বার্তা সংস্থা আবনা : ৯৬ বছর আগে ১৯১৭ সালের এই দিনে পর্তুগালের 'ফাতিমা' নামক শহরে ঘটেছে পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত বা অলৌকিক ঘটনার মধ্যে অন্যতম একটি ঘটনা।
তিনটি ভাগ্যবান শিশু (দুই বালিকা ও এক বালক) " আমাদের মহীয়সী নারী ফাতিমা" বা " তাসবিহ'র অধিকারী মহীয়সী নারী"র আলোকোজ্জ্বল অবয়ব বা জলজ্যান্ত কাঠামো দেখেছিল বলে দাবি করেছিল। তাদের ভাষায় সেই নুরানী অবয়বটি ছিল " সূর্যের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল ও সর্বোচ্চ মাত্রায় জ্বলজ্বল পানিতে ভরা কাঁচের বা স্ফটিকের বলের চেয়েও বেশী স্বচ্ছ ও শক্তিশালী আলো বিকিরণকারী এবং আলাদা হয়েছিল সূর্যের আলোর মাধ্যমে"! সেই অবয়ব তাদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন এবং তাদেরকে বিশেষ দোয়া শিখিয়ে দিয়েছিলেন। সেই দোয়ার বরকতে অসুস্থ ব্যক্তিরা আরোগ্য লাভ করেছিল।
ঘটনা জানতে পেরে স্থানীয় ক্যাথলিক চার্চ বা গির্জার কর্তৃপক্ষ এই তিন শিশুকে শিগগিরই গ্রেফতার করে এবং তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর হুমকি দেয়। পরে তাদেরকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল বলে বর্ণনা রয়েছে, যদিও ঠিক সেই শিশুদেরকেই মুক্তি দেয়া হয়েছিল কিনা তা স্পষ্ট নয়। তাদেরকে ঘটনার সত্যতার ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল বলে বর্ণনা রয়েছে। ফলে তাদের অনুরোধে সেই মহীয়সী নারী নুরানি বা আলোকময় অবয়ব নিয়ে আবারও হাজির হয়েছিলেন বলে বর্ণনা এসেছে। প্রায় এক লাখ বা অর্ধ লাখেরও বেশি মানুষ সেই অলৌকিক উপস্থিতি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছিল। ততকালীন পত্র-পত্রিকায় এ সংক্রান্ত সচিত্র খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
সেই থেকে আজ পর্যন্ত প্রতি বছর এই বিশেষ দিনে ফাতিমা শহরে একটি বিশেষ মেলা বসে। সেখানে নানা জাতি ও ধর্মের হাজার হাজার মানুষ ও রোগী তাদের সমস্যা সমাধানের আশায় সমবেত হন। তারা তাসবিহ পাঠ করেন এবং হাঁটু গেঁড়ে ওই ঐতিহাসিক ঘটনার নিদর্শন স্থল বা স্মৃতি-চিহ্নের কাছে যান। এ অঞ্চলে একটি বড় হোটেলের নামও ফাতিমা।
সেই মহীয়সী নারীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভকারী ওই তিন শিশুর নাম ছিল লুসিয়া সান্তোস, জ্যাসিন্টা ও ফ্রান্সিসকো মার্টোইন। তাদের দুই জন কিছুকাল পর মারা যায়। লুসিয়া সান্তোস ২০০৫ সাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।
ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান কেন্দ্র ভ্যাটিকান এ ধরনের ঘটনা ঘটার কথা স্বীকার করলেও ওই আলোকোজ্জ্বল অবয়বকে মা মেরি বা হযরত মরিয়াম (সা.)'র অলৌকিক উপস্থিতি বলে দাবি করে আসছে। ভ্যাটিকান " ফাতিমার তিন গোপন বাণী" নামে সেই মহীয়সী নারীর বক্তব্য প্রকাশ করে। কিন্তু ভ্যাটিকানের মাধ্যমে প্রকাশিত কথিত "ফাতিমার তিন গোপন বাণী"র বক্তব্যে পুরো ঘটনা ও শিশুদের কাছে সেই রহস্যময় অস্তিত্বের বলা কথা বা ভবিষ্যদ্বাণীগুলো পরিকল্পিতভাবে বিকৃত করা হয়েছে বলে অনেক গবেষক মনে করেন।
