আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): মহাদেশব্যাপী মাহদীভিত্তিক বিশ্বশান্তি: আন্তর্জাতিক সম্পর্কের যুদ্ধাসক্ত নীতির প্রতি এক জবাব
বিশ্ব আজ নৈতিক সংকট ও যুদ্ধাসক্তির জালে জড়িয়ে আছে। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতালিপ্সা, মিথ্যা মানবাধিকার প্রচার এবং অস্ত্রবাণিজ্যের উন্মাদনা সভ্যতাকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। ঠিক এই অন্ধকার যুগে ‘মাহদাভীয়্যাত’ ধারণা শুধু এক স্বপ্ন নয়, বরং এক রূপরেখা — যা মানবতাকে ন্যায়ভিত্তিক শান্তির দিকে নিয়ে যায়। এই আশাই নিজেই প্রতিরোধের জ্বালানি।
বিশ্বব্যাপী আধিপত্যবাদ: অস্থিরতার মূল শিকড়; আধুনিক বিশ্বে চলছে ‘সংস্কৃতি-অধিপত্য’র নিষ্ঠুর প্রদর্শনী। মানবতার সেবার নামে বড় বড় শক্তিগুলো নিজেদের অবৈধ স্বার্থে যুদ্ধ জ্বালায়, রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতি লুণ্ঠন করে এবং সমাজে নৈতিক অবক্ষয় ছড়িয়ে দেয়।
ইসলামি শিক্ষায় এটাই ‘ইস্তিকবার’ বা অহংকার ও আধিপত্যবাদ — মানবজাতির প্রকৃত শত্রু।
মাওলা আলি (আ.) বলেছেন:
«إِنَّمَا بَدْءُ وُقُوعِ الْفِتَنِ أَهْوَاءٌ تُتَّبَعُ وَ أَحْکَامٌ تُبْتَدَعُ؛
“ফিতনা তখনই শুরু হয় যখন মানুষ তার নফসকে অনুসরণ করে ও নিজের মতো করে আইন সৃষ্টি করে।”-নাহজুল বালাগা: খুতবা ৫০
আজকের আন্তর্জাতিক অস্থিরতা ঠিক এই হাওয়া ও মনগড়া আইন-এর ফল।
ইস্তিকবার নানা ছদ্মবেশে আত্মপ্রকাশ করে— একতরফা নীতি, অন্যায় নিষেধাজ্ঞা, আক্রমণ ও দখলনীতি, এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে সহায়তা।
ফিলিস্তিন দখলকৃত অঞ্চল এই সংস্কৃতির এক জীবন্ত উদাহরণ; যেখানে নিরস্ত্র মানুষ বছরের পর বছর দমন-পীড়নের শিকার।
ইমাম খোমেইনি (রহ.) এই গণ্ডিকে চিনিয়ে দিয়েছিলেন ও বলেছিলেন: আমেরিকা হচ্ছে শয়তানুল আকবার, আমেরিকা যুদ্ধ ও নৈতিক অবক্ষয়ের মূল উৎস।
পুঁজিবাদী লোভ ও নৈতিক বিপর্যয়; আজকের লিবারেল পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মুনাফা ও ব্যক্তিসুখকে প্রাধান্য দিয়েছে, নৈতিকতা ও মানবতাকে ব্যবসায়ী বুদ্ধির কাছে উৎসর্গ করা হয়েছে। যুদ্ধ এখানে আর অপরাধ নয়; বরং এক লাভজনক বাজার।
ইসলামের গহীন দর্শন দেখায় যে এই সংকট কেবল প্রশাসনিক নয়, বরং আত্মিক ও বিশ্বদৃষ্টির সংকট। যতদিন এই লোভ ও আত্মগর্ব ন্যায়বিচারে পরিণত না হবে, ততদিন সত্যিকার শান্তি আসবে না।
মাহদীভিত্তিক শান্তি: সক্রিয়, ন্যায়ভিত্তিক ও প্রতিরোধশীল শান্তি; অনেকে ভুল করে মনে করেন মাহদীভিত্তিক বিশ্বশান্তি মানে সমর্পণ বা নিষ্ক্রিয়তা। বাস্তবে এটি সক্রিয় ও ন্যায়ের জন্য সংগ্রামমুখী শান্তি। এ শান্তি জন্ম নেয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, অতঃপর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থেকে।
হযরত রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন:
«أَفْضَلُ الْجِهَادِ کَلِمَةُ عَدْلٍ عِنْدَ سُلْطَانٍ جَائِرٍ؛
“সর্বোত্তম জিহাদ সেই বার্তা, যা কোনো জালেম শাসকের সামনে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে বলা হয়।” (সুনান ইবনে মাজাহ, খণ্ড ২, পৃ. ১৩২৭)
তাই ফিলিস্তিন, ইয়েমেন, বাহরাইন বা মিয়ানমারের নিপীড়িতদের পক্ষে দাঁড়ানো, এই শিক্ষার বাস্তব রূপ: সত্যিকারের শান্তির পথে পদক্ষেপ।
ন্যায়-শান্তির মূল ভিত্তি; মাহদীভিত্তিক শান্তির কেন্দ্রে রয়েছে ন্যায়বিচার।এই ন্যায় শুধু রাষ্ট্রের মধ্যে নয়; মানুষের সাথে আল্লাহর, নিজের, অন্যদের ও প্রকৃতির সম্পর্কেও। কুরআনে বলা হয়েছে:
لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَیِّنَاتِ وَأَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْکِتَابَ وَالْمِیزَانَ لِیَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ؛
“নিশ্চয়ই আমরা রাসূল প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণসহ, তাদের সাথে দিয়েছি কিতাব ও মিজান, যেন মানুষ ন্যায়ের সাথে সমাজ গড়ে তোলে।” (সূরা হাদীদ, আয়াত ২৫)
ইমাম মাহদী (আ.ফা.) সেই আয়াতের পূর্ণ প্রতিফলন; যে হুকুমতে একজন মানুষও অবিচারের শিকার হবে না।
ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন:
ذَا قَامَ الْقَائِمُ حَکَمَ بِالْعَدْلِ وَ ارْتَفَعَتِ الْجَوْرُ وَ الْأَذَی وَ أَمِنَتْ بِهِ السُّبُلُ؛
“যখন কায়েম (আ.জ.) উত্থিত হবেন,তিনি ন্যায়ে বিচার করবেন,অন্যায় ও ভয় বিলীন হবে, পথগুলো নিরাপদ হবে।” (কামালুদ্দীন, খণ্ড ১, পৃ. ৩৩০)
ইসলামি ঐক্য: অপেক্ষার সমাজের ভিত্তি ও মহাজাগরণের পূর্বশর্ত; আন্তর্জাতিক শান্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা বিভেদ ও বিভাজন। শত্রুরা এতো চতুর যে তারা মুসলিমদের মতভেদ ও গৌরববোধকে অস্ত্র বানিয়েছে।
কুরআনের আহ্বান স্পষ্ট:
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِیعًا وَلَا تَفَرَّقُوا؛
“তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো, বিচ্ছিন্ন হবো না।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১০৩)
এই ‘রজ্জু’ আজকের যুগে হলো; আহলে বাইত (আ.)-এর অভিভাবকত্ব এবং প্রতিশ্রুত ত্রাণকর্তার প্রত্যাবর্তনের প্রত্যাশা সকল মুসলমানের ঐক্যের অক্ষ ।
প্রত্যাশার সংস্কৃতি আমাদের শেখায়; মর্যাদাপূর্ণ সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা, তাওহীদ, নবুয়ত, কুরআন, কাবা এবং এক সার্বজনীন মুক্তিদাতার প্রতীক্ষা—
এই পাঁচটি পারশপারিক বিশ্বাস ইসলামি ঐক্যের। ইমাম খোমেইনি (রহ.) মুসলমানদের ঐক্যের পতাকা উঁচু করেছিলেন। আল-কুদস দিবস স্থাপন করেছিলেন, যেখানে সমগ্র মুসলিম জগৎ এক মুখে সিহিওনিজম ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। উন্নত জ্ঞানের সমন্বয়, আন্তর্মবি সম্মেলন,এবং চরমপন্থা পরিহার,এই তিনটি হলো মাহদি-বিশ্বশান্তির পথের বাস্তব পদক্ষেপ।
কৌশলগত আশা: অন্ধকার যুগে প্রতিরোধের চালিকা শক্তি; যখন আধিপত্যবাদী গণমাধ্যম যুগান্তকারী হতাশার বার্তা ছড়াচ্ছে, যেন মানবতার ভবিষ্যৎই বিলীন হয়ে যায় এবং মানুষ নিঃশব্দে আত্মসমর্পণ করে, সেই মুহূর্তে মাহদিয়্যাতের সংস্কৃতি তার সবচেয়ে বড় সম্পদ তুলে ধরে “আশা”।
এই আশাটি কোনো কল্পনাধর্মী, আবেগী প্রত্যাশা নয়; এটি হলো কৌশলগত আশা, যা আল্লাহর অবশ্যম্ভাবী প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে গঠিত।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন:
وَنُرِیدُ أَن نَّمُنَّ عَلَی الَّذِینَ اسْتُضْعِفُوا فِی الْأَرْضِ وَنَجْعَلَهُمْ أَئِمَّةً وَنَجْعَلَهُمُ الْوَارِثِینَ؛
“আমরা ইচ্ছা করেছি পৃথিবীর অত্যাচারিতদের অনুগ্রহ করতে এবং তাদের ইমাম ও পৃথিবীর উত্তরাধিকারী করতে” (সূরা আল-কাসাস, আয়াত ৫)
