৮ এপ্রিল ২০১৬ - ০৫:১৩
ইসলামবিদ্বেষ : নেপথ্যে ব্রিটিশ মিডিয়া!

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মানে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া চড়াও হওয়া নয় বলে মন্তব্য করেছেন 'দি ইন্ডিপেনডেন্ট'র বিশ্লেষক মিকদাদ ভারসি।

আবনা ডেস্ক : সম্প্রতি ব্রিটেনের 'ডেইলি স্টার সানডে' পত্রিকার একটি খবরের শিরোনাম ছিল 'ব্রিটিশ মসজিদগুলো সন্ত্রাসীদের সহায়তা করতে তহবিল সংগ্রহ করছে'। এই শিরোনাম কতটুকু যৌক্তিক এবং তথ্যবহুল, সেটা জানতে চেয়ে এরপর অনেকেই সম্পাদকের কাছে চিঠি লেখেন। কিন্তু ডেইলি স্টার সানডে কর্তৃপক্ষ সদুত্তর দিতে ব্যর্থ হয়ে এ ধরনের উস্কানিমূলক শিরোনামের জন্য ক্ষমা চায়। আর ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিটাও পুরনো। অর্থাৎ, ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি পত্রিকাটির ২ নাম্বার পৃষ্ঠায় বেশ ছোট আকারে ছাপানো হয়, যেটা অনেকের চোখেই পড়েনি। অথচ ওই শিরোনাম এর আগেই অনেক ব্রিটিশের মধ্যে ইসলামের প্রতি তাদের বিদ্বেষ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
ডেইলি স্টার সানডে পত্রিকার আগে 'দ্য সান' পত্রিকাও ইসলাম ধর্ম নিয়ে উস্কানিমূলক শিরোনাম করেছিল। পরবর্তী সময় নিজেদের ভুল স্বীকারসহ ওই পত্রিকাটিও ক্ষমা চায়। 'দ্য টাইমস' নামে একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকারও শিরোনাম ছিল- 'মুসলিমরা সন্ত্রাসের বিষয়ে নীরব'। টাইমসের এই শিরোনামের প্রতিবাদ করেছিলেন ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেরেসা, ব্রিটিশ সন্ত্রাসবাদবিরোধী কর্মকর্তা নেইল বাসু এবং স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সন্ত্রাসবাদবিরোধী প্রধান রিচার্ড ওয়ালটন।
অপরদিকে মুসলিমদের যৌনতা নিয়েও মনগড়া প্রতিবেদনকে ঘিরে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের পুলিশপ্রধান একটি পত্রিকাকে খোলা চিঠি দেন। ওই চিঠিতে কোনো কারণ ছাড়াই সব দায় মুসলিমদের ওপর চাপানোয় এর চাঁচাছোলা সমালোচনা করেন। এভাবে ইসলামবিদ্বেষী প্রতিবেদন ছাপানো হলে সারা বিশ্বে মুসলিমদের সুষ্ঠুভাবে বেঁচে থাকাটাই যথেষ্ট কষ্টকর হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করেন ওই পুলিশপ্রধান।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মানে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া চড়াও হওয়া নয় বলে মন্তব্য করেছেন 'দি ইন্ডিপেনডেন্ট'র বিশ্লেষক মিকদাদ ভারসি। তার মতে, এর ফলে ব্রিটেনে অন্য ধর্মাবলম্বীর মানুষরা এরই মধ্যে মুসলিমদের বাঁকা চোখে তাকানো শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু সংবাদমাধ্যমগুলো সন্ত্রাসবাদ নিয়ে মনগড়া সংবাদ না ছাপালে এমন অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির কোনো সম্ভাবনাই ছিল না।
ব্রিটেনের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যকলাপের জন্য মুসলিমদের দায়ী করে উস্কানিমূলক তথ্য ছাপানোয় দেশটির নাগরিকদের মধ্যে এক ধরনের ইসলামভীতি তৈরি হয়েছে। এই ভীতি পক্ষান্তরে ব্রিটিশ মুসলিমদের স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকাটা প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে। এ ছাড়া আজকের ব্রিটেনের অর্ধেকের বেশি মানুষ বিশ্বাস করে, উদারপন্থী গণতন্ত্রের জন্য নাকি ইসলাম হুমকি! আবার ৩০ ভাগ ব্রিটিশ শিশু মনে করে, ব্রিটেনকে একটু একটু করে দখল করে নিচ্ছে মুসলিমরা। ব্রিটিশ মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, গত এক বছরে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ ৭০ ভাগের বেশি বেড়ে গেছে।
এভাবে আশঙ্কাজনকহারে মুসলিমবিদ্বেষ বেড়ে যাওয়ার ঘটনাকে দুঃখজনক বলেই মনে করেন বিশ্লেষক মিকদাদ ভাসরি। এ জন্য ব্রিটিশ সরকারকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি স্বাধীনতার নামে কোনো সংবাদপত্র এভাবে বিশেষ একটি ধর্মের মানুষকে কোণঠাসা করার অধিকার সংরক্ষণ করে না বলে বেশ জোরের সঙ্গেই বলেছেন মিকদাদ। সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকদের এ বিষয়ে আরো জোরালো এবং কার্যকর ভূমিকার কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি।
অপরদিকে 'মুসলিম নিউজ কনফারেন্স'র একটি গবেষণাপত্রে সংবাদমাধ্যমের ভাষা আরো বেশি সংযত হওয়া প্রয়োজন বলে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। প্রত্যেকটি সংবাদমাধ্যমে সব ধর্মের মানুষের উপস্থিতিও সমানভাবে জরুরি বলে ওই গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়। কারণ, একটি নির্দিষ্ট ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞানের স্বল্পতা পুরো পরিস্থিতিকেই ঘোলাটে করে দিতে পারে। পাশাপাশি যারা সংবাদমাধ্যম অফিসে কাজ করেন, তাদের নিজ ধর্ম ছাড়াও অন্য ধর্মের বিষয়গুলো সম্পর্কে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেয়ার ওপরও জোর দেয়া হয়েছে ওই গবেষণাপত্রে।
উল্লেখ্য, ব্রিটেনের সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলোতে ০.৫ ভাগ মুসলিম কাজ করে। এর মধ্যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সিনিয়র পোস্টগুলোতে এই হার আরো কম। সংবাদমাধ্যমগুলোতে মুসলিমদের তুলনামূলকভাবে কম উপস্থিতির কারণে ইসলাম সম্পর্কে মনগড়া সংবাদ ছাপানোর মাত্রাটা বেড়েই চলেছে বলে মনে করেন মিকদাদ ভাসরি। কারণ, কোনো একটা বিষয় সঠিকভাবে পর্যালোচনা না করে এবং প্রকৃত বিষয়টা না বুঝে সংবাদ প্রচার করছে কিছু মিডিয়া। বিষয়টি একইসঙ্গে ব্রিটেনে ইসলামবিদ্বেষীর সংখ্যা যেমন বাড়িয়ে দিচ্ছে, একইভাবে অন্য ধর্মবিদ্বেষীও সৃষ্টি করছে। সংবাদসূত্র : দি ইন্ডিপেনডেন্ট