৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ১২:৪৬
১৫ই শা'বান; ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর শুভ জন্মবার্ষিকী

মুসলিম উম্মাহ ঐক্যমত্য পোষণ করে যে, মহানবী (সা.) এর বংশধারার সর্বশেষ ইমাম হচ্ছেন ইমাম মুহাম্মদ আল মাহদী (আ.), যিনি শেষ যামানায় আবির্ভূত হয়ে বিশ্বব্যাপী ইসলামী হুকুমত এবং ন্যায়বিচার কায়েম করবেন এবং পৃথিবীর বুক থেকে অন্যায়-অত্যাচার ও শোষণের পরিসমাপ্তি ঘটাবেন।

আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): মানবজীবন ফিতনা, ফ্যাসাদ এবং ধ্বংস থেকে পরিত্রাণ লাভ করে আলো ও সৌভাগ্যের পানে ধাবিত হওয়ার চিন্তাধারা কেবল মুসলমানরাই পোষণ করেনা বরং অন্যান্য আসমানী ধর্মেও মিথ্যার ওপর সত্যের বিজয়ের কথা বলা হয়েছে।


কোরআন কারীমে এই বিজয়ের চুড়ান্ত ঘোষণা দিয়ে বলা হয়েছে :

وَنُرِيدُ أَنْ نَمُنَّ عَلَى الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا فِي الْأَرْضِ وَنَجْعَلَهُمْ أَئِمَّةً وَنَجْعَلَهُمُ الْوَارِثِينَ

অর্থাৎ এবং অমরা ইরাদা করেছি যাদেরকে পৃথিবীর বুকে (বঞ্চিত) হীনবল করা হয়েছিল তাদের কে উত্তরাধিকারী করতে এবং নেতৃত্ব দান করা হবে। (১)

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন :

وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ

অর্থাৎ তোমাদের মধ্যে যারা (আল্লাহর ওপর) ইমান এনেছে ও সৎ কর্ম করেছে, তাদের সাথে আল্লাহ ওয়াদা করেছেন তিনি পৃথিবীতে তাদের নেতৃত্ব  (খেলাফত) দান করবেন, যেমনি ভাবে তাদের পূর্ববর্তী লোকদের দান করে ছিলেন। (২)

পবিত্র কোরআনে এসেছে:

وَلَقَدْ كَتَبْنَا فِي الزَّبُورِ مِنْ بَعْدِ الذِّكْرِ أَنَّ الْأَرْضَ يَرِثُهَا عِبَادِيَ الصَّالِحُو

অর্থাৎ নিশ্চয় অমরা তৌরাতের পর যাবুরে উল্লেখ করেছি যে, যোগ্যতা সম্পন্ন বান্দারা পৃথিবীর বুকে, আমাদের উত্তরাধিকারী হবে। (৩)

উপরিউক্ত আয়াত সমূহে এ সুসংবাদ দেয়া হয়েছে যে, পৃথিবীর বুকে কল্যাণময় শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, যার কর্ণধার হবেন আল্লাহর নেক বান্দা। আল্লাহর প্রিয় সেই বান্দাগণের মধ্যে ইমাম মাহদী (আ.) হলেন অন্যতম।

শিয়া-সুন্নী উভয় সম্প্রদায় এ ব্যাপারে ঐক্যমত্য পোষণ করে যে, নবী করীম (সা.) ইমাম মাহদীর আগমনের সুসংবাদ দিয়েছেন।

প্রামাণ্য ও নির্ভরযোগ্য শিয়া-সুন্নী হাদীস গ্রন্থসমূহে মহানবী (সা.) থেকে এ প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে যে,“দুনিয়া ধ্বংস হতে যদি মাত্র একদিনও অবশিষ্ঠ থাকে তবে মহান আল্লাহ (ঐ একদিনের মধ্যেই) আমাদের (আহলে বাইতের) মধ্য থেকে এক ব্যক্তিকে অবশ্যই প্রেরণ করবেন, যিনি এ পৃথিবী যেভাবে অন্যায়-অবিচারে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে, ঠিক সেভাবে ন্যায় ও সুবিচার দিয়ে তা পূর্ণ করে দিবেন”। (৪)

তিনি এ মর্মে সাহাবায়ে কেরামকে বলেছেন যে, শেষ যামানায় মাহদীর আগমন হবে। নবীজি বলেছেন যে, আমার নামে আমার বংশের একজন ব্যক্তি পৃথিবীতে শাসন কর্তৃত্ব না করা পর্যন্ত কেয়ামত সংঘটিত হবেনা। (৫)

সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) হুজাইফা বিন ইয়ামানকে বলেন: “হে হুযাইফা ! এ দুনিয়া ধ্বংস হতে মাত্র একদিনও যদি অবশিষ্ঠ থাকে তাহলে মহান আল্লাহ তায়ালা সেই দিনকেই এতো বেশী দীর্ঘায়িত করবেন যাতে আমার আহলে বাইতের অন্তর্ভূক্ত এক ব্যক্তি বিশ্বের শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়, যার মাধ্যমে বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও যুদ্ধ সংঘটিত হবে এবং ইসলাম ধর্ম বিজয়ী হবে। মহান আল্লাহ তার ওয়াদা ভঙ্গ করেন না এবং তিনি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী বটে”।(৬)

মহানবী (সা.) বলেন: “আমার আহলে বাইতের এক ব্যক্তি ঐ দিন উত্থান করবেন। তার নাম হবে আমার নামে, তার পিতার নাম হবে আমার পিতার নামে, জুলুম ও পাপে পূর্ণ হওয়ার পর তিনি পৃথিবীকে ন্যায় ও ইনসাফে পরিপূর্ণ করবেন।(৭)

 বোখারী তার সহীহ হাদীসে বলেন, রাসুলে খোদা (সা.) বলেছন: সেদিন তোমাদের অবস্থা কিরূপ হবে, যখন মরিয়ম পূত্র তোমাদের মাঝে অবতরণ করবে এবং যুওগর ইমাম তোমাদের মাঝে থাকবে। (৮)

ইসলামী গবেষক ও আলেমদের মতে, আহলে সুন্নাতের মুহাদ্দিসগণ মহানবী (সা.) এর তেত্রিশ জন সাহাবী থেকে ইমাম মাহদী (আ.ফা.) সংক্রান্ত হাদীস তাদের নিজ নিজ হাদীস গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। এক শত ছয় জন প্রখ্যাত সুন্নী আলেম গায়েব (অদৃশ্য) ইমাম মাহদীর (আ.ফা.) আবির্ভাব সংক্রান্ত হাদীস নিজ নিজ গ্রন্থে সংকলন করেছেন। বত্রিশ জন প্রসিদ্ধ আলেম ইমাম মাহদী (আ.) সম্পর্কে স্বতন্ত্র গ্রন্থও রচনা করেছেন।

বস্তুত ইমাম মাহদীর আবির্ভাব সম্পর্কিত বর্ণনা ও আকিদার ব্যাপারে বিদ্যমান সকল মযহাবের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। তবে যে ব্যাপারে ভিন্নমত রয়েছে, তা হলো তার জন্ম বা জন্মের সময়কাল সম্পর্কিত।

আহলে সুন্নাতের অধিকাংশ অনুসারী বিশ্বাস করেন যে, তিনি এখনো জন্মগ্রহণ করেননি বরং বিশ্বের বুকে খোদায়ী হুকুমাত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আবির্ভাবের পূর্বেই তার জন্ম হবে।

কিন্তু শিয়া সম্প্রদায় ও আহলে সুন্নাতের কিছু লোকের বিশ্বাস হলো, ইমাম মাহদী সামেরায় ২৫৫ হিজরীর ১৫ শাবান জন্মগ্রহণ করেছেন। আহলে সুন্নাতের কিছু সংখ্যক লোক তার জন্মের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।(৯)

ইমামত

ইমাম আসকারী (আ.) এর শাহাদতের সময় ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর বয়স ছিল মাত্র ৫ বছর। অর্থাৎ ৫ বছর বয়স থেকেই তিনি ইমামত প্রাপ্ত হন।

 রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তাঁর হেফাজাতের জন্য তাকে জনসাধারণের কাছ থেকে গোপন রাখা হয়। তিনি আল্লাহর হুকুমে অদৃশ্য অবস্থানে (গায়েব) চলে যান। তার ফলে আব্বাসীয়রা তাকে খুজে বের করে হত্যা করতে পারেনি। গায়েব অবস্থায় ইমাম মাহদী তার কতিপয় বিশিষ্ট প্রতিনিধির মাধ্যমে জনগণের জন্য নিজের বাণী প্রকাশ করেন।

