রেডিও তেহরানের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা আবনার রিপোর্ট : লিবিয়ার সাবেক স্বৈরশাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফি নিহত হওয়ার পর বেশ কিছু বিষয় নিয়ে অস্পষ্টতা সৃষ্টি হয়েছে। তার মৃত্যুর জন্য দায়ী কে কিংবা কার গুলিতে তিনি নিহত হয়েছেন তা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। গাদ্দাফির হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা থেকে এক নাটকীয় চিত্র পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে না হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত অনেক প্রশ্নের জবাব। অবশ্য, প্রায় সব সূত্রই বলেছে, গাদ্দাফি গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। কিন্তু, কে গুলি করেছে তাকে? আর গাদ্দাফিকে জীবিত হাতে পেয়ে কেনই বা তাকে গুলি করা হলো? কিংবা বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলো না কেন-এমন সব প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
এর মাঝে আল-জাজিরা টেলিভিশন চ্যানেল গাদ্দাফির নিহত হওয়ার ঘটনাক্রম তুলে ধরেছে এভাবে-বৃহস্পতিবার ফজরের নামাজের কিছুক্ষণ পরই গাদ্দাফি সির্ত শহরের বাইরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন। কয়েক ডজন দেহরক্ষী নিয়ে তিনি বের হয়ে পড়েন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক প্রধান আবু বাক্র ইউনুস জাব্র। লোকচক্ষুর আড়াল থেকে বের হয়ে তিনি সোজা পশ্চিম দিকে রওয়ানা হন। সঙ্গে ১৫টি ট্রাকের সশস্ত্র গাড়ি বহর। কিন্তু বেশি দূর তিনি যেতে পারলেন না। হঠাৎ কোথা থেকে ন্যাটোর জঙ্গীবিমান উড়ে এসে হামলা চালালো তার সামরিক বহরের ওপর। অবশ্য, ন্যাটো বলেছে, সকাল সাড়ে আটটার দিকে তাদের একটি বিমান থেকে গাদ্দাফির সামরিক বহরের ওপর হামলা চালায়। ফরাসি প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিরার্ড লংগেত পরে এ হামলার কথা নিশ্চিত করে বলেছেন, ফরাসি বিমানবাহিনী ১৫টি ট্রাকের ওপর হামলা চালায় এবং এতে গাদ্দাফির ৫০ জন সঙ্গী নিহত হয়। গাদ্দাফি এবং তার কয়েকজন সঙ্গী নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পান। এরপর তিনি দৌড়ে গিয়ে একটি পয়ঃনিষ্কাশন ড্রেনে লুকান। অন্য সঙ্গীরাও ড্রেনের নিচে লুকিয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু, ভাগ্য মন্দ! তারা খুব দ্রুত বিপ্লবী যোদ্ধাদের চোখে পড়ে যান।
এ অবস্থায় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চলে আসেন গাদ্দাফি। এ সম্পর্কে এনটিসি'র বিপ্লবী যোদ্ধা সালেম বাকের জানিয়েছেন, "প্রথমে আমরা বিমান বিধ্বংসী কামান দিয়ে গুলি চালায়। কিন্তু তাতে কাজ হচ্ছিল না। তারপর আমরা পায়ে হেঁটে সেখানে যাই। এ সময় গাদ্দাফির এক বন্দুকধারী রাইফেল উঁচিয়ে আমাদের আত্মসমর্পণের জন্য চিৎকার করতে থাকে। এরপর সে আমার মুখ দেখা মাত্রই গুলি করতে শুরু করে। এ সময় আমি মনে করলাম, গাদ্দাফি নিশ্চয় তার লোকদের গুলি বন্ধ করতে বলবেন। ভেতর থেকে কেউ একজন চিৎকার করে বলল, আমার মনিব এখানে আছেন। মুয়াম্মার গাদ্দাফি এখানে এবং তিনি আহত। এরপরই আমরা ভেতরে গেলাম এবং গাদ্দাফিকে বের করে আনলাম। গাদ্দাফি বললেন, আমি কি অন্যায় করেছি? আমার ভুল কি? এসব কি হচ্ছে? তারপর আমরা তাকে গাড়িতে তুললাম। গাদ্দাফিকে ধরার সময়ই তিনি গুলিতে আহত হয়েছিলেন।" গাদ্দাফির পায়ে ও পিঠে গুলি লেগেছিল-জানিয়েছেন বিপ্লবী যোদ্ধা বাকের। তাকে আটককারীদের মধ্যে কেউ কেউ এ সময় চিৎকার করে বলেছিলেন, "তাকে বাঁচিয়ে রাখো, তাকে বাঁচিয়ে রাখো।" ভিডিওতে এরপর গাদ্দাফি দৃষ্টির আড়ালে চলে যান এবং গুলির শব্দ শোনা যায়।
গাদ্দাফিকে ধরার মিশনে অংশ নেয়া অন্য একজন বিপ্লবী যোদ্ধা জানিয়েছেন, গাদ্দাফি তার নিজের লোকের হাতেই শেষ মুহূর্তে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। ওমর জুমা নামে এ যোদ্ধা জানান, গাদ্দাফির এক দেহরক্ষী গাদ্দাফির বুকে গুলি করেছে। ভিডিও ফুটেজেও দেখা গেছে- গাদ্দাফি জীবিত অবস্থায় ধরা পড়েছিলেন। তবে, গাদ্দাফির দেহরক্ষীদের সবাই নিহত হয়েছেন।
গাদ্দাফিকে ধরার পর মিসরাতা শহরে নেয়ার জন্য তাকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, আহত গাদ্দাফি পথেই মারা যান।
যাহোক, লিবিয়ার জাতীয় অন্তর্বর্তী পরিষদ বা এনটিসির প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ জিবলির গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, "গাদ্দাফিকে যখন অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয় তখন তিনি মারাত্মক আহত ছিলেন না। কিন্তু গাড়িতে তোলার পর ক্রসফায়ারে তিনি মারা যান।"
জিবরিল বলেন, "গাদ্দাফিকে একটি স্যুয়ারেজ পাইপলাইন থেকে বের করা হয়েছে। এ সময় তিনি কোনো বাধা দেননি। যখন তাকে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছিল তখন তিনি ডান হাতে গুলিবিদ্ধ হন এবং যখন তাকে একটি ট্রাকে তোলা হয় তখন তার আর কোনো ক্ষত ছিল না।" মাহমুদ জিবরিল বলেন, "ফরেনসিক ডাক্তারও বলতে পারবেন না এটা বিপ্লবীদের গুলি নাকি তার যোদ্ধাদের গুলি। তিনি জানান, হাসপাতালে নেয়ার পর কয়েক মিনিট পর গাদ্দাফি মারা যান। এরপর কি হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। এক পর্যায়ে তার মৃতদেহ নিয়ে একটি গাড়ি অজ্ঞাত স্থানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। নিরাপত্তা কারণে তার লাশ গোপন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়।
কিন্তু লক্ষণীয় হলো- যে গাদ্দাফি তার প্রতিপক্ষ বিপ্লবী যোদ্ধাদেরকে প্রায়ই গর্তের ইঁদুর, তেলাপোকা কিংবা রাস্তার কুকুর বলতেন সেই গাদ্দাফি জীবন বাঁচাতে গর্তের ভেতরে লুকিয়েছিলেন। এ সম্পর্কে বিপ্লবী যোদ্ধারা বলেছেন, "তিনি আমাদেরকে ইঁদুর বলতেন। কিন্তু, এখন দেখুন আমরা তাকে কোথায় পেলাম।"#