২৪ আগস্ট ২০২৬ - ২২:০০
ফিলিস্তিনকে মুছে দিচ্ছে ইসরাইল

একশরও বেশি সাবেক ফরাসি ও ব্রিটিশ কূটনীতিক বলেছেন, বিশ্বের চোখের সামনেই ফিলিস্তিনকে মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে।

আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, এক নজিরবিহীন যৌথ চিঠিতে প্রথাগত কূটনৈতিক ভাষা পরিহার করে ইসরাইলের বিরুদ্ধে জাতিগত নির্মূল অভিযানের অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে সতর্ক করা হয়, বিশ্ব এখন আর ইসরাইলকে প্রকৃত গণতন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করছে না।

আধুনিক মধ্যপ্রাচ্য গঠনে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করে কূটনীতিকরা বলেন, উভয় দেশই ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাদের যুক্তি, মধ্যপ্রাচ্যের মৌলিক সংকট—অর্থাৎ ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনিদের সমান অধিকারের প্রশ্নে একজোট হয়ে কাজ করা এখন যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের দায়িত্ব।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের কাছে পাঠানো এ চিঠিতে ৫২ জন সাবেক ফরাসি কূটনীতিক এবং ৫০ জন সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত সই করেছে। তাদের অনেকেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ—যেমন মিসর, ইরান, বাহরাইন, ইসরাইল, সিরিয়া, তুরস্ক, কুয়েত, সৌদি আরব ও কাতারে—উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে।

ব্রিটেনের দ্য গার্ডিয়ান এবং ফ্রান্সের ল্য মঁদ পত্রিকায় হস্তান্তর করা চিঠিটি এমন সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স আরও নয়টি দেশের সঙ্গে মিলে ইসরাইলের ‘ই-১’ বসতি প্রকল্পের নির্মাণকাজের দরপত্র আহ্বানের নিন্দা জানিয়েছে। 

তারা বলেছে, প্রস্তাবিত এ আবাসন প্রকল্প ‘ইসরাইলকে শান্তি প্রক্রিয়া থেকে আরও দূরে সরিয়ে নেবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবে’।

ওই যৌথ বিবৃতিতে কোনো কঠোর পরিণতির স্পষ্ট হুমকি দেওয়া হয়নি। তবে নিজ নিজ দেশের ব্যবসায়ীদের দরপ্রক্রিয়ায় অংশ না নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। কারণ, একটি অবৈধ বসতি নির্মাণে বিনিয়োগের ফলে আইনি জটিলতা ও সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড পশ্চিম তীরকে দ্বিখণ্ডিত করে ১ হাজার ২০০টি বাড়ি নির্মাণের জন্য আহ্বান করা দরপত্রকে ‘দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কার্যকারিতার জন্য এক ধ্বংসাত্মক হুমকি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। পাশাপাশি যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত ইসরাইলের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ড্যানিয়েলা গ্রুডস্কি একস্টিনকে তলব করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

কূটনীতিকদের আশা, তাদের এ চিঠি ম্যাক্রোঁ ও বার্নহ্যামের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে, যাতে ‘দ্বিরাষ্ট্র সমাধান’ প্রক্রিয়াটি টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে ইসরাইলের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

গাজা থেকে ইসরাইলের সরে আসার শর্তাবলি নিয়ে কূটনৈতিক বিষয়টি মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং ইসরাইলের মধ্যকার আলোচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে ইসরাইল গাজাবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সর্বশেষ ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মুসলিম মিত্র আটটি মুসলিম দেশ এর সমালোচনা করেছে। 

তারা বলেছে, ইসরাইলের এসব পদক্ষেপ একটি ন্যায়সংগত ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি অর্জনের সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে মৌলিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

সাবেক কূটনীতিকদের যুক্তি, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার যে পদক্ষেপটি অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল, তা এখন জরুরি পদক্ষেপের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দেওয়া প্রয়োজন। 

কারণ, ইসরাইল সরকার আইন, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায় এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অসংখ্য প্রস্তাবকে অবজ্ঞা করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের যেকোনো সম্ভাবনা ধ্বংস করার চেষ্টা করছে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, গাজায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনিকে তাদের বিধ্বস্ত ভূখণ্ডের মাত্র ৩০ শতাংশ এলাকায় অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। তারা ক্ষুধার্ত এবং তাদের ওষুধ ও বাসস্থানের অভাব রয়েছে। তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’র পর থেকে ১ হাজার ২০০-এরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

পূর্ব জেরুজালেম এবং পশ্চিম তীরের অন্যান্য অংশে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং ইসরাইলি সেনাবাহিনী ও পুলিশের যোগসাজশে বসতি স্থাপনকারীদের ব্যাপক সহিংসতা জাতিগত নির্মূল অভিযানের শামিল বলেও দাবি করেন কূটনীতিকরা।

তারা বলেন, ‘আমাদের চোখের সামনেই ফিলিস্তিনকে মুছে ফেলা হচ্ছে।’ এটি মানবতার বিবেকে এক কলঙ্ক। এ পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

Tags

Your Comment

You are replying to: .
captcha