২৩ জুন ২০১৬ - ০২:৫০
আতঙ্কে নড়াইলের চার শিয়া পরিবার

অব্যাহত নির্যাতনের মুখে নড়াইলের চারটি শিয়া পরিবার।

আবনা ডেস্ক: অব্যাহত নির্যাতনের মুখে নড়াইলের চারটি শিয়া পরিবার। স্থানীয় ভূমিদস্যুদের কবলে পড়ে মারধর, বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটের ঘটনায় থানায় দুটি মামলা হলেও আসামিরা বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পরিবারগুলোর ওপর হুমকি অব্যাহত রেখেছে তারা।
স্থানীয় একজন কাউন্সিলরের নেতৃত্বে সংঘটিত এসব ঘটনার কোনো সুরাহা করতে পারছে না পুলিশ। ঘটনার সাত দিন পেরিয়ে গেলেও ধরা পড়েনি কোন আসামি। আতঙ্কে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে অসহায় ওইসব পরিবারের সদস্যরা। এমনকি ঘটনার পর সাংবাদিকদের খবর দেওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারকে শাসিয়েছে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাহাবুব হোসেন।
সরেজমিনে কাশিয়াড়া গ্রামে দেখা গেছে, আসামি রবজেল ও সাফায়েতের বাড়িসংলগ্ন শিয়া সম্প্রদায়ের মঈনউদ্দীন শেখের নতুন টিনশেড পাকা বাড়িটি জনশূন্য। সাংবাদিক দেখে পরিবারের সদস্যরা এগিয়ে এসে বাড়িটির ভাঙচুর ও লুটপাটের অবস্থা দেখে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে। কাশিয়াড়া পূর্বপাড়ায় মঈনউদ্দীন শেখের পুরনো বাড়ি, সাব্বির শেখ, সাজাহান শেখ এবং আল আমীন শেখের বাড়ির আসবাবপত্র ভাঙচুরের পর একইভাবে পড়ে আছে। ভয়ে বাড়ির পুরুষ সদস্যরা বাড়িতে থাকতে সাহস পাচ্ছেন না, উজিরপুর বাজারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সারা দিন কাটিয়ে সেখানেই রাত কাটাচ্ছেন তারা।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নড়াইল সদর থানার এসআই সাইফুল ইসলাম বলেন, "ঘটনার পর থেকে কাশিয়াড়া এলাকায় গিয়ে ভাঙচুরের নমুনা সংগ্রহ করেছি। আসামিদের ধরার ব্যাপারে কয়েক দফা অভিযান চালানো হয়েছে। এলাকার প্রভাবশালীদের কারণে তাঁদেরকে খুজে পাওয়া যাচ্ছে না, আশাকরি দ্রুত আসামি গ্রেপ্তার হবে।"
ভাচুর আর লুটকারীদের পক্ষ অবলম্বন করা নড়াইল পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড় কাউন্সিলর মাহাবুব হোসেনের সঙ্গে কথা বললে তিনি, শিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা অত্যন্ত খারাপ লোক। এরাই আগে গন্ডগোল শুরু করেছে। এরা এলাকাবাসীর নামে গালিগালাজ করেছে তাই এলাকার লোকজন এদের বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে। এদের বার বার ডেকে ও সালিসে পাওয়া যায় না বলে দাবী করেছে।
নড়াইলের পুলিশ সুপার সরদার রকিবুল ইসলাম জানান, ঘটনা ঘটার পরপরই ভুক্তভোগীদের পক্ষে মামলা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে পুলিশ তৎপর রয়েছে। শিয়া সম্প্রদায়ের পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে ভুক্তভোগী পরিবারের এক সদস্য অভিযোগ করে বলেন, "আমাদের লোকজন ব্যবসা করেন, আমাদের সম্পত্তি আর টাকার খাওয়ার জন্য আমাদের সঙ্গে স্থানীয়দের গণ্ডগোল পাকিয়ে স্থানীয় নেতারা ফায়দা লুটছে। তারা সালিসের নামে আমাদের হেনস্তা করেছেন। আসামিদেরকে আমাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেন। হামলা আর মামলার ভয় দেখিয়ে আমাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেন।"
