কারণ,এই দিনে ত্রিভুবনকে আলোকিত করে জন্ম নিয়েছিলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)’র প্রাণপ্রিয় দ্বিতীয় নাতি এবং ইসলামের চরম দূর্দিনের ত্রাণকর্তা ও শহীদদের নেতা হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)। তাঁর পবিত্র শুভ জন্মদিন উপলক্ষে সবাইকে জানাচ্ছি প্রাণঢালা মুবারকবাদ এবং এ মহান ইমামের শানে পেশ করছি অশেষ সালাম ও দরুদ।
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন,"নিশ্চয়ই হাসান ও হুসাইন বেহেশতের যুবকদের সর্দার এবং বিপ্লব করুক বা না করুক তাঁরা মুসলমানদের ইমাম।"
ইমাম হুসাইন (আ.)'র জন্মলগ্নে তাঁর মায়ের সেবা করছিলেন বিশ্বনবী (সা.)'র ফুপু সাফিয়া বিনতে আবদুল মোত্তালিব। রাসূল সে সময় তাঁর ফুপুর কাছে এসে বলেন, হে ফুপু, আমার ছেলেকে আমার কাছে কাছে আনুন। তখন সাফিয়া বললেন, আমি তাঁকে এখনও পবিত্র করিনি। বিশ্বনবী (সা.) বললেন, "তাঁকে তুমি পবিত্র করবে? বরং আল্লাহই তাঁকে পরিষ্কার ও পবিত্র করেছেন।" ইমাম হুসাইন (আ.)’র জন্মের পর তাঁর ডান কানে আজান ও বাম কানে ইক্বামত পাঠ করেছিলেন স্বয়ং বিশ্বনবী (সা.)। মহান আল্লাহর নির্দেশে তিনি এই শিশুর নাম রাখেন হুসাইন। এ শব্দের অর্থ সুন্দর,সৎ,ভালো ইত্যাদি।
ইমাম হুসাইন (আ) সম্পর্কে বিশ্বনবী (সা) বলেছেন,হুসাইন আমার থেকে এবং আমি হুসাইন থেকে।তিনি আরও বলেছেন,হুসাইন আমার সন্তান,আমার বংশ ও মানবজাতির মধ্যে তাঁর ভাই হাসানের পর শ্রেষ্ঠ।সে মুসলমানদের ইমাম, মুমিনদের অভিভাবক,জগতগুলোর রবের প্রতিনিধি বা খলিফা, … সে আল্লাহর হুজ্জাত বা প্রমাণ পুরো সৃষ্টির ওপর,সে বেহেশতের যুবকদের সর্দার,উম্মতের মুক্তির দরজা। তাঁর আদেশ হল আমার আদেশ। তাঁর আনুগত্য করা হল আমারই আনুগত্য করা। যেই তাঁকে অনুসরণ করে সে আমার সাথে যুক্ত হয় এবং যে তাঁর অবাধ্য হয় সে আমার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে না।
ইমাম হুসাইন (আ.) ছয় বছর পর্যন্ত নানা বিশ্বনবী (সা.)’র সান্নিধ্য পেয়েছিলেন।
হযরত সালমান ফারসি বলেছেন: আমি দেখেছি রাসূল (সা.) হুসাইনকে তাঁর হাটুর ওপর বসিয়ে চুমু খাচ্ছেন আর বলছিলেন: তুমি মহান, মহান ব্যক্তির পুত্র এবং মহান ব্যক্তিবর্গের পিতা। তুমি ইমাম, ইমামের পুত্র, ইমামের ভাই এবং ইমামদের পিতা। তুমি আল্লাহর হুজ্জাত বা নিদর্শন, আল্লাহর হুজ্জাতের পুত্র এবং আল্লাহর নয়জন হুজ্জাত বা ইমামের পিতা। তাঁদের শেষ জন তথা ইমাম মাহদি-আ. শেষ জামানায় ক্বিয়াম করবেন। (আল্লাহ তাঁর আগমন ত্বরান্বিত করুক)।
নিশ্চয়ই হুসাইন বিন আলীর মূল্য আকাশগুলো ও জমিনগুলোর চেয়ে বেশি এবং নিশ্চয়ই তাঁর বিষয়ে মহান আল্লাহর আরশের ডান দিকে লেখা আছে : হেদায়াতের আলো,নাজাতের নৌকা,একজন ইমাম, দুর্বল নন, মর্যাদা ও গৌরবের উৎস,এক সুউচ্চ বাতিঘর এবং মহামূল্যবান সম্পদ।
ইমাম হুসাইন (আ)’র জন্মের পর এই নবজাতক শিশু সম্পর্কে বিশ্বনবী বলেছিলেন, ‘হে ফাতিমা! তাঁকে নাও। নিশ্চয়ই সে একজন ইমাম ও ইমামের সন্তান। সে নয়জন ইমামের পিতা। তারই বংশে জন্ম নেবে নৈতিক গুণ-সম্পন্ন ইমামবৃন্দ। তাঁদের নবম জন হবেন আল-কায়েম তথা মাহদি।’
বিশ্বনবী (সা.) আরো বলেছেন: যে হাসান ও হুসাইনকে ভালবাসবে, সে যেন আমাকে ভালবাসল। আর যে তাঁদের সঙ্গে শত্রুতার করবে সে আমার সঙ্গেই শত্রুতা করলো।
ইমাম হুসাইনের জন্য শোক প্রকাশ প্রসঙ্গে বিশ্বনবী (সা) বলেছেন,নিশ্চয়ই প্রত্যেক মু’মিনের হৃদয়ে হুসাইনের শাহাদতের ব্যাপারে এমন ভালবাসা আছে যে তার উত্তাপ কখনো প্রশমিত হবে না। -ইমাম হুসাইনের শাহাদাতের চেহলাম-বার্ষিকীতে কোটি কোটি মুসলমানের পদযাত্রা ও বিশ্বের বৃহত্তম শোক সমাবেশ মহানবীর এই হাদিসটির যথার্থতা তুলে ধরছে। মহানবী আরও বলেছেন,‘নিশ্চয়ই সমস্ত চোখ কিয়ামতের দিন কাঁদতে থাকবে,কেবল সেই চোখ ছাড়া যা হুসাইনের বিয়োগান্ত ঘটনায় কাঁদবে,ঐ চোখ সেদিন হাসতে থাকবে এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ ও বিপুল নেয়ামত দান করা হবে।’
ইসলামের শত্রুরা মহানবীর (সা) পবিত্র আহলে বাইতকে ও তাঁদের পবিত্র নামকে ইতিহাস থেকে মুছে দিতে চেয়েছিল চিরতরে। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে এর উল্টো।
হুসাইন (আ.) পিতার সান্নিধ্য পেয়েছিলেন ত্রিশ বছর। যে পিতা হলেন বিশ্বনবী (সা.)’র পর সব ধরণের মহৎ ও মানবীয় গুণের সর্বোত্তম আদর্শ। তিনি বড় ভাইয়ের মতই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পিতার সংগ্রামেরও ছিলেন সর্বোত্তম সঙ্গী। তাই জামাল,সিফফিন ও নাহরাওয়ানের যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এই মহান ইমাম। তিনি প্রকৃত ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠায় বড় ভাই হাসান (আ.)’রও ছিলেন ঘনিষ্ঠ সঙ্গী।
ইমাম হুসাইন (আ.) বড় ভাইয়ের নীতি অনুসরণ করে ধার্মিকতার বেশধারী মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেননি, অর্থাৎ বীরত্বব্যাঞ্জক নমনীয়তার নীতি অব্যাহত রাখেন। কিন্তু প্রকাশ্য খোদাদ্রোহী ও চরম ফাসিক ইয়াজিদ মুসলিম বিশ্বের ক্ষমতা গ্রহণের মাধ্যমে ইসলামের বারোটা বাজানোর প্রক্রিয়ার ষোলকলা পূর্ণ করার উদ্যোগ নেয়ায় ইসলামকে রক্ষার জন্য এগিয়ে আসেন ইমাম হুসাইন (আ.)। অবশেষে তিনি কারবালার বিশ্ববিশ্রুত ও কালজয়ী মহাবিপ্লবের মাধ্যমে নানাজানের সেই অমর বাণীকে প্রমাণিত করেন যে: হুসাইন আমা হতে আর আমি হুসাইন থেকে।
বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ জনাব আলায়েলি বলেছেন: ইমাম হুসাইনের মর্যাদা ও মহত্ত্ব এক বিশাল জগতকে জুড়ে ঘিরে আছে যে যার নানা দিক এতই অসীম ও অনন্ত যে এসবের প্রতিটি দিকই ইতিহাসের ব্যাপক অধ্যায়গুলোর মধ্যে শীর্ষস্থান দখল করে আছে। দৃশ্যতঃ তিনি ছিলেন সব উচ্চ মর্যাদা ও শীর্ষস্থানের সমষ্টি।
ইসলামের জন্য নিজের ও দুধের শিশুসহ নিজ সন্তানদের জীবন বিসর্জন এবং এমনকি নিজ পরিবারের নারী সদস্যদেরকেও বন্দীত্বের কঠোরতা বরণের অনন্য ত্যাগের জন্য স্বেচ্ছাসেবী হতে প্রস্তুত করার মাধ্যমে ত্যাগ আর বীরত্বের নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত রেখে ইমাম হুসাইন (আ.) হয়ে আছেন ইসলামের ইতিহাসের কালজয়ী মহাকাণ্ডারী।
342/