আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): ‘কখনো কল্পনাও করিনি যে আমি তাঁবুতে থাকব, সেখানে কাজ করব। পানি ও বাথরুমের মতো মৌলিক চাহিদা থেকে আমাকে বঞ্চিত থাকতে হবে।’
‘এটা (তাঁবু) গ্রীষ্মকালে গ্রিনহাউসের মতো এবং শীতকালে রেফ্রিজারেটরের মতো কাজ করে,’ বিবিসিকে বলেছেন সাংবাদিক আবদুল্লাহ মিকদাদ। গাজা উপত্যকায় সাংবাদিকরা বিভিন্ন হাসপাতালের আশপাশে কাপড় ও প্লাস্টিকে মোড়া তাঁবুতে কাজ করেন এবং সেখানেই ঘুমান।
কাজের জন্য সারাক্ষণ বিদ্যুৎ ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট অ্যাক্সেসের প্রয়োজন হয় সাংবাদিকদের। অথচ গাজায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। তাই হাসপাতালের কাছাকাছি থাকতে বাধ্য হন তারা। যেখানে জেনারেটর এখনো কাজ করছে। সেখানে নিজেদের ফোন ও অন্যান্য সরঞ্জাম চার্জ করার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ পান তারা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো খবরের জন্য গাজার স্থানীয় সাংবাদিকদের ওপর নির্ভর করে। কারণ বিবিসি নিউজসহ বিদেশী গণমাধ্যমকে তাদের দেশের সংবাদ সংগ্রহ করতে দেয় না ইসরাইল। একমাত্র খুব বিরল ঘটনা ছাড়া, তখন সাংবাদিকদের ইসরাইলি সেনাদের সাথে জুড়ে দেয়া হয়।
শত অসুবিধা সত্ত্বেও গাজা উপত্যকা থেকে চলমান সংঘর্ষের খবর সংগ্রহ করেন সাংবাদিকরা। তবে অনেক সময় সংগ্রহ করা তথ্য বা তাদের তোলা ছবি ও ভিডিও হাসপাতাল লাগোয়া তাঁবুতে না ফেরা পর্যন্ত পাঠাতে পারেন না তারা। কারণ একমাত্র সেখানে পৌঁছালে তবেই বিদ্যুৎ সংযোগ ও ইন্টারনেট অ্যাক্সেস রয়েছে।
সাংবাদিক হানীন হামদৌনা বিবিসিকে বলেছেন, ‘হাসপাতালের কাছে থাকলে আমরা দ্রুত কভারেজ দিতে পারি। আমরা আহত ও নিহত ব্যক্তিদের সম্পর্কে, জানাজার বিষয়ে সরাসরি জানতে পারি। সাক্ষাৎকারের জন্যও সরাসরি অ্যাক্সেস পাই। কারণ এই ধরনের খবর সংগ্রহের জন্য ঘোরাফেরা করা বা ফোন করা প্রায়শই আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে।’
ফিলিস্তিনি সংবাদমাধ্যম দোনিয়া আল-ওয়াতানের একজন সাংবাদিক তিনি। বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথেও কাজ করেন।
তবে, হাসপাতালের কাছাকাছি থাকা সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। এমনকি তাদের পেশাদার মর্যাদাও নিশ্চিত করে না। অথচ আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় সাংবাদিকদের সুরক্ষা পাওয়ার কথা।
‘মনে হয় সাংবাদিক বলে আমাদের সবসময় নিশানা করা হচ্ছে’
কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস-এর তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরাইল-গাজা সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকে শুধু গাজাতেই ১৮৯ জন সাংবাদিকের মৃত্যু হয়েছে। এই সংখ্যাটা গত তিন বছরে বিশ্বব্যাপী মোট সাংবাদিক হতাহতের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে।
‘সাংবাদিক হিসেবে অনুভব করি যে আমরা ক্রমাগত ইসরাইলি দখলদার বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছি। যার ফলে আমাদের নিজেদের এবং আমাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমাগত ভয়ের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে,’ বিবিসিকে বলেছেন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক সিন্ডিকেটের সেক্রেটারি আহেদ ফারওয়ানা।
