আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের ৪৭তম বার্ষিকী উদ্যাপনের সূচনা উপলক্ষে সমাজের বিভিন্ন স্তরের হাজারো মানুষ সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
তেহরানের ইমাম খোমেনী (রহ.) হুসাইনিয়ায় এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সর্বোচ্চ নেতা বলেছেন: মাঝে মাঝেই শোনা যায়, তারা যুদ্ধের কথা বলে—তারা বলে যে, আমরা বিমান নিয়ে আসব, এটা করব, ওটা করব—এগুলো নতুন কিছু নয়। অতীতেও আমেরিকা বহুবার হুমকি দিয়ে বলেছে যে ‘সব বিকল্প টেবিলে আছে’। সব বিকল্প মানে যুদ্ধের অপশনও অন্তর্ভুক্ত। এখনও এই ব্যক্তি (ট্রাম্প) একইভাবে বারবার দাবি করছে—হ্যাঁ, আমরা জাহাজ এনেছি, এটা করেছি, ওটা করেছি ইত্যাদি।
সর্বোচ্চ নেতা বলেন: এসব কথা বলে ইরানের জনগণকে ভয় দেখানো যাবে না। ইরানের জনগণ এসব কথায় প্রভাবিত হয় না। তারা ন্যায়সঙ্গত প্রতিরোধ থেকে ভয় পায় না। আমরা সূচনাকারী নই এবং কারও ওপর জুলুম করতে চাই না। কোনো দেশে হামলা করতে চাই না। কিন্তু যদি কেউ হামলা করতে চাইবে এবং ক্ষতি করতে চাইবে—তার জবাবে ইরানের জনগণ তাকে শক্ত মুষ্টাঘাত করবে।
আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী বলেন- আকৃষ্ট করার মতো নানা বিষয় রয়েছে ইরানে; যেমন তেল ও গ্যাসসহ নানা খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার এবং কৌশলগত ও ভৌগোলিক অবস্থান- আমেরিকার মতো আগ্রাসী ও লোভী শক্তির লালসার কারণ হয়েছে। তিনি বলেন, তারা পাহলভি যুগের মতো আবার ইরানের সম্পদ, তেল, রাজনীতি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনতে চায়। এটাই তাদের শত্রুতার মূল কারণ; মানবাধিকারের মতো অন্য যেসব কথা তারা বলে সেগুলো ফাঁকা বুলি মাত্র।
ইসলামী বিপ্লবের নেতা জোর দিয়ে বলেন, ইরানের জনগণ আমেরিকার লোভ-লালসার বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে, এখনও মোকাবেলা করছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা সাম্প্রতিক নৈরাজ্যের মার্কিন ও ইসরায়েলি চরিত্র সম্পর্কে বলেন, দাঙ্গাবাজরা মূলত দুই ধরণের: “নেতৃত্বদানকারী” ও “পদাতিক শক্তি”। যেসব নেতৃত্বদানকারী ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে, তারা স্বীকার করেছে যে, তারা অর্থ নিয়েছিল এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো ও তরুণদের সংগঠিত ও উসকে দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ পেয়েছিল। তবে অন্য একটি অংশ ছিল আবেগপ্রবণ তরুণ—যাদের সঙ্গে আমাদের বড় কোনো সমস্যা নেই।
আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যকে সাম্প্রতিক ষড়যন্ত্রের মার্কিন ও ইহুদিবাদী প্রকৃতির স্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, সে (ট্রাম্প) প্রকাশ্যেই সেই দাঙ্গাবাজদের—যাদের তারা ইরানের জনগণ বলে উল্লেখ করছে—বলেছিল, “এগিয়ে যাও, আমিও আসছি!” তাদের দৃষ্টিতে কয়েক হাজার দাঙ্গাবাজই ছিল ইরানের জনগণ; কিন্তু ফার্সি তারিখ ২২ দে (১২ জানুয়ারি) সারাদেশে যে লাখ লাখ মানুষ সমবেত হয়েছিল, তারা কি জনগণ নয়!।
ইসলামী বিপ্লবের নেতা বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের নতুন চিন্তা ও পথ বিশ্বমোড়লদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যাওয়াই তাদের শত্রুতা অব্যাহত রয়েছে। তাই সাম্প্রতিক এই ষড়যন্ত্র যেমন তেহরানে প্রথম ছিল না, তেমনি এটাই শেষ নয়; ভবিষ্যতেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এই শত্রুতা ততদিন চলবে, যতদিন না ইরানের জনগণ স্থিতিশীলতা, দৃঢ়তা ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শত্রুকে হতাশ করব। আর আমরা সেই পর্যায়ে পৌঁছাব।
সর্বোচ্চ নেতা বলেন, দেশের দায়িত্বশীলদের উচিৎ এই দেশের জনগণের গুরুত্ব উপলব্ধি করা। তিনি বলেন, এবারের নৈরাজ্য এমন এক সময়ে ঘটানো হয়েছিল, যখন সরকার ও কর্মকর্তারা দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও প্যাকেজ তৈরিতে ব্যস্ত ছিলেন।
আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী ফার্সি তারিখ ১২ বাহমানকে এক ব্যতিক্রমী ও ঐতিহাসিক দিন হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি ফার্সি ১৩৫৭ সালের (১৯৭৯) ১২ বাহমানে ইমাম খোমেনী (রহ.)-কে জনগণের ঐক্যবদ্ধ ও অভূতপূর্ব অভ্যর্থনার কথা স্মরণ করে বলেন, সব হুমকির মাঝেও ইমাম খোমেনী সাহস ও শক্তি নিয়ে তেহরানে প্রবেশ করেন এবং সেই বিশাল জনসমর্থনকে একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হিসেবে রূপান্তরিত করেন; এমনকি সেদিনই রাজতন্ত্রের পতনের ঘোষণা দেন।