এই ঐশী প্রতিশ্রুতি বিশ্বাসীদের অন্তরে অটল আশাবাদ ও বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি স্থাপন করে।
আশা: ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের শক্তি; এই আশাই সৃষ্ট করে সৃজনশীলতা, অধ্যবসায় ও প্রতিরোধের অনুপ্রেরণা। যে সমাজ উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিশ্বাস করে, সে সমাজ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত, ধৈর্য ধারণে সক্ষম এবং সংগ্রামে দৃঢ়। এটি একেবারে বিপরীত ভোগবাদী সংস্কৃতি ও তাৎক্ষণিক আনন্দলিপ্সার — যা আধিপত্যবাদ মানুষকে শেখাতে চায়।
ইন্তেযার-ই-ফারাজ (মুক্তির প্রতীক্ষা) বিশ্বাসীর জীবনকে লক্ষ্য ও অর্থ দেয়; কষ্ট ও বিপদকে অর্থবহ করে তোলে।
ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন:
إِنَّ لِقَائِمِنَا غَیْبَةً یَطُولُ أَمَدُهَا... فَلْیَتَّقِ اللَّهَ عِبَادُهُ وَ لْیَتَمَسَّکُوا بِدِینِهِمْ... فَإِنَّهُ لَا بُدَّ لِصَاحِبِ هَذَا الْأَمْرِ مِنْ غَیْبَةٍ؛
“আমাদের কায়েমের একটি দীর্ঘ গায়েবত থাকবে… তাই ঈশ্বরভীরু হও, ধর্ম আঁকড়ে ধরো… কারণ এই আদর্শের মালিকের জন্য অবশ্যই একটি গায়েবত নির্ধারিত আছে।” (কমালুদ্দীন ও তামামুন-নেমাহ, খণ্ড ২, পৃ. ৩৫৮)
এই গায়েবতের যুগে ধর্মে দৃঢ় থাকার শক্তি কেবল তখনই টিকে থাকে, যখন হৃদয়ে আশা জীবিত থাকে।
মাহদীভিত্তিক আশার দূরদৃষ্টি- রাজনীতির সীমানা ছাড়িয়ে মানুষত্বে উত্তরণ; মাহদীভিত্তিক আশা আমাদের চেতনা ও কর্মকে ছোট রাজনীতির বাইরে নিয়ে যায়, যুদ্ধাসক্ত প্রচার বা হতাশার বিষ থেকে মুক্ত করে।
আমরা যখন বিশ্বাস করি, ইতিহাসের শেষ অধ্যায় ন্যায়প্রিয় নিপীড়িতদের হাতেই সমাপ্ত হবে, তখন আধিপত্যবাদী শক্তির অস্থায়ী ক্ষমতা আমাদের ভীত করতে পারে না।
এই আশাই আজ প্রতিরোধের কৌশল নির্মাণ করে যেখানে বিশ্বাসী জানে, আজ সংখ্যা কম হলেও বিজয় চিরস্থায়ী হবে। যেমন সূর্য উদয়ের আগে দীর্ঘ অন্ধকার থাকে, তেমনি প্রতীক্ষা ও প্রতিরোধও উদয়-পূর্ব আলো। এই উপলব্ধি বিশ্বাসীকে বদলে দেয়,তাকে পরিণত করে সাহসী, আদর্শনিষ্ঠ, ধৈর্যশীল সৈনিক, যে চলেছে ইউসুফে যাহরা (আ.ফা.)-এর বাহিনীর পথে।
প্রতীক্ষা: ইতিহাসের অন্ধকারতম পথে একটি আলোকবর্তিকা; মাহদী-বিশ্বশান্তি কোনো কল্পনা নয়, বরং এক বাস্তব গন্তব্য যেদিকে মানবতা, অবচেতনভাবে বা সচেতনভাবে, দুঃখ-অত্যাচারের বিরুদ্ধে অগ্রসর হচ্ছে।
মাহদিয়্যাতের শিক্ষা আমাদের দেয় এক বিস্তৃত বিশ্লেষণ ও পূর্ণাঙ্গ পথচিত্রঃ
-
সংকটের মূল উৎস: ইস্তিকবার (আধিপত্য ও অহংকার)
-
শান্তির রূপরেখা: ন্যায়ভিত্তিক ও সক্রিয় শান্তি
-
বাস্তব পথনির্দেশ: ইসলামি ঐক্য ও সহযোগিতা
-
চালিকা শক্তি: কৌশলগত আশা
এই চারটি স্তম্ভই মিলে যায় —নৈতিক পতন ও যুদ্ধের সংস্কৃতির বিপরীতে মানবজাতির সবচেয়ে গভীর ও যুক্তিসম্মত উত্তর হিসেবে।
সক্রিয় প্রতীক্ষা: আমাদের বর্তমান দায়িত্ব
আমাদের কাজ শুধু বসে থাকা বা অপেক্ষা করা নয়। প্রতীক্ষা মানে কর্ম, সচেতন প্রস্তুতি। এটি সেই আহ্বান “বিশ্বকে এই মুক্তিদায়ক ভাবধারা চিনিয়ে দাও; নিপীড়িতদের পক্ষে দাঁড়াও; ঐক্য ও আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠা করো।” আমরা যখন ন্যায় ও নৈতিকতার ভিত্তিতে ক্ষুদ্র সমাজ নির্মাণ করি, তখন আমরাই আসলে জাহানভর মাহদী (আ.ফা.)-এর আগমনের পথে পা রাখি।
মোহাম্মদ হুসাইন আমিন / ইসলামি চিন্তাবিদ ও গবেষক
Your Comment