশাক চাইলে তিনি তার বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য কেনা নতুন জামাটি উপহার দেন। তিনি ইচ্ছে করলে তার পুরনো জামাও দিতে পারতেন। কিন্তু নবীনন্দিনী এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতের কথা স্মরণ করেন, যাতে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোনো কিছু দান করার ক্ষেত্রে ও তা কবুল হবার জন্য সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটি দান করার কথা বলা হয়েছে। অনেক সময় দেখা গেছে ঘরে খাদ্যের অভাব থাকা সত্ত্বেও স্বামী যাতে বিব্রত না হন বা গুরুত্বপূর্ণ অন্য কাজে বাধাগ্রস্ত না হন সে জন্য তিনি সে অভাবের কথা তাঁকে জানাননি।
ফাতেমা (সা) এমন এক ঘরে ছিলেন যে ঘরের নিকটতম প্রতিবেশী ছিল দারিদ্র্য। তারপরেও দান-খয়রাতের ক্ষেত্রে ঐ ঘরটি কখনোই পিছিয়ে ছিল না। ইবনে শাহর অশুব বলেছেনঃ একদিন আলী (আ.) ফাতেমা (সা.) কে বলেছেন, 'ঘরে খাবার-দাবার কিছু আছে'? ফাতেমা জবাব দিলেনঃ না,গত দু'দিন ধরে বাচ্চা-কাচ্চারাসহ না খেয়ে আছি। আলী বললেনঃ আমাকে কেন বলনি? কিছু একটা ব্যবস্থা করতাম!ফাতেমা বললেনঃ লজ্জা পাচ্ছিলাম এই ভেবে যে, এমন কিছু আমি চাই যা তুমি ব্যবস্থা করতে পারবে না। আলী (আ.) ঘর থেকে বেরিয়ে এসে এক দিনার ঋণ করলেন স্ত্রী-পুত্রদের জন্যে খাবারের ব্যবস্থা করতে। পথেই একজনকে দেখলেন ভীষণ মন খারাপ। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন ক্ষুধার্ত বাচ্চাদের কান্নাকাটি সহ্য হচ্ছে না,তাই মন খারাপ। আলী (আ) যেই এক দিনার ঋণ করেছিলেন তা লোকটিকে দিয়ে দিলেন।
হযরত আলী যেমন নিজ স্ত্রী-পুত্রদের চেয়ে অভাবীদের অভাব মোচনের দিকে গুরুত্ব দিতেন তেমনি হযরত ফাতিমাও নিজ পরিবারের চেয়েও প্রতিবেশীদের বেশী গুরুত্ব দিতেন। ইমাম হাসান মুজতাবা (আঃ) এ সম্পর্কে বলেছেন,এক রাতে দেখলাম মা এবাদতে মগ্ন। একটানা রূকু ও আর সেজদায় থাকতে থাকতে ভোরের আলো ফুটে উঠলো। আমি শুনতে পেলাম তিনি প্রতিবেশীদের জন্য অনেক দোয়া করছেন,কিন্তু নিজের জন্য কোনো দোয়াই করলেন না। আমি প্রশ্ন করলাম, "মা, মোনাজাতের সময় তুমি কেবল পাড়া-প্রতিবেশীর মঙ্গল কামনা করো। তোমার নিজের জন্য বা আমাদের কারও জন্য তো দোয়া কর না! এর কারণ কি? "
স্নেহময়ী মা এবার ছেলেকে আদর করে বুকে টেনে নিয়ে বললেন, বাছা আমার! আমি কেন ও রকম করি? তুমি জেনে রেখো, প্রতিবেশীর হক আগে। প্রতিবেশীর মঙ্গল কামনা করলে, তাদের খোঁজখবর নিলে আল্লাহ তায়ালা খুব খুশী হন। তাই আমি তাদের জন্য দোয়া করি। তবে তোমাদের জন্যও দোয়া করি। তবে প্রতিবেশীর অধিকার আগে,এটা মনে রাখবে-কেমন ?
হযরত ফাতেমার যাহরার জীবনজুড়ে ছিলো সত্যের পথে দৃঢ়তা ও সংগ্রাম। এজন্য ওবীজীর ওফাতের পর ফাতেমা (সা.) ইসলামের শিক্ষাগুলো রক্ষা করা এবং ইসলামী সমাজের বিচ্যুতির বিপদ সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক করেছিলেন। এই সতর্ক করার পেছনে তাঁর কোনো খ্যাতি, মর্যাদা আর সম্পদের লোভ ছিল না, বরং ইসলামকে বিদয়াত আর বিচ্যুতি থেকে বিশেষ করে কোরআনের আয়াত বা ঐশী বিধি-বিধানগুলোকে বিকৃতি থেকে রক্ষা করাই ছিল একমাত্র লক্ষ্য। দৈহিক কষ্ট, মানসিক চাপ ইত্যাদি সত্ত্বেও তিনি ধাপে ধাপে তাঁর লক্ষ্য বাস্তবায়নে সচেষ্ট হয়েছিলেন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি বর্তমান বিশ্বের নারীদের জন্যে আদর্শস্থানীয় তাহলো সামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তো বটেই এমনকি মূল্যবোধ রক্ষার্থে সংগ্রাম করার ক্ষেত্রেও তৎপর ভূমিকা রাখা নারীর দায়িত্ব।
আজও যদি আমরা হযরত ফাতেমার জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নারী মুক্তির জন্য চেষ্টা করি তাহলে অনেকাংশে সফলতা দেখতে পাব। আজকাল যারা পশ্চিমা নারীদের অনুসরণকেই নারীর মুক্তি ও প্রগতির পথ বলে মনে করছেন তারাও যদি নিজ জীবনে হযরত ফাতেমা (সা.)'র আদর্শ অনুসরণের চেষ্টা করতেন এবং তার সাদা-সিধে ও অনাড়ম্বর জীবন থেকে শিক্ষা নিতেন তাহলে আজকের যুগে তালাক প্রবণতা বৃদ্ধিসহ যেসব জটিল পারিবারিক সমস্যা দেখা যায় সেগুলোর সমাধান সহজ হয়ে যেত।
অবশ্য হযরত ফাতেমার আদর্শকে যে একেবারে অনুসরণ করা হচ্ছে না তা কিন্তু নয়, উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত সর্বত্র আজ মুসলিম নারীরা নিজেদের আত্মবিশ্বাস ও ইসলামী পরিচয়ের সন্ধানে পুনরায় জেগে উঠেছে। ইরানে ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর নারীদের মর্যাদা, অবস্থান ও অধিকারের ব্যাপারে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। স্ময়ং ইমাম খোমেনী (রহ.) এ বিষয়টির ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছেন। তার ফল এখন ইরানের সর্বত্র বিরাজমান। ইরানের এখন শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা, প্রশিক্ষণ, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীদের ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে। এমনকি পার্লামেন্টেও নারীদের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে।
ইরানসহ বিশ্ব মুসলিম নারীরা হযরত ফাতেমা (সা) এর জীবনাদর্শ অনুযায়ী সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আগের তুলনায় আরো বেশি বেশি নিজেদের অস্তিত্বের স্বাক্ষর রাখবে-এই আশাবাদ ব্যক্ত করে এ আলোচনার ইতি টানছি।#


আপনার মন্তব্য প্রেরণ করুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ফিল্ডসমূহ * এর মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে

*

ইসলামের মহান সেনাপতি জে. কাসেম সোলাইমানি ও আবু মাহদি আল-মুহানদিস
We are All Zakzaky
conference-abu-talib
No to deal of the century