প্রায় দুই বছর ধরে গাজায় ক্রমাগত হত্যা, ক্ষুধা, ভয় ও বাস্তুচ্যুতির পরেও গণমাধ্যমের কভারেজের বিষয়ে চাহিদা কিন্তু অব্যাহত রয়েছে এবং সাংবাদিকরাও অবিরাম কাজ করে ক্লান্ত। তাই গাজায় তরুণদের কাছে সাংবাদিক ও চিত্রসাংবাদিকদের কাছে কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ এর আগে কখনো সাংবাদিকতা করেননি।
কোনো কোনো সাংবাদিক স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সাথে আনুষ্ঠানিক ও এককভাবে কাজ করেন। কিন্তু অনেক সাংবাদিককেই অস্থায়ী বা অ্যাডহক চুক্তিতে নিয়োগ করা হয়। এর মানে হলো, তাদের কাজে স্থিতিশীলতা নেই এবং তারা যে বীমার মতো সুরক্ষা ও অর্থ পান, তা-ও নির্দিষ্ট নয়।
জার্মান ম্যাগাজিন ডের স্পিগেলের সংবাদদাতা (এই সংবাদ সংস্থার জন্য তিনি মাঝেসাঝে কাজ করেন) ঘাদা আল-কুর্দ বিবিসিকে বলেন, ‘বিশ্বের প্রত্যেক সাংবাদিকের সংবাদ প্রকাশের দায়িত্ব রয়েছে এবং একইসাথে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা ভোগ করার অধিকারও রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ইসরাইলি সেনাবাহিনী সাংবাদিকদের সাথে সেভাবে আচরণ করে না, বিশেষত ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের সাথে।’
সেনাবাহিনী যে সাংবাদিকদের নিশানা করে সেই অভিযোগ বারবার অস্বীকার করে এসেছে ইসরাইল। তবে, ১০ আগস্ট গাজায় আল জাজিরার সংবাদদাতা আনস আল-শরিফকে তার গণমাধ্যমের জন্য ব্যবহৃত তাঁবুতে হত্যার দায় তারা স্বীকার করেছে। সেখানে চালানো সরাসরি হামলায় আরো পাঁচজন সাংবাদিক এবং একজন ব্যক্তি নিহত হয়েছিলেন।
তবে ইসরাইলি সেনাবাহিনী পাল্টা অভিযোগ তুলে দাবি করেছিল, তিনি ‘হামাসের একটা সন্ত্রাসী সেলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।’ জীবিত অবস্থায় এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন আনস আল-শরিফ। সিপিজের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, তাদের অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছে ইসরাইল।
সিপিজে’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জোডি গিন্সবার্গ বিবিসিকে বলেন, ‘ইসরাইলের এই প্রবণতা আগেও দেখেছি– শুধু এই যুদ্ধে নয়, আগের দশকেও এমনটাই দেখা গেছে। ইসরাইলি বাহিনীর হাতে সাংবাদিকের মৃত্যু হয় আর তারপর ইসরাইল দাবি করে তারা সন্ত্রাসী ছিলেন। কিন্তু সেই দাবির স্বপক্ষে তারা খুব কম প্রমাণই দিতে পারে।’
গত ২৫ আগস্ট দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে ইসরাইলি বাহিনীর জোড়া হামলায় কমপক্ষে ২০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের পাঁচজন সাংবাদিকও রয়েছেন। হামলার ফুটেজে দেখা গেছে, প্রথম হামলায় আহতদের সাহায্যের জন্য যে উদ্ধারকর্মীরা ছুটে গিয়েছিলেন, দ্বিতীয় হামলার শিকার তারাই হয়েছেন।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই ঘটনাকে ‘মর্মান্তিক দুর্ঘটনা’ বলে বর্ণনা করে জানিয়েছেন সামরিক কর্মকর্তারা এর ‘পূর্ণাঙ্গ তদন্ত’ করছেন।
ইসরাইলি সেনাবাহিনী তাদের বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা নিজেদের সৈন্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বেসামরিক নাগরিকদের ক্ষয়ক্ষতির কমানোর জন্য ‘সর্বাত্মক প্রচেষ্টা’ চালাচ্ছে এবং দাবি করেছে হামাস ‘এক অসম্ভব যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করেছে’।
বিবিসির সাথে কথোপকথনের সময় গাজার আল-আরাবি টিভির সংবাদিক আবদুল্লাহ মিকদাদ বিবিসিকে বলেছেন, ‘তাঁবুর ভেতরে কাজ করার সময় আপনি কখনোই জানেন কোন মুহূর্তে কী ঘটতে চলেছে। আপনার তাঁবুতে বা তার আশপাশে বোমা হামলা হতে পারে- তখন আপনি কী করবেন?’
‘ক্যামেরার সামনে ক্লান্ত থাকা সত্ত্বেও আমাকে অত্যন্ত মনোযোগী ও মানসিকভাবে সজাগ থাকতে হয় এবং চটপটে হতে হয়। তবে সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো আমার চারপাশে যা কিছু ঘটছে সে সম্পর্কে সচেতন থাকা। আমি যে জায়গায় আছি সেটা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হলে আমি কী করতে পারি সে সম্পর্কে ভাবা। আমার মনে ক্রমাগত অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে এবং এর কোনো উত্তর নেই।’
‘আমরা অন্যদের ক্ষুধা ও যন্ত্রণা সম্পর্কে জানাই"
গাজা শহরে দুর্ভিক্ষের বিষয়ে প্রথমবার নিশ্চিত করেছে খাদ্য নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতিসঙ্ঘ-সমর্থিত এক সংস্থা। দ্য ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিওরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) তার শ্রেণিবিভাগ পঞ্চম ধাপে উন্নীত করেছে। যা তার তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা স্কেলের সর্বোচ্চ এবং সবচেয়ে খারাপ স্তর বলে মনে করা হয়।
সংশ্লিষ্ট রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, গাজা উপত্যকার পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ ‘ক্ষুধা, ভয়াবহ দারিদ্র্য ও মৃত্যুর’ মুখোমুখি হচ্ছেন।
গত জুলাই মাসে জাতিসঙ্ঘের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, গাজার প্রতি তিনজনের মধ্যে একজনেরও বেশি (৩৯ শতাংশ) এখন ‘দিনের পর দিন না খেয়ে কাটাচ্ছেন’। এই ভয়াবহ ক্ষুধার শিকার কিন্তু সাংবাদিকরাও।
ইন্ডিপেন্ডেন্ট জার্নালিস্ট আহমেদ জালালের কথায়, ‘একটা কর্মদিবসে আপনি যা খেতে পান তা হলো, এক কাপ কফির সাথে ছোলা মিশিয়ে, অথবা চিনি ছাড়া এক গ্লাস চা। বহুদিনই আমরা প্রচণ্ড মাথাব্যথা ও ক্লান্তিতে ভুগি, ক্ষুধার্ত থাকার জন্য ভালোভাবে হাঁটতে পারি না। তবুও আমরা আমাদের কাজ চালিয়ে যাই।’
তিনি বলেন, ‘খবর সংগ্রহের জন্য আমাদের সরঞ্জাম চার্জ করতে, অথবা গাজার বাইরে তথ্য পৌঁছানোর জন্য ইন্টারনেট সংযোগ খুঁজে বের করতে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করি।’
আহমেদ জালাল ও তার পরিবার একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তবুও প্রতিবারই তিনি তার পরিবারের জন্য আশ্রয়, পানি ও খাবার নিশ্চিত করার চেষ্টা চালানোর মাঝেও সাংবাদিকতার কাজ চালিয়ে গিয়েছেন। তার ছেলে অসুস্থ, অবিলম্বে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন। কিন্তু চলমান এই সংঘর্ষ তার সন্তানকে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করেছে। নিজের অসহায়তা আর ছেলের কথা ভেবে, গাজার শিশুদের যন্ত্রণা ও হতাশা সম্পর্কে তার প্রতিবেদনে একদিকে যেমন বেদনার ঝলক থাকে তেমনই সেখানে বাস্তবের ছোঁয়াও থাকে।
তার কথায়, ‘আমরা একইসাথে খবরের অংশ ও তার পরিবাহক দুইই হয়ে উঠি এবং সম্ভবত এটাই আমাদের গল্পকে আরো সত্যের সাথে উপস্থাপন করার জন্য অনুপ্রেরণা দেয়।’
‘সহকর্মী সাংবাদিকদের হত্যার খবর প্রকাশ করার সময় তীব্র যন্ত্রণায় আমার মন ভেঙে যায়। আমার মন আমাকে বলে যে এরপর হয়তো আমার পালা, ভেতরে ভেতরে যন্ত্রণা আমাকে গ্রাস করে। কিন্তু ক্যামেরার সামনে আমি তা লুকিয়ে রাখি আর কাজ করতে থাকি।’
‘আমি দমবন্ধ, ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত ও ভীত বোধ করি। বিশ্রাম নেয়ার জন্যও আমি থামতে পারি না।’
‘আমরা অনুভূতি প্রকাশের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি'
প্রায় দুই বছর ধরে নিজের শহরের বাসিন্দাদের ক্ষুধা আর মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার খবর ক্রমাগত বহির্বিশ্বের সামনে তুলে ধরছেন সাংবাদিক ঘাদা আল-কুর্দ। কিন্তু সেই কাজ করতে গিয়ে তিনি প্রতিনিয়ত যা অনুভব করেন, সেটা প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
বিবিসিকে তিনি বলেছেন, ‘নিজেদের অনুভূতি নিয়ে ভাবার সময় আমাদের নেই। এই যুদ্ধের সময়, আমরা আমাদের আবেগ প্রকাশ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি। আমরা ক্রমাগত আঘাতের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে হয়তো আমরা এই ক্ষমতা ফিরে পাব।’
সেই দিন না আসা পর্যন্ত, তার দুই মেয়ের জন্য তার ভয় এবং ভাই আর তার পরিবারের জন্য নিজের শোক চেপে রেখেছেন এই সাংবাদিক। যাদের লাশ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে আছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
তার কথায়, ‘যুদ্ধ আমাদের মানসিকতা ও ব্যক্তিত্বকে বদলে দিয়েছে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আমাদের ৭ অক্টোবর ২০২৩ সালের আগে যা ছিল তা ফিরে পেতে দীর্ঘ নিরাময়ের প্রয়োজন হবে।’
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানসহ ২৭টা দেশ ইসরাইলকে গাজায় অবিলম্বে স্বাধীন বিদেশী সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকারের আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।
বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকদের অধিকার ও সুরক্ষার পক্ষে কাজ করে মিডিয়া ফ্রিডম কোয়ালিশন। এই আন্তঃসরকারি গোষ্ঠির পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে সাংবাদিকদের ওপর হামলার নিন্দাও করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে গাজায় কর্মরতদের অবশ্যই সুরক্ষা দিতে হবে।
সূত্র : বিবিসি
Your Comment