আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): তেহরানের চিইজার এলাকায় অবস্থিত হযরত কায়েম (আ.ফা.) মাদ্রাসার মসজিদে “সাহিফা সাজ্জাদিয়ার অষ্টম দোয়ার ব্যাখ্যায় মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও তত্ত্বাবধায়ক আয়াতুল্লাহ হাশেমি ইলিয়া ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর দোয়ায় বর্ণিত:
وَ نَعُوذُ بِکَ… مِنْ مَعِیشَهٍ فِی شِدَّهٍ
“হে আল্লাহ, আমরা আপনার নিকট এমন জীবন থেকে আশ্রয় চাই যা কঠোরতা ও সংকটে পূর্ণ” এই বাক্যের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন।
তিনি বক্তব্যের শুরুতে বলেন, ধর্মীয় পরিভাষায় ‘মাঈশাত’ বলতে মানুষের পার্থিব জীবন ও জীবনধারণের উপকরণ-যেমন খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান-সবকিছুকে বোঝায়।
সুতরাং ইমাম সাজ্জাদ (আ.) যখন কঠিন জীবনের হাত থেকে আল্লাহর আশ্রয় চান, তখন তা কেবল দারিদ্র্য বা বাহ্যিক অভাব নয়; বরং এমন এক জীবনব্যবস্থার কথা বোঝানো হয়েছে যেখানে মানুষ নিজের নানাবিধ দায়িত্ব ও চাহিদা সামলাতে অক্ষম হয়ে পড়ে এবং সার্বক্ষণিক মানসিক চাপে থাকে।
আয়াতুল্লাহ হাশেমি ইলিয়া বর্তমান যুগের জটিল জীবনব্যবস্থার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, আজকের জীবনের দিকে তাকালে ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর বক্তব্যের গভীরতা উপলব্ধি করা যায়।
আধুনিক মানুষ বহু ভোগ্যসুবিধা থাকা সত্ত্বেও উদ্বেগ, অস্থিরতা ও সংকটে আক্রান্ত। পরিবার প্রত্যাশা করে, সমাজ নানা দাবি তোলে, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদেরও চাহিদা থাকে। একদিকে নফস মানুষকে ভিন্ন পথে টানে, অন্যদিকে বিবেক ও দ্বীন ভিন্ন নির্দেশ দেয়।
এসব বিপরীত বিষয় একত্রে সামলাতে বিশাল আত্মিক শক্তি প্রয়োজন, আর এই পথেই অনেক সময় বড় বড় সাধক ও আলেমরাও হোঁচট খেয়ে থাকেন। এ কারণেই ইমাম সাজ্জাদ (আ.) এমন কঠিন জীবন থেকে আল্লাহর আশ্রয় কামনা করেছেন।
তিনি অতীত ও বর্তমানের জীবনধারার তুলনা করে বলেন, পূর্ববর্তী যুগের মানুষ বাহ্যিকভাবে দরিদ্র হলেও তুলনামূলকভাবে অধিক প্রশান্তিতে ছিলেন; কারণ তাঁদের জীবনে সন্তুষ্টি, তাওয়াক্কুল এবং তাকদিরে সন্তুষ্টি সুস্পষ্ট ছিল। অথচ আজ প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও মানুষের জীবন দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতায় আচ্ছন্ন—যা ‘কঠিন জীবনের’ বাস্তব উদাহরণ।
এই নৈতিক শিক্ষাগুরু জোর দিয়ে বলেন, জীবনের সব ক্ষেত্রে মানুষের প্রকৃত আশ্রয় একমাত্র আল্লাহ তাআলাই। মানুষ তখনই আশ্রয় খোঁজে, যখন সে নিজে বিপদ মোকাবিলায় অক্ষম হয়।
পার্থিব বিষয়ে মানুষ কোনো স্থান বা উপকরণে আশ্রয় নিতে পারে, কিন্তু বাস্তবে আল্লাহ ছাড়া সব আশ্রয়ই আল্লাহর আশ্রয়ের মুখাপেক্ষী। তাই ইমাম সাজ্জাদ (আ.) সব দুঃখ-কষ্ট, নফসের চাপ, শয়তানের কুমন্ত্রণা ও দুনিয়ার বিপদের বিরুদ্ধে একমাত্র আল্লাহর কাছেই আশ্রয় চেয়েছেন—এটাই পরিপূর্ণ তাওহিদি দৃষ্টিভঙ্গি।
আয়াতুল্লাহ হাশেমি ইলিয়া আল্লাহর বিধানে ‘ইবতিলা’ (পরীক্ষা) নীতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, দুনিয়া হলো বিপদ ও পরীক্ষার আবাস। আল্লাহ কখনোই বান্দার প্রতি জুলুম করেন না; তাঁর সব সিদ্ধান্ত প্রজ্ঞা ও কল্যাণের ভিত্তিতে নির্ধারিত। তবে তিনি মানুষকে বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করেন, যাতে প্রকৃত ঈমানদার ও কেবল দাবিদারদের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয়।
এ প্রসঙ্গে তিনি কুরআনের আয়াত উদ্ধৃত করেন:
أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ یُتْرَکُوا أَنْ یَقُولُوا آمَنَّا وَ هُمْ لَا یُفْتَنُونَ
“মানুষ কি মনে করে যে, তারা শুধু ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই পরীক্ষা ছাড়া ছেড়ে দেওয়া হবে?”
