বার্তা সংস্থা আবনা : বুধবার ধসে পড়া ওই ভবন থেকে বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে আরও ৭৬টি লাশ। বিধ্বস্ত ওই ভবন থেকে এ পর্যন্ত ২৩৯টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। জীবিত অবস্থায় এখন পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছেন দেড় হাজারেরও বেশি।
বৃহস্পতিবার ৯ তলা ওই ভবনের ৫ তলা পর্যন্ত ছাদের অংশবিশেষ সরিয়ে ফেলায় বিভিন্ন ফ্লোরে লাশ পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। ভাঙা ছাদের ফাঁকা দিয়ে বৃহস্পতিবার উঁকি মেরে দেখা গেছে অনেক লাশের ছিন্নভিন্ন অংশ। বাকি চারটি ফ্লোর মাটির নিচে দেবে যাওয়ায় সেখানে আর কাউকে জীবিত উদ্ধারের আশা করছেন না উদ্ধারকর্মীরা। যদি কেউ বেঁচে থাকেন তা হবে অলৌকিক। ধসের সময় কত লোক ছিল ভেতরে তা কেউ ধারণা করতে পারছেন না। তবে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক আলী আহমেদ খান জানিয়েছেন, ভবনে তিন হাজারেরও বেশি লোক ছিল।
রানা পাজার মালিক স্থানীয় যুবলীগ নেতা সোহেল রানার ফাঁসির দাবিতে বৃহস্পতিবার মিছিল করেছেন স্থানীয় হাজার হাজার মানুষ। বৃহস্পতিবার বিকালে ঘটনাস্থলে আসেন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সাদেক হোসেন খোকা, বরকত উলাহ বুলু, আবদুল মান্নান, সেলিমা রহমান। ৫টা ৩৫ মিনিটে তিনি ঘটনাস্থলে এসে ১২ মিনিট অবস্থান করেন। পরে তিনি এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আহতদের দেখতে যান। সেখানে তিনি ১৫ মিনিট ধরে চিকিত্সারতদের খোঁজখবর নেন। এছাড়া বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থলে আসেন সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী প্রধান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এবি তাজুল ইসলাম, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু, জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় চিফ হুইপ অধ্যক্ষ আবদুস শহীদ, জাতীয় পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার, প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর আহমদ, জিয়াউদ্দিন বাবলু, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, সাবেক মন্ত্রী তাজুল ইসলাম চৌধুরী। এ সময় তাদের সঙ্গে ছিলেন সাভার থানা জাতীয় পার্টির সভাপতি এসএম ইয়াকুব আলীসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
এদিকে বৃহস্পতিবারও ধসে পড়া ওই ভবনে আটকে পড়াদের উদ্ধারে ‘ধীরগতির’ অভিযোগ এনেছেন সাধারণ মানুষ। তবে উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্বে থাকা সাভার নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী বলেছেন, তারা চেষ্টার কোন ত্র“টি নেই। প্রথমে তারা জীবিতদের বের করে আনার চেষ্টা করছেন। ভারি যন্ত্রপাতি ব্যবহারে আটকেপড়াদের প্রাণহানির শঙ্কা থাকায় তারা ভেবেচিন্তে কাজ করছেন। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া রানা পাজায় অবস্থিত পাঁচটি গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ স্থগিত করেছে তৈরি পোশাক নির্মাতাদের সংগঠন বিজিএমইএ। এছাড়া হাইকোর্ট ৩০ এপ্রিলের মধ্যে ভবনের মালিক আবদুল খালেক ও তার ছেলে সোহেল রানা এবং ওই ভবনের পাঁচ গার্মেন্ট কারখানা মালিকদের হাজির হতে বলেছেন।
বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পুলিশ কন্ট্রোল রুমের হিসাবেই নিখোঁজের তালিকায় ছিলেন দুই শতাধিক। তবে বিভিন্ন সূত্রের আশংকা, এ সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। বৃহস্পতিবারের পর উদ্ধার হওয়া লাশ বা লাশের অংশবিশেষ উদ্ধার হলেও তাদের পরিচয়টুকুও পাওয়া সম্ভব হবে না বলে ধারণা করছেন উদ্ধারকর্মীরা। বুধবারের ঘটনার পর থেকে ঢাকা-সাভার সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। ধ্বংসস্তূপ অপসারণে সেনা, নৌবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ছাড়াও যোগ দিয়েছে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সংস্থা। রেড ক্রিসেন্ট, স্কাউট, রোভার স্কাউট ছাড়াও হাজার হাজার মানুষ উদ্ধার কাজে অংশ নিয়েছেন। অনেকে নিজ বাড়ি থেকে শাবল, হাতুড়ি, গাইতি এনে স্বেচ্ছাশ্রমে উদ্ধার কাজে অংশ নিয়েছেন।
উদ্ধার কাজ : বুধবার সকালে ধসে পড়া ভবনের ভাঙা ছাদ বেঁধে ক্রেন দিয়ে টান দিলেই তার নিচ থেকে উদ্ধার হচ্ছে লাশ। তবে ছাদ কাটতে দেরি হওয়ায় উদ্ধার কাজ এগুতে পারছে না। উদ্ধার কর্মীরা বলেছেন, শরীরের শক্তি দিয়ে এসব কাজ হয় না। তবুও ৩০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। উদ্ধার কাজে নিয়োজিতরা বলেছেন, নিচের তলাগুলো মাটিতে দেবে যাওয়ায় উদ্ধার বিলম্ব হচ্ছে। ভবনটির চার পাশে রাস্তা না থাকায় অনেক বুলড্রেজার, ক্রেন, স্কেভেটর অকেজো পড়ে আছে। ভবনের পেছনের দিকে বাড়তি একটি রাস্তা তৈরি করতে হচ্ছে। উদ্ধারকর্মীরা বলেছেন, এসব গুছিয়ে আনার ফলে এখন কাজ ত্বরান্বিত হবে। তাদের ধারণা, উদ্ধার কাজ শেষ হতে আরও দু-তিন দিন সময় লাগবে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, কাজের যে গতি তাতে এক সপ্তাহেও উদ্ধার কাজ সম্পন্ন করা যাবে না। সেনা কন্ট্রোল রুম সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ভবনের ভেতরে ৩০ ভাগ, উত্তরে ৩৫ ভাগ এবং দক্ষিণাংশে ২৫ ভাগ কাজ হয়েছে। বিধ্বস্ত ভবনের কোন অংশে লাশের সংখ্যা বেশি তা এখনও নির্ণয় করা যায়নি। উদ্ধারকর্মীরা বলেছেন, এক্ষেত্রে গার্মেন্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা এবং ভবনের ম্যাপ সবচেয়ে জরুরি। কিন্তু তার একটিরও খোঁজ মেলেনি। কাজ চলছে অনুমাননির্ভর। ফায়ার সার্ভিস, বিভিন্ন সংস্থা ও স্বেচ্ছাশ্রমে কয়েক হাজার মানুষ ছাড়াও সেনাবাহিনীর ১২শ’ সদস্য দিনে-রাতে উদ্ধার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল চৌধুরী হাসান সোহরাওয়ার্দী নিজে উদ্ধার কাজ তদারকি করছেন।
লাশের সংখ্যা বাড়ছে : বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত গত দু’দিনে উদ্ধার করা হয়েছে ২২৮টি লাশ। বুধবার সকালে দুর্ঘটনার পর ওই দিন রাত ১টা পর্যন্ত ১৩৮টি লাশ উদ্ধার করা হয়। বুধবার উদ্ধার করা হয়েছে আরও ৭৫টি লাশ। এ সময় ধসে পড়া ভবনের ৫ তলা থেকে অর্ধশতাধিক নারী ও পুরুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। ভবনের ভাঙা ছাদ দিয়ে আরও লাশ পড়ে থাকতে দেখা গেলেও ছাদ অপসারণের আগ পর্যন্ত তা উদ্ধার করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন উদ্ধারকর্মীরা। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত উদ্ধার কাজ চলেছে ৪ ও ৫ তলায়। এ দুটি ফ্লোরে দুর্ঘটনার সময় সবচেয়ে বেশি লোক ছিল বলে ধারণা করছেন উদ্ধার কর্মীরা। ধারণা করা হচ্ছে, নিচতলায় উদ্ধার কাজের সময় প্রচুর লাশ পাওয়া যাবে। তবে প্রচণ্ড গরমে এবং দীর্ঘ সময় ক্ষেপণের ফলে সেই লাশগুলো পচে-গলে একাকার হয়ে যাবে।