আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা আবনার রিপোর্ট : লিবিয়ার সমস্ত সম্পদের অধিকার হয়ে লিবিয়ার উপর দীর্ঘ ৪২ বছর শাসন করার পর কর্নেল গাদ্দাফী নিজের জীবনের শেষ দিনগুলোতে ভাত এবং ম্যাকারোনী খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করতেন। তার সমর্থক ও রক্ষীরা অন্যের বাড়ী হতে চুরী করে নিয়ে আসতো এবং ঐ সকল বাড়ীর লোকজন কর্নেলের সমর্থকদের ভয়ে বাড়ী ছেড়ে পালিয়ে যেত।
*গাদ্দাফী যে পরিস্থিতির মাঝে জীবন যাপন করতেন, সে সম্পর্কে তিনি বেখবর ছিলেন
গাদ্দাফী’র রক্ষী বাহিনী’র প্রধান ‘মানসুর আল দ্বোও ইবরাহিম’, সিরতে গাদ্দাফী’র গোপনে জীবন-যাপন সম্পর্কে বলেছেন : যখন সিরতে এক বাড়ী হতে আরেক বাড়ী, এক এলাকা হতে আরেক এলাক পলায়ন করতাম এবং শহর বিপ্লবীদের দ্বারা ঘেরাও ছিল, তখন আমরা পানি ও বিদ্যুত সংকটে ছিলাম। এমতাবস্থায় মনে হত গাদ্দাফী অন্য দুনিয়ায় সফর করছে এবং সে সব কিছু সম্পর্কে বেখবর। বারংবার জিজ্ঞেস করত পানি নেই কেন? বিদ্যুত নেই কেন?
* শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ক্ষমতার মোহে ভুগেছিলেন
গাদ্দাফীর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি তার পাশে ছিলেন, তিনি বলেন : সিরতে ঘেরাও থাকা অবস্থায় আমরা কর্নেল ও মো’তাসিমকে বারংবার বলেছি যে, ক্ষমতাকে ছেড়ে চলুন আমরা দেশ ত্যাগ করি এবং নিজেদের জীবন বাঁচাই। কিন্তু সে এবং তার পুত্র কখনই এ কথা মানেনি এবং ক্ষমতা ছাড়ার কথা ভাবেনি।
*গাদ্দাফী একটি গুলিও চালান নি
আল দোও বলেন : যদিও তার সমর্থকরা প্রচার করতো যে, তিনি বিপ্লবীদের সাথে যুদ্ধ করছেন এবং সর্বদা নিজের বাণীতে তার সমর্থকদের এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করতো, কিন্তু তিনি কখনো বিপ্লবীদের উদ্দেশ্যে একটি গুলিও চালান নি।
*গাদ্দাফী, ন্যাটোকে প্রচণ্ড ভয় পেত
গাদ্দাফী’র অতি কাছের লোক আল দোও বলেন : গাদ্দাফী, ন্যাটোকে প্রচণ্ড ভয় পেত। যখন তারা সিরতে আসে তখন তারা ন্যাটো ও বিপ্লবীদের হামলা মোকাবেলার জন্য সাধারণ জনগণকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতো, তারা রাতের আঁধারে ঐ শহরের বাসিন্দাদের মেয়েদেরকে অপহরণ করতো, যাতে অপহৃত ঐ মেয়েদের পরিবার শহর ত্যাগ করতে না পারে।
*আল মো’তাসিমই মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতো
তিনি বলেন : কি করতে হবে বা কি করা যাবে না এ বিষয়ে গাদ্দাফী সিদ্ধান্ত নিতেন না, বরং মূল সিদ্ধান্ত নিত মো’তাসিম। সেই সিরতের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
গাদ্দাফী তার ১০ জন সাথী ও উপদেষ্টাকে নিয়ে সিরতের উদ্দেশ্যে রওনা হয় এবং যেহেতু মো’তাসিমের মোবাইল ছিল স্যাটালাইট মোবাইল তাই সে তার পিতা ও তার সাথীদেরা যাতে চিহ্নিত না হয় সে জন্য অন্য পথ ধরে অগ্রসর হয়। গাদ্দাফী’র সাথে শুধুমাত্র একটি মোবাইল ছিল, যেটাকে তিনি আল-রা’য় চ্যানেলে নিজের বাণী প্রেরণ করার কাজে ব্যবহার করতেন, আর যোগাযোগের জন্য গাদ্দাফী’র নিকট ওটাই ছিল একমাত্র উপায়। বহির্বিশ্বের সাথে তার যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল।
*বিপ্লবীদের সাথে যুদ্ধকে গাদ্দাফী মাযহাবগত যুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করতেন
আল দোও আরো বলেন : বিপ্লবীদের সাথে তার যুদ্ধকে গাদ্দাফী মাযহাবের যুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করতেন। তার মতে এ যুদ্ধের এক পক্ষে ছিল মুসলমানরা ও তাদের সমর্থকরা এবং অন্য পক্ষে ছিল বিপ্লবীরা, যাদেরকে পশ্চিমা বিশ্ব সহযোগিতা করছিল।
তিনি বলেন : বিদ্রোহের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা হস্তান্তর বা ক্ষমতা হতে সরে দাঁড়ানোর ব্যাপারে গাদ্দাফী কখনও বিপ্লবীদের সাথে কথা বলেনি। যখনই এ বিষয়ে তার সাথে কথা বলতাম তিনি বলতেন যে, ১৯৭৭ সাল থেকে ক্ষমতাকে জনগণের হাতে ছেড়ে দিয়েছি। বলাবাহুল্য যে, গাদ্দাফী’র পুত্ররা ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন ও তা ধরে রাখার বিষয়ে চিন্তা করতো, কিন্তু গাদ্দাফী করতো না।
*সিরতে দু’টি বাড়ীতে আত্মগোপন করে থাকতেন
আল দোও বলেন : বিপ্লবীদের কর্তৃক সিরতে শহরের উপর নিয়ন্ত্রন লাভের পর দুই সপ্তাহ পূর্বে গাদ্দাফী ও তার পুত্র ঘেরাও অবস্থায় ছিল। তারা অবস্থানের জন্য আল সানিয়াহ অঞ্চলের দু’টি বাড়িকে বেছে নেন এবং তারা কিছু সময় একটি বাড়ীতে পূনরায় অপরবাড়ীতে স্থানান্তরিত হতেন। নির্দেশ এমন ছিল যে, মারা যাব অথবা জীবিত থাকবো।
*মধ্যরাতে শহর ছাড়ার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়, কিন্তু গাদ্দাফী সমর্থকদের অদক্ষতা আমাদের জন্য বিপদ ডেকে আনে
কর্নেলের পলায়নের ব্যাপারে তিনি বলেন : বৃহস্পতিবার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, আমাদের ৪০টি গাড়ীর বহর রাত ৩টার সময় সিরতে শহর ত্যাগ করবে। কিন্তু গাদ্দাফী সমর্থকদের অদক্ষতা ও সঠিকভাবে পরিকল্পনার অভাবে আমাদের বের হতে হতে সকাল ৮টা বেজে যায়। ৮ টার সময় বের হওয়ার পর মাত্র আধা ঘন্টার মধ্যেই আমরা বিপ্লবীদের দ্বারা ঘেরাও হয়ে যাই। পথে গাদ্দাফী কোন কথা বলেননি, তার টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজে আমি এবং গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান ও তার অপর একজন আত্মীয় ছিল।
আল দোও বলেন : ন্যাটো কর্তৃক গাদ্দাফী’র বহর হামলার শিকার হওয়ার পর আমি, গাদ্দাফী এবং তার সাথে থাকা পুরুষেরা পালানোর চেষ্টা করি। এ কারণেই আমরা ময়লার ড্রেনকে বেছে নেই। পলায়নের সময় আমার গায়ে গুলি লাগে এবং আমি জ্ঞান হারাই। যখন আমার সংজ্ঞা ফিরে আসে তখন বুঝতে পারি যে, গাদ্দাফী গ্রেপ্তার ও নিহত হয়েছেন।#