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছ থেকে জানা গেছে, নড়াইল পৌর এলাকার উজিরপুর-কাশিয়াড়া গ্রামে ১৯৬৪ সাল থেকে বসবাসকারী মঈনউদ্দীন শেখের পরিবারসহ পাঁচটি পরিবার একত্রে বসবাস করে আসছে। সম্প্রতি মঈনউদ্দীন শেখের কাশিয়াড়া দক্ষিণপাড়ার বাড়ির জমি দখল করতে মরিয়া হয়ে ওঠে স্থানীয় সুন্নি সম্প্রদায়ের রবজেল ও সাফায়েত মোল্লা। শিয়া সম্প্রদায়ের মঈনউদ্দীন শেখের পরিবারের প্রায় দেড় একর সম্পত্তি দখল করে তাদেরকে উচ্ছেদের জন্য রাস্তাঘাটে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। পরিবারের সদস্যদেরকে উচ্ছেদের জন্য প্রায় মাস খানেক আগে বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এ ঘটনায় মামলা হলে আসামি রবজেল ও সাফায়েত জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় হুমকি দিতে থাকে। এ সময় মামলার ভয় দেখিয়ে স্থানীয় ৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাহাবুবুর রহমান ভুক্তভোগী শিয়া পরিবারের কাছ থেকে কয়েক হাজার টাকা হাতিয়ে নেন। নানা টালবাহানা করে ওই কাউন্সিলর মিটিয়ে দেওয়ার জন্য সালিস করতে চেয়েও তা করেননি। একপর্যায়ে ভয়ে বাড়িঘর ছেড়ে দিয়ে পরিবারটি স্থানীয় অন্য শিয়া সম্প্রদায়ের লোকেদের বাড়িতে আশ্রয় নেয়।
গত ১৫ জুন মঈনউদ্দীন শেখের স্ত্রী ও মা বাড়িতে আসলে পাশের আসামিরা তাদের গালিগালাজ করে এবং একপর্যায়ে মারধর করে। এতে মঈনউদ্দীন শেখের স্ত্রী শাহানারা বেগম ও বৃদ্ধ মা আছিরোন মারাত্মক আহত হয়ে নড়াইল সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ১৭ জুন সকালে আসামি রবজেল, সাফায়েত ও আরজানসহ ২৫-৩০ জন অতর্কিতে হামলা চালিয়ে বাড়ির আসবাপত্র, টিভি, ফ্রিজসহ মালামাল ভাঙচুর করে। তারা বাড়ির ও জায়গার দলিলের কাগজপত্র লুট করে নিয়ে যায়। এ সময় বাড়িতে কয়েকজন নারী ছাড়া অন্য কেউ ছিলেন না। পুনরায় হামলার আতঙ্কে বসতবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে ভাঙচুরের শিকার মঈনউদ্দীন শেখ, সাব্বির শেখ, শাহজাহান শেখ ও আল আমীন শেখের পরিবার।
এ ব্যাপারে বাড়িঘর ভাংচুর ও লুটপাটের সাথে জড়িত আরজান মোল্লা, রবজেল ও সাফায়েত মোল্লার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। শিয়া পরিবারের ওপর নির্যাতন প্রসঙ্গে স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ওবায়দুল মোল্লা জানান, শহরের উজিরপুর এলাকায় ১৯৬৪ সাল থেকে প্রায় ৬৫ পরিবার শিয়া সম্প্রদায়ের পরিবার বসবাস করে আসছে। উজিরপুর বাজারে তাদের রাইসমিল, লেদের ব্যবসাসহ নানা ধরনের কারবার রয়েছে। তাদের টাকা পয়সা এবং উন্নতি দেখে স্থানীয় কিছু মানুষ তাদের সম্পত্তি দখলের জন্য মেতে উঠেছে।#