(সূরা আনকাবুত: ২)
তিনি আরও বলেন, এসব পরীক্ষার মধ্য দিয়েই মানুষের অন্তরের বাস্তবতা প্রকাশ পায়। কেউ স্বচ্ছল অবস্থায় ধর্মপরায়ণ দেখালেও সামান্য পরিবর্তনে ভেঙে পড়ে। কেউ সম্পদ পেলে অহংকারী হয়ে ওঠে, যেমন কুরআনে বলা হয়েছে:
إِنَّ الْإِنْسَانَ لَیَطْغَی أَنْ رَآهُ اسْتَغْنَی
“নিশ্চয়ই মানুষ সীমালঙ্ঘন করে, যখন সে নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে।”
আবার কেউ দারিদ্র্য ও কষ্টে পড়লে আল্লাহ, নবী ও দ্বীনের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। এমনকি অনেকেই এসব চাপে নামাজ ও ইবাদত ত্যাগ করে। এসবই প্রমাণ করে যে তাদের ঈমানের ভিত ছিল দুর্বল।
তিনি বলেন, আজকের বিশ্বপরিস্থিতি ও মানবসমাজ শেষ যুগের ফিতনার স্পষ্ট নিদর্শন। এসব ফিতনা দিন দিন আরও জটিল ও কঠিন হয়ে উঠছে। রেওয়ায়েতে এসেছে—মানুষ সকালে মুমিন থাকে, অথচ সন্ধ্যায় কাফির হয়ে যায়। এই পরীক্ষাগুলো মুনাফিকদের আলাদা করে দেয়। যাদের ঈমান হৃদয়ে প্রোথিত নয়, তারা ঝরে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিনরাই অবশিষ্ট থাকে—যারা না সম্পদে অহংকারী হয়, না কষ্টে দ্বীন ত্যাগ করে।
আয়াতুল্লাহ হাশেমি ইলিয়া বলেন, শেষ যুগের ফিতনায় অনেকেই সামান্য পার্থিব স্বার্থের বিনিময়ে তাদের দ্বীন বিক্রি করে দেয়। কিন্তু প্রকৃত মুমিন সেই, যে অন্ধকার সময়েও দৃঢ় থাকে এবং আল্লাহর মূল্যবোধের সঙ্গে আপস করে না।
তিনি আরও বলেন, রেওয়ায়েত অনুযায়ী দুনিয়াতে মুমিনের জন্য পরিপূর্ণ আরাম অসম্ভব; প্রকৃত স্বস্তি কেবল মৃত্যুর পর এবং আল্লাহর সান্নিধ্যে অর্জিত হয়। তবে ইমাম সাদিক (আ.) দুনিয়াতে আপেক্ষিক প্রশান্তির জন্য চারটি বিষয়ের কথা উল্লেখ করেছেন— নীরবতা, নির্জনতা, সংযম (ক্ষুধা) এবং ভোররাতে জাগরণ।
এগুলো আত্মশুদ্ধি, হৃদয়ের আলোকিতকরণ এবং আল্লাহর সাক্ষাতের প্রস্তুতির মাধ্যম।
শেষে তিনি বলেন, মুমিনের উচিত দুনিয়ার কষ্টকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আত্মগঠনের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা। এসব পরীক্ষা মানুষকে পরিশুদ্ধ ও প্রস্তুত করার জন্যই আসে।
আত্মিক প্রস্তুতি ছাড়া কেউ আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হলে লজ্জা ও ক্ষতির সম্মুখীন হবে। প্রকৃত মুত্তাকি সেই, যে সংকট ও স্বাচ্ছন্দ্য, উভয় অবস্থায় একই থাকে; বিপদে ধৈর্যশীল এবং নিয়ামতে কৃতজ্ঞ, এবং উভয়কেই আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণ মনে করে গ্রহণ করে।
আয়াতুল্লাহ হাশেমি ইলিয়া ইমাম রেযা (আ.)-এর একটি উপদেশ বলেন, যখন মানুষের ওপর কষ্ট ও চাপ প্রবল হয়ে ওঠে, তখন “ইয়া রাঊফু, ইয়া রাহিম” যিকিরে অবিচল থাকলে হৃদয়ে প্রশান্তি ও আত্মায় সান্ত্বনা নেমে আসে।
কঠিন জীবনের মুখে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণই ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর দোয়ার মূল বার্তা এবং আধুনিক জীবনের বিপদ ও পথভ্রষ্টতা থেকে মানুষের মুক্তির পথ।
Your Comment