বার্তা সংস্থা আবনা : সাভারে অভিশপ্ত রানা পাজা ঘিরে স্বজনদের কান্না থামছে না। ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা প্রিয়জনকে জীবিত কিংবা মৃত পেতে অধীর আগ্রহে রয়েছেন তাদের স্বজনরা। এর মধ্যেই রোববার সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে ধ্বংসস্তূপ সরাতে শুরু হয় ভারি যন্ত্রের ব্যবহারের মাধ্যমে ‘ম্যাসিভ অপারেশন’। ভবনটির পেছনে পূর্বদিকের অংশে এ অভিযান শুরু হয় বলে নিশ্চিত করেন সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের ৩ নম্বর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের উপ-অধিনায়ক মেজর মোয়াজ্জেম হোসেন। বিধ্বস্ত ভবনের ওই অংশে আর কারও বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই এটা নিশ্চিত হওয়ার পরই অপারেশন শুরু হয় বলে তিনি জানান। তবে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীদের আপত্তির মুখে দ্বিতীয় দফা ‘ম্যাসিভ অপারেশনও’ বন্ধ করতে হয় সেনা সদস্যদের। এর আগে দুপুরে উদ্ধার অভিযানে ভারি যন্ত্রপাতির ব্যবহার শুরু হলেও কিছুক্ষণ পর তা বন্ধ করে দেয়া হয়। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা বলেছেন, ভারি যন্ত্রপাতি ব্যবহার শুরুর পর তারা আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়েন। কারণ ভারি যন্ত্রের ব্যবহারে বিধ্বস্ত ভবনটিতে কম্পন (ভাইব্রেশন) সৃষ্টি হয়। এ সময় তারা শাহিদা নামে এক গার্মেন্টকর্মীর সন্ধানে অভিযান চালাচ্ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বারবার ‘ম্যাসিভ অপারেশন’ বন্ধ রাখতে অনুরোধ করলে এক পর্যায়ে সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের বাদানুবাদ হয়। এর পরই ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে আসেন। পরে দ্বিতীয় দফায় ম্যাসিভ অপারেশনও বন্ধ করে দেয়া হয়। রাত ৯টায় মেজর মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, রাতে তারা আর ম্যাসিভ অপারেশনে যাচ্ছেন না। আজ প্রধানমন্ত্রীর সাভারে আসার কথা রয়েছে। তিনি ফিরে যাওয়ার পরেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
এছাড়া ওই সময়ে সামনের অংশে আরও চারজনকে জীবিত উদ্ধারের চেষ্টা চলছিল বলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানিয়েছেন। ওই অংশে ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও যারা বেঁচে আছেন তাদের উদ্ধারকেই প্রধান্য দিচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। ওই অংশে আজ সকাল থেকে ভারি যন্ত্রের ব্যবহার শুরু হবে। বুধবার স্মরণকালের ওই ভবন ধসের পাঁচ দিন পর রোববারও সেখান থেকে জীবিত উদ্ধার হয়েছেন ছয়জন। উদ্ধারকর্মীরা জানান, ঘটনার পাঁচ দিন পর এখন পর্যন্ত যারা ওই ভবনে জীবিত অবস্থায় আছেন তাদের বেশির ভাগই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। অনেকে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছেন যে আওয়াজ করতে পারছেন না। এর ফলে সাড়া না পাওয়ায় প্রাণের স্পন্দন থাকলেও ওই ধ্বংসস্তূপের নিচে ঘুট ঘুটে অন্ধকারে তাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে রোববার দুপুরে স্থলবন্দর বেনাপোলের অদূরে শার্শা এলাকা থেকে গ্রেফতার হয়েছেন অভিশপ্ত ওই ভবনটির মালিক যুবলীগ নেতা সোহেল রানা। ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে এলিট ফোর্স র্যাবের গোয়েন্দা শাখার একটি দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতার করে। পরে বিকালে র্যাবের হেলিকপ্টারে করে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। রানা পাজা ভবন ধসে শনিবার রাত ১টার পর থেকে রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে আরও ৪৯টি লাশ। সব মিলিয়ে রোববার পর্যন্ত ওই ভবন থেকে ৩৯৭ হতভাগ্য নারী ও পুরুষের লাশ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর ৩৩৮টি লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বিকৃত হয়ে যাওয়ায় ৩৪টি লাশ পাঠানো হয়েছে ঢাকা মেডিকেল ও মিটফোর্ড হাসপাতালের মর্গে। এখনও পর্যন্ত ২৩টি লাশ পড়ে আছে সাভারের অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জেলা প্রশাসনের হেফাজতে। এ পর্যন্ত জীবিত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছে ২ হাজার ৪৪২ নারী-পুরুষ।
উদ্ধার কাজে নিয়োজিত এক সেনা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভবনের ভেতর জীবিত অবস্থায় যে চারজনের সন্ধান পাওয়া গেছে তাদের উদ্ধারের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তার আগে বিধ্বস্ত ভবন থেকে উদ্ধারকারীদের নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে যাওয়া হবে। স্বেচ্ছাশ্রমে ওই ভবনে উদ্ধার কাজে অংশ নেয়া উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, ভবনের আরও বেশ কয়েকটি স্থানে এখনও প্রাণের স্পন্দন পাওয়া গেলেও সেসব স্থানে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। ভারি যন্ত্রপাতি আর কংক্রিটের বিম সেসব স্থানে যাওয়ার পথে বাধা। এসব স্থানের আশপাশে যেতে হলে ভবনের একেবারে ওপর থেকে নতুন করে ড্রিল করে সেখানে পৌঁছাতে হবে। আর এতে নতুন করে ১৫/১৬ ঘণ্টা প্রয়োজন হবে। এ সময়ের মধ্যে ভেতরে থাকা লাশগুলো পচে-গলে নষ্ট হয়ে যাবে।
রানা পাজার ধ্বংসস্তূপ সরাতে ভারি যন্ত্রের ব্যবহার ‘ম্যাসিভ অপারেশন’ শুরু করেছে উদ্ধার কাজে নেতৃত্বদানকারী সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সদস্যরা। সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে ভবনের পেছনের অংশে পূর্বদিকে প্রথম এ অভিযান শুরু হয়। অভিযানে দুটি ক্রেন এবং ডোজার ব্যবহার করা হচ্ছে। সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের ৩ ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের উপ-অধিনায়ক মেজর মোয়াজ্জেম হোসেন যুগান্তরকে বলেছেন,