ইমাম মাহদীর (আ.) গায়িব (অন্তথর্ধান) দুভাগে বিভক্ত

১. গায়িবাতে সুগরা (স্বল্পকালীন অন্তর্ধান) : প্রথম গায়িব অবস্থার শুরু হয় ২৬০ হিজরীর (৮৭২ খ্রি.) রবিউল আউয়াল মাসে এবং তা শেষ হয় ৩২৯ হিজরীতে (৯৩৯ খ্রি.)শাওয়াল মাসে। প্রথম গায়িব সময়কাল ছিল ৭০ বছর।

২. গায়িবাতে কুবরা (দীর্ঘকালীন অন্তর্ধান) : দ্বিতীয় প্রধান গায়িব শুরু হয় ৩২৯ হিজরীতে এবং আল্লাহর যতদিন ইচ্ছা ততদিন এ অবস্থানকে বলবৎ রাখবেন। নির্ভর যোগ্য বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, মহা নবী (সা.) বলেছেন- “এ বিশ্বজগত ধ্বংস হওয়ার জন্য যদি একটি দিনও অবশিষ্ট থাকে, তাহলে মহান আল্লাহ তা’আলা অবশ্যই সে দিনটিকে এতবেশী দীর্ঘায়ীত করবেন, যাতে আমার সন্তান মাহদী (আ.) আত্মপ্রকাশ করতে পারে এবং অন্যায় অত্যাচারে পরিপূর্ণ এ পৃথিবীতে সম্পূর্ণরূপে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে।” (১০)

উপসংহার:

وَاللَّيْلِ إِذَا يَغْشَى * وَالنَّهَارِ إِذَا تَجَلَّى 

অর্থাৎ “রাতের শপথ যখন অন্ধকার ছেয়ে যায় এবং দিনের শপথ যখন আলোকোজ্জ্বল হয়” (১১)।

মোহাম্মদ বিন মুসলিম হযরত ইমাম মোহাম্মদ বাকের (আ.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: ‘রাত যখন ছেয়ে যায়’ বলতে, হযরত আলী বিন আবি তালিব (আ.) কে বুঝানো হয়েছে। যে অন্যায়ের রাজত্বে তিনি শহীদ হয়ে ছিলেন এবং ভীষণ ধৈয্যের প্রমাণ দিলেন, আর দিনের আলো যখন উজ্জ্বল হয়, অর্থাৎ হযরত ইমাম মাহদী (আ.ফা.) কে বুঝানো হয়েছে। যখন তার আবির্ভাব ঘটবে তখন তিনি বাতিল রাজত্বের ওপর জয়ী হবেন। (১২)


১-সূরা কাসাস, আয়াত নং-৫

২-সূরা নূর, আয়াত নং-৫৫

৩- সূরা আম্বিয়া আয়াত নং-১০৫

৪- মুসনাদ-ই-আহমদ ইবনে হাম্বল, ১ম খণ্ড;পৃষ্ঠা: ৯৯, বৈরুত, দারুল ফিকর কর্র্তৃক প্রকাশিত

৫-সহীহ তিরমিযি, ২য় খণ্ড / ৪৬ পৃষ্ঠার বরাতে মুন্তাখাবুল আছর ২য় অধ্যায়, পৃ. ১৪২ ; তিরমিযি, বৈরুত, কিতাবুল ফিতান ৫২ তম অধ্যায়, পৃ. ৬১১, হাদীস নং : ২২৩০

৬-ইকদুদ দুরার, আবু নাঈম ইসফাহানী প্রণীত সিফাতুল মাহদী

৭- সুনানে আবু দাউদ, ২য় খণ্ড;পৃষ্ঠা. ৪২২

৮- সহীহ বুখারী, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৪৩

৯-মাতালেবুস সোয়াল, আল্লামা কামাল উদ্দিন মুহাম্মদ ইবনে তালহা আশ-শামী আশ-শাফেয়ী, পৃ. ৮৯। ওয়াফিয়াতুল আইয়ান, আল্লামা ইবনে খালদুন, ১ম খণ্ড,পৃ. ৫৭১,মিশরের ছাপা

১০-বিহারুল আনওয়ার, ৫১তম খণ্ড, পৃ. ৩৬০ থেকে৩৬১। শেখ তুসি, কিতাবুল গেইবাত, পৃ. ২৪২

১১- সুরা লাইল, আয়াত ১-২

১২-তাফসীরে কুমী, ২য় খণ্ড ,পৃ: ৪২৫; বয়ানুস সায়াদাহ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ:২৫৯

Tags

Your Comment

You are replying to: .
captcha