আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): মহান নেতা ইমাম খোমেইনী (রহ.) -এর আগমনকে কেন্দ্র করে আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানে আলোকজ্জ্বল দশ প্রভাত বা দাহে ফাজর শুরু হয়েছে।
ফার্সি তারিখ ১২ বাহমান থেকে ২২ বাহমান (১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত সময়কে আলোকজ্জ্বল দশ প্রভাত হিসেবে ধরা হয়।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবকে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং শ্রেষ্ঠ বিপ্লব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইসলামি বিপ্লবের বিজয় ছিল প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতা ও মর্যাদা অর্জন এবং অহংকারী স্বৈরাচারী শক্তির আধিপত্য থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একটি মহান জাতির ইচ্ছার বাস্তবায়ন।
যখন বিশ্ব পূর্ব ও পশ্চিমের দুটি পরাশক্তির মধ্যে বিভক্ত ছিল। পূর্ব-পশ্চিম নয়, ইমাম খোমেনী (রহ.)-এর নেতৃত্বে ১৯৭৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ফার্সি ১৩৫৭ সালে ২২ শে বাহমান ইরানি জনতার বিপ্লব; ইসলামি বিপ্লব বিজয় অর্জন করে।
বিপ্লবের বিজয়ের দিনগুলো, ১৩৫৭ সালের ১২ থেকে ২২শে বাহমান পর্যন্ত, ইরানে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা দুর্নীতিগ্রস্ত সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার পতনের দিকে পরিচালিত করে। এই ১০ দিন ছিল সাম্রাজ্যবাদী শাসনব্যবস্থা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ তার সমর্থকদের জন্যে দুর্ভাগ্যজনক দিন।
এই দশদিনে তাদের সমস্ত হিসাব-নিকাশকে পাল্টে দেয় ইরানের বিপ্লবী জনতা। ১২ বাহমান তথা ১ ফেব্রুয়ারিতে ইমাম খোমেনীর স্বদেশে প্রত্যাবর্তন রোধে তাদের সমস্ত চক্রান্ত ব্যর্থ হয়।
ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন, জনগণের বিপ্লবী অভ্যুত্থানের সাথে তেল শিল্পের মতো সংবেদনশীল খাতের কর্মীদের সংহতি ঘোষণা, রাজকীয় পরিষদ ভেঙে দেওয়া, ইমামের আদেশে সামরিক আইনের নিয়ন্ত্রণের অকার্যকরতা এবং রাস্তায় মানুষের উপস্থিতি এবং ১৯ বাহমানে ইমামের প্রতি সমর্থকদের ঐতিহাসিক আনুগত্য ছিল বিপ্লবের বিজয়ের ঘটনাগুলির মধ্যে অন্যতম।
ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর নেতৃত্বে ইরানের ইসলামি বিপ্লব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন দিক থেকে অন্য যেকোনো দেশের যেকোনো কোনও বিপ্লবের সাথে তুলনীয় নয়। প্রকৃতপক্ষে, ইসলামি বিপ্লব ছাড়া অন্য কোনও বিপ্লবের মধ্যে সেই সমাজের বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং সকল সামাজিক স্তরের জনগণের অংশগ্রহণকে অন্তর্ভুক্ত করে না। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের মধ্যে ছিল এমন একটি প্রকৃত বিপ্লবের বৈশিষ্ট্য এবং উপাদান।
ইমাম খোমেইনী (রহ.), যিনি ছিলেন আন্দোলনের শীর্ষে এবং তিনি ইরানি সমাজের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তিনি ইসলামি বিপ্লব বিজয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং সাফল্যের রহস্যকে জনগণের আত্মার আহ্বান বলে মনে করতেন।
১৩৫৭ সালের ১২ বাহমান (১৯৭৮) ইমাম খোমেনী (রহ.)-এর প্রত্যাবর্তন এবং একই বছরের ২২ বাহমানে ইসলামী বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয় ইরানের সমসাময়িক ইতিহাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এই দশ দিন কেবল শাহের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে একটি জনপ্রিয় আন্দোলনের সূচনা এবং সমাপ্তি ছিল না বরং ইরানি জাতির সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনাও ছিল।
ইমাম খোমেইনী (রহ.)-কে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঐতিহাসিকভাবে স্বাগত জানান ছিল জনগণের বিশ্বাস ও সংহতি এবং ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং সমাজের সাধারণ ইচ্ছার মধ্যে গভীর সংযোগের প্রতিফলন।
ফার্সি ১৩৫৭ সালে ( ইংরেজি ১৯৭৮) ইরানের ইসলামী বিপ্লব কেবল সরকারের কাঠামোতে রাজনৈতিক পরিবর্তনই আনেনি বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক, মূল্যবোধ এবং মৌলিক বিপ্লবও ছিল যা জনগণের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের সকল দিককে প্রভাবিত করেছিল।
এই বিপ্লবের বিজয় ছিল ইরানি জাতির বিশ্বাস, ঐক্য এবং ইচ্ছার প্রতিফলন যারা মহান স্রষ্টার দেওয়া মূল্যবোধ, মানবিক মর্যাদা এবং জাতীয় স্বাধীনতার ওপর নির্ভর করে তার ভবিষ্যত পুনর্নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিশ্বে ইরানের ভাবমূর্তি পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছিল। এই বিপ্লব এশিয়া, আফ্রিকা এবং পশ্চিম এশিয়ার অন্যান্য জাতিকে অনুপ্রাণিত করেছিল। ইরানের ইসলামি বিপ্লব দেখিয়েছিল যে বিশ্বাস এবং সচেতনতা বড় যেকোনো অপশক্তিকও চ্যালেঞ্জ করতে পারে। পরবর্তীতে ইরানের উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিয়েছিল অনেক দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন। ইরানিদের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ন্যায়বিচার এবং প্রতিরোধের মতো মূল্যবোধে তারা উদ্বুদ্ধ হয়েছিল।
ইসলামী বিপ্লবের প্রভাব এখনও অটুট রয়েছে। এই বিপ্লব কেবল ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন করেনি বরং ইরানিদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় এবং বৈজ্ঞানিক বিকাশের চেতনাকেও উজ্জীবিত রেখেছে।
আলোকজ্জ্বল দশ প্রভাত বা ফজরের দশক এবং বিপ্লব বিজয়ের স্মরণীয় দিনগুলি এই মূল্যবোধকে পুনর্বিবেচনার একটি সুযোগ। এইদিনগুলোর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মও জানতে পারে যে ইরানকে যা গর্বিত এবং স্বাধীন রেখেছে তা হল জনগণের বিশ্বাস, ঐক্য এবং আদর্শ।
Your Comment