বার্তা সংস্থা আবনা : সাভারে ২৪ এপ্রিল ধসে যাওয়া ভবন রানা পাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা মরদেহ দেখে চেনার উপায় নেই এটি পুরুষ না নারী। লাশ এতটাই বিকৃত হয়ে গেছে যে, স্বজনরাও দেখে প্রিয়জনকে চিনতে পারছেন না। উদ্ধারকর্মীরা জানান, কংকাল হয়ে যাচ্ছে বহু লাশ। স্তূপ সরাতে বের হচ্ছে মাথার খুলি, বিচ্ছিন্ন হাত, পা ও বুকের অংশ। মরদেহের পাশে পড়ে থাকা বিভিন্ন আইডি কার্ড, মোবাইল ও সঙ্গে থাকা প্রয়োজনীয় জিনিস রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে লাশের সঙ্গে। কেউ হয়তো লাশটা দ্রুত না চিনলেও মোবাইল নম্বর দিয়ে শনাক্ত করতে পারবে। কেউ কেউ আবার পরনের পোশাক দেখে শনাক্ত করছে লাশ। রানা পাজা থেকে এ পর্যন্ত ৫৫৫ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার মধ্যরাত থেকে শনিবার পর্যন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে ৩৭টি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে ৪৫৫টি।
সাভারের অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে শনিবার গিয়ে দেখা যায়, এখনও শত শত মানুষ তাদের স্বজনদের জন্য অপেক্ষা করছেন। তারা নিশ্চিত এখন আর কাউকে জীবিত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই লাশের জন্য অপেক্ষা তাদের। এই লাশ নিয়ে বুকে ধারণ করে পারিবারিক কবরস্থানে অনেকে প্রিয়জনকে দাফন করতে চান। শনিবার বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী ফারুক খান শনিবার উদ্ধার অভিযান দেখতে আসেন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে উদ্ধার অভিযান এটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যেভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করে উদ্ধার অভিযান চালানো হয়েছে এটি অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে। উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্বে থাকা সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী সাংবাদিকদের বলেন, মৃতদেহের ক্ষতি না করে উদ্ধার কাজ চালানো হচ্ছে। কতদিন ধরে এ উদ্ধার অভিযান চলবে তা এখনি বলা যাচ্ছে না। সব মৃতদেহ উদ্ধার হলে পরবর্তী অভিযানে যাওয়া হবে। জিওসি বলেন, মৃতদেহগুলো অক্ষত উদ্ধারে চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কেননা অনেক স্বজন তাদের প্রিয়জনের অপেক্ষায় আছেন।
লাশে পোকা ধরেছে : উদ্ধারকর্মীরা জানান, ভবনের যে অংশে দ্বিতীয় অভিযানের কাজ চলছে সেখানে মানুষের হাড়-গোড়ের ছড়াছড়ি। রেডক্রিসেন্ট উদ্ধারকারী দলের দলনেতা খায়রুল আলম দুলাল জানান, উদ্ধার করা লাশগুলোতে পোকা ধরে গেছে। সকাল থেকে ওপরে ওঠা-নামার সময় পায়ের নিচে কত যে হাড় পাওয়া গেছে তার কোন হিসাব নেই। ধসে পড়া ভবনের চার পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে শুধু মানুষের হাড়।
আরেক উদ্ধারকর্মী জানান, এখনও অসংখ্য হাড়গোড় পাওয়া যাচ্ছে। লাশ পচে যাচ্ছে। কংকাল হয়ে যাচ্ছে বেশিরভাগ লাশ। ভাবা যায় না যে মানুষের হাড়ের ওপর দিয়ে হাঁটছি। কিন্তু কিছু তো করার নেই। কাজ তো করতে হবে। শুধু তাই নয় পাওয়া গেছে মাথার খুলিও। একটা খুলি পাওয়া গেছে ধ্বংসস্তূপের মাঝে। খুলিটি পরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে আঞ্জুমান মফিদুলে। আর কিছু হোক না হোক- মাথাটা তো দাফন করা যাবে। শনিবার সকালের প্রথম প্রহরে পরপর ৮ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। আইডি কার্ডসহ উদ্ধার করা হয়েছে প্রমীলাকে। প্রমীলা সুইং সেকশনে কাজ করতেন। আর জাহাঙ্গীরের পকেটে একটি মোবাইল পাওয়া গেছে। এক উদ্ধারকর্মী মোবাইলটা থেকে সিম কার্ড বের করে নিয়ে নিজের মোবাইলে পুরে সেইভ করা নম্বরে ফোন দিতে থাকেন স্বজনদের খোঁজে। উদ্ধার করা হয়েছে পটুয়াখালীর কুয়াকাটার দিয়ারামখোলা গ্রামের আবদুল ওহাব হাওলাদারের মৃতদেহ। কাওসারের লাশ শনাক্ত করা হয় তার প্যান্টের পকেটে মানিব্যাগে থাকা পরিচয়পত্র থেকে। তিনি রানা পাজার একটি পোশাক কারখানার স্যাম্পলম্যান ছিলেন। কাওসারের মোবাইল ফোনটি বন্ধ থাকলেও উদ্ধারকর্মীরা সিম খুলে অন্য মোবাইল ফোনে যুক্ত করে সেভ করা একের পর এক নম্বরে কল করে বড় ভাই আবদুল খালেকের সঙ্গে কথা বলতে সক্ষম হন। ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়ে এগারো দিন পর লাশ পেয়ে নির্বাক কাওসারের বাবা আবদুল ওয়াহাব। বড় ভাই আবদুল খালেক বলেন, অনেকে লাশ পায়নি, আমরা ভাইয়ের লাশ পেয়েছি এটাই আমাদের সান্ত্বনা।
আটকে থাকা দিবার লাশ মিলল : পঞ্চম তলায় ফ্যান্টম অ্যাপারেলসে পোশাক শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার চাকরি করতেন মিহির সরকারের স্ত্রী দিবা পাত্র। উদ্ধার অভিযানের একাদশতম দিনে শনিবার ভোরে তার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ২৪ এপ্রিল ভবন ধসের পর খবর পেয়ে ছুটে আসেন মিহির সরকার। ফোন করেন স্ত্রী দিবার কাছে, বারবারই ফোন বন্ধ পান। ঘটনার পর দিন রাতে দিবার বান্ধবী লাবণী তাকে ফোন করে জানায় তার স্ত্রী পাঁচতলায় আটকে আছে। তাকে বাচানোর জন্য বলেন লাবণী। ওই দিন থেকে রানা পাজায় উদ্ধার কাজে নিজের স্ত্রীকে বাঁচানোর জন্য দিনরাত উদ্ধার কর্মীদের সঙ্গে কাজ করছেন মিহির। তিন দিন উদ্ধার কাজ করে পাঁচতলায় খুঁজে পায় তার স্ত্রী দিবাকে। মৃত অবস্থায় খুঁজে পেয়ে, নাম ঠিকান