সর্বোচ্চ নেতা; জনগণভিত্তিক শাসনের ব্যাখ্যায় তিনি জাতির মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টির কথা তুলে ধরে বলেন, প্রজ্ঞাবান ইমাম খোমেনী জনগণকে তাদের বিশাল সক্ষমতা ও মূল্যবোধ সম্পর্কে সচেতন করেন এবং “আমরা পারি না”- এই মানসিকতাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাস “আমরা পারি”-তে রূপান্তর করেন।
আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী তেহরানে সাম্প্রতিক নৈরাজ্যের মতো অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী ও অপরাধের কথা স্মরণ করিয়ে দেন- যেমন ফার্সি ১৩৬০ সালের ৩০ খোরদাদের (৪৪ বছর আগে) হত্যাকাণ্ড, যখন মোনাফেকরা কার্পেট কাটার ধারালো ছুরি দিয়ে মানুষের ওপর হামলা চালিয়েছিল। তিনি বলেন, এসব ঘটনায় বিদেশি শক্তির হাত বিশেষ করে আমেরিকা ও ইহুদিবাদী ইসরায়েলের হাত সুস্পষ্ট।
সর্বোচ্চ নেতা সাম্প্রতিক মার্কিন নৈরাজ্যের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, এর প্রথম বৈশিষ্ট্য ছিল ব্যবসায়ীদের প্রতিবাদের আড়ালে দাঙ্গাবাজদের লুকিয়ে থাকা। তিনি বলেন, দাঙ্গাবাজরা ঠিক সেইসব অপরাধীর মতো, যারা শহরে হামলার সময় নারী ও শিশুদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে-তারা ব্যবসায়ীদের আড়ালে লুকিয়েছিল, যারা যৌক্তিক ও ন্যায্য দাবিতে রাস্তায় নেমেছিল। দাঙ্গাবাজরা তাদের পেছনে লুকিয়েছিল যাতে নিজেরা শনাক্ত না হয়।
বিপ্লবের নেতা সাম্প্রতিক নৈরাজ্যের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হিসেবে একে ক্যু-এর সঙ্গে তুলনা করে বলেন, এই নৈরাজ্য ক্যু-এর মতো ছিল। পুলিশ, ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি), সরকারি দপ্তর, ব্যাংক এমনকি মসজিদ ও কুরআনের ওপর হামলা চালানো হয়েছে- এসবই প্রমাণ করে যে, এটি ছিল দেশ পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র।
তিনি আরও বলেন, এই নৈরাজ্যের নকশা বিদেশে তৈরি হয়েছিল এবং স্যাটেলাইট তথ্যসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে দেশের ভেতরের নেতৃত্বদানকারীদের দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছিল। তিনি বলেন, প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী মার্কিন প্রশাসনের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি তার ইরানি সমকক্ষকে বলেছে যে, সিআইএ ও মোসাদ এই ঘটনার জন্য তাদের সব সামর্থ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে।
আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী দাঙ্গার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে ‘লাশ বাড়ানোর ষড়যন্ত্র' এর কথা উল্লেখ করে বলেন, উন্নত ব্যক্তিগত অস্ত্র দিয়ে সামরিক ও নিরাপত্তা কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানো হয়, যাতে নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় লোকজন প্রাণ হারায়। এমনকি বেশি লাশ দেখানোর জন্য তারা নিজেদের পদাতিক শক্তিকেও রেহাই দেয়নি এবং তাদেরও লক্ষ্যবস্তু করেছে।
তিনি শত্রুদের পক্ষ থেকে নিহতদের সংখ্যা দশগুণ বাড়িয়ে দেখানোর চেষ্টার কথা উল্লেখ করে বলেন, তারা চেয়েছিল নিহতের সংখ্যা আরও বেশি হোক। যদিও এই পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতিও অত্যন্ত দুঃখজনক।
তিনি বলেন, শত্রুর মূল লক্ষ্য ছিল দেশের নিরাপত্তা ধ্বংস করা, কারণ নিরাপত্তা না থাকলে কিছুই থাকে না। তাই যারা দেশের নিরাপত্তা রক্ষা করেছেন, তাদের কাছে সবাই ঋণী।
আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী বলেন, তারা চেয়েছিল জনগণকে রাষ্ট্র ও সরকারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে, কিন্তু জনগণ ২২ দেই (১২ জানুয়ারি) ব্যাপক সংখ্যায় রাস্তায় নেমে শত্রুদের চপেটাঘাত করেছে এবং ইরানি জাতির প্রকৃত চেহারা তুলে ধরেছে।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতির কথা স্মরণ করে তিনি বলেন- কে বিশ্বাস করত একদিন ইরানি জাতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে যে, আমেরিকা ইরানিদের তৈরি অস্ত্র কপি করবে? এসবই আত্মবিশ্বাস এবং আশা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফসল- যে আশা ও আত্মবিশ্বাস ইমাম খোমেনী ইরানি জাতির মধ্যে সৃষ্টি করেছিলেন এবং জনগণকে চেষ্টা-প্রচেষ্টার পথে পরিচালিত করেছিলেন।
Your Comment