এর কারণ, প্রথমতঃ খ্রিস্টানদের লিখিত বর্ণনাগুলোর কোথাও কখনও কুমারী মা মেরি বা বিবি মরিয়ম (সা.)-কে 'ফাতিমা' বলে উল্লেখ করা হয়নি।
দ্বিতীয়তঃ খ্রিস্টানদের লিখিত বর্ণনাগুলোর কোথাও কখনও কুমারী মা মেরি বা বিবি মরিয়ম (সা.)-কে তাসবিহ'র অধিকারী বলে উল্লেখ করা হয়নি।
এ ছাড়াও গবেষকদের মতে, পর্তুগালের ফাতিমা শহরটির আরবি ফাতিমা নামও খুবই লক্ষণীয়। এই শহরটির প্রতিষ্ঠাতা ছিল প্রাচীন মুসলিম স্পেন বা ইবেরিয়ার মুসলিম শাসকরা। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র কন্যা হওয়ার কারণে ফাতিমা নামটি মুসলিম বিশ্বে খুবই জনপ্রিয় ও সম্মানিত। "ফাতিমা আজ জাহরা" (সা.)'র জাহরা শব্দটির অর্থ "সর্বোচ্চ আলোকময়"।
আরো লক্ষণীয় বিষয় হল, নবী-নন্দিনী হযরত ফাতিমা (সা.) ছিলেন তাসবিহর অধিকারী। তিনি তাসবিহ বানিয়েছিলেন মাটি দিয়ে। বিশ্বনবী (সা.) তাঁকে আল্লাহর পক্ষ থেকে চারটি তাসবিহ বা আল্লাহর প্রশংসাসূচক বাক্য শিখিয়েছিলেন যা মুসলমানরা আজো প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর তাহলিল বা পাঠ করে থাকেন। (৩৩ বার সুবাহান আল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ ও ৩৪ বার আল্লাহু আকবর)
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণীয় দিক হল, ১৫৭১ সালে পোপ পঞ্চম পিয়াস কুমারী মা মেরির সম্মানে " আমাদের মহীয়সী নারীর বিজয়" শীর্ষক এক ভোজসভার আয়োজন করেছিলেন। খ্রিস্টানরা পশ্চিম ইউরোপে তুর্কি মুসলমানদের বিজয় ঠেকাতে সক্ষম হওয়ায় এই ভোজসভার আয়োজন করেছিলেন ততকালীন পোপ। কিন্তু এর কয়েক বছর পর বা পরবর্তী বছরগুলোতে তুর্কি মুসলিম সেনারা পশ্চিম ইউরোপ দখল করতে থাকলে ততকালীন ১৩ তম পোপ গ্রেগরি ওই ভোজসভার নাম পরিবর্তন করেন। নতুন নাম দেয়া হয় "তাসবিহর অধিকারী আমাদের মহীয়সী নারী"। আর এভাবেই খ্রিস্টানদের ইতিহাসে প্রথমবারের মত কুমারী মা মেরি বা হযরত মরিয়ম (সা.)'র সঙ্গে তাসবিহ-কে সংশ্লিষ্ট করা হয়। কেউ কেউ মনে করেন দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরোপে মুসলমানদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকায় এবং তারা হযরত ফাতিমা (সা.)'র তাসবিহ পাঠ করতে থাকায় এই প্রবণতা ঠোকানোর জন্য প্রোপাগান্ডা হিসেবে এই পদক্ষেপ নেয় ভ্যাটিকান।
তাই এ সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি যে ১৯১৭ সালে পর্তুগালের ফাতিমা শহরের একটি এলাকায় যে তিন শিশু বিশেষ আলোকোজ্জ্বল অবয়ব দেখেছিল তা ছিল বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র কন্যা খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতিমা (সা.)'র নুরানি বা আধ্যাত্মিক উপস্থিতি এবং তিনি রহস্যময় গোপন বাণীতে সম্ভবতঃ ইউরোপীয়দের সবাই এক সময় মুসলমান হয়ে যাবে বা এই মহাদেশ মুসলিম-প্রধান মহাদেশে পরিণত হবে বলেই ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন।