আবনা ডেস্ক :খুলনায় নির্মমভাবে পেটে হাওয়া ঢুকিয়ে শিশু রাকিব সরদারকে (১২) হত্যার দায়ে দুই আসামিকে ফাঁসির আদেশ ও একজনকে খালাস দিয়েছেন আদালত। খুলনা মহানগর দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক দিলরুবা সুলতানা রোববার জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন।
ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তরা হচ্ছেন- শরীফ মোটরসের মালিক মো. শরীফ এবং তার পাতানো চাচা মো. মিন্টু খান। মামলার আরেক আসামি শরীফের মা বিউটি বেগমকে খালাস দিয়েছেন আদালত। আসামিরা সবাই জেলহাজতে রয়েছেন।
রোববার রায় ঘোষণার সময় রাকীবের বাবা নুরুল আলম, মা লাকী বেগম ও ছোট বোন রিমি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। এর আগে সকালে মামলার ৩ আসামিকে কারাগার থেকে এনে আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। বেলা সোয়া ১২টার দিকে তাদের এজলাস কক্ষে আনা হয়। সিলেটে চুরির অপবাদে শিশু সামিউল আলম রাজনকে পিটিয়ে হত্যার পর মাস না পেরোতেই ৩ আগস্ট খুলনায় রাকিব হত্যার ঘটনা ঘটে। হত্যার ঘটনার মাত্র ৩ মাস ৫ দিনের মাথায় ১১ বিচারিক কার্য দিবসে এ রায় ঘোষণা করলেন আদালত, যা খুলনাসহ সারা দেশের বিচার ও আইন-আদালতের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা।
বিউটি বেগমের খালাসের কথা শুনে রাকিবের মা আদালত প্রাঙ্গণেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তার বোন ও বাবা আহাজারি করতে থাকেন। এলাকাবাসী রায় ঘোষণার পর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। তারা বিউটি বেগমের ফাঁসির দাবি করেন। রাকিবের ছোট বোনের আহাজারিতে আদালত চত্বরে শোকাতুর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
বিউটি বেগমের খালাসের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা করা হবে জানিয়ে রাকিবের মা লাকী বেগম জানান, রাকীব হত্যার মূলই ছিল বিউটি বেগম। সে খালাস পেয়েছে এবং মুক্তি পেয়ে বের হয়ে আসবে। এরপর সে তদবিরসহ নানা পদক্ষেপ নিতে শুরু করবে- যা তার পরিবারের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এজন্য বিউটির খালাসের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে। রাকিবের বাবা নুরুল আলম জানান, আইনের ওপর ভরসা করেছি। দুই আসামির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয়েছে। এখন দ্রুত এই শাস্তির বাস্তবায়ন দেখতে চাই। একই সঙ্গে বিউটি বেগম খালাস পাওয়ায় পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় পড়ার আশংকা রয়েছে। এ ব্যাপারে প্রশাসনের পদক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
রাষ্ট্রপক্ষের পিপি সুলতানা রহমান শিল্পী রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, এত কম সময়ে এর আগে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালেও কোনো রায় হয়নি। এই রায়টি একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।
তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী তৌহিদুর রহমান চৌধুরী তুষার রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পরই উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।
নগরীর টুটপাড়া কবরস্থান মোড়ে ‘শরীফ মোটরস’ নামে একটি ওয়ার্কশপে মোটরসাইকেলে হাওয়া দেয়ার কমপ্রেসার মেশিনের মাধ্যমে মলদ্বারে হাওয়া ঢুকিয়ে হত্যা করা হয় রাকিবকে। রাকিব ওই ওয়ার্কশপে কাজ করত। লাশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, কমপ্রেসার মেশিনের মাধ্যমে দেয়া বাতাসের চাপে কিশোর রাকিবের পেটের ভেতরের নাড়ি, মলদ্বার, ?মূত্রথলি ফেটে অতিরিক্তি রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পর পরই মো. শরীফ, তার মা বিউটি বেগম এবং পাতানো চাচা মিন্টু খানকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরদিন রাকিবের বাবা বাদী হয়ে খুলনা সদর থানায় ৩ জনের নামে হত্যা মামলা দায়ের করেন। গ্রেফতার তিনজনই পর্যায়ক্রমে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ২৫ আগস্ট তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই কাজী মোস্তাক আহমেদ আদালতে ৩ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন। ৬ সেপ্টেম্বর মহানগর হাকিম ফারুক ইকবাল চার্জশিট গ্রহণ করে মামলাটি বিচারের জন্য মহানগর দায়রা জজ আদালতে প্রেরণ করেন। ২২ সেপ্টেম্বর মামলার শুনানি হয়। ৫ অক্টোবর আদালতে চার্জগঠন করা হয়। ১১ অক্টোবর থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ৬ কার্যদিবসে ৩৮ জনের সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্যদিয়ে ২৫ অক্টোবর সাক্ষ্য নেয়া শেষ হয়। ২৮ অক্টোবর আদালতে এই মামলায় আসামিদের পরীক্ষা এবং ১ নভেম্বর যুক্তিতর্ক শেষে বিচারক রায় ঘোষণার দিন জানিয়ে দেন।