আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা আবনার রিপোর্ট : হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) এর মজলিশে বক্তৃতাকারীগণের বিশেষ সম্মেলন সমগ্র ভারত হতে আগত ১৫০ জন বক্তা, নওহা খান ও মার্সিয়া পরিবেশনকারীর উপস্থিতিতে নয়া দিল্লীতে অবস্থিত ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে গত ২৯শে অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়।
এ সম্মেলনে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন মাহদাভিপুর বলেন : মার্সিয়া পাঠ, অশ্রু বিসর্জন, মাতম করা ও নওহা পড়াই হচ্ছে আযাদারী এবং পবিত্র এ কাজের সাথে কুসংস্কারের সংমিশ্রণ ক্ষমার অযোগ্য গুনাহ হিসেবে বিবেচিত।
তিনি বিভেদ সৃষ্টিকারী যে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ হতে বিরত থাকার প্রতি গুরুত্বারোপ করে বলেন : আজ মুসলিম বিশ্ব একটি বিভেদ ও দ্বন্দের শিকার এবং শত্রুরা যেকোন সময়ের চেয়ে বর্তমানে শিয়া ও সুন্নিদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টির লক্ষে সচেষ্ট। এক্ষেত্রে বক্তাগণের উচিত জনগণকে এ বিষয়ে অবগত করা, কেননা ঐক্য হচ্ছে ইসলামি মাযহাবসমূহের মাঝে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
জনাব মাহদাভি পুর বলেন : শিয়া ও সুন্নিদের মাঝে ঐক্য স্থাপনের অর্থ ওয়াহাবী ও তাকফিরীদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হওয়া নয়। উদ্দেশ্য হচ্ছে সুন্নি মাযহাবের অধিকাংশ অনুসারীদের সাথে ঐক্য গড়ে তোলা। কেননা শত্রুরা পূর্বের যে কোন সময়ের চেয়ে বর্তমানে বিভেদ সৃষ্টির ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।
সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি বলেন : নতুন প্রজন্মের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে মহররম মাসের কর্মসূচী হাতে নেয়া অত্যন্ত জরুরী। কেননা যুবকদের মনে রয়েছে নানা প্রশ্ন এবং এ সকল প্রশ্নের উত্তর দানের প্রতি গুরুত্ব দান করা আবশ্যক। প্রতিটি মসজিদ ও ইমামবাড়ী থেকেই যুবকদের প্রশ্নের উত্তর প্রদান করতে হবে।
তিনি বলেন : ভারতে কয়েক হাজার মাদ্রাসা রয়েছে, এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আর এ সকল মক্তবসমূহ ভারতের জন্য অমূল্য পূজিঁ স্বরূপ। আলেম সমাজের উচিত এগুলোর মানোন্নয়নের লক্ষ্যে চেষ্টা চালানো যাতে শিশুরা অল্প বয়স হতেই ধর্মের সাথে পরিচিত হতে পারে।
তিনি বক্তাগণকে ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলসমূহের প্রতি গুরুত্ব দানের আহবান জানান।
তিনি বলেন : আশুরা সাংস্কৃতির প্রভাবে প্রভাবিত কোটি কোটি মানুষের –চাই তারা মুসলমান হোক বা হিন্দু- উদ্দেশ্যে ইমাম হুসাইন (আ.) এর পথ ও উদ্দেশ্যকে বর্ণনা করার ক্ষেত্রে মহররম মাস হচ্ছে বক্তাগণ ও আলেম সমাজের জন্য মোক্ষম সুযোগ।
তার মতে কারবালা ও আশুরার ঘটনার দু’টি দিক রয়েছে একটি বেদনাদায়ক ও মর্মস্পর্শী –কেননা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানব অত্যন্ত মজলুমভাবে শহীদ হয়েছেন- এ কারণে আশুরা একটি বেদনাদায়ক ঘটনা এবং কেয়ামত অবধি যদি এ মুসিবতের জন্য আমরা অশ্রু ঝরাই তবুও এর অধিকার আদায় করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন : দ্বিতীয় দিকটি হচ্ছে ইমাম হুসাইন (আ.) এর বিপ্লব হতে শিক্ষা গ্রহণ করা। তাদের অত্যাচারিত অবস্থা, সাহসিকতা, মহত্ত্ব, উদারতা, আত্মোত্সর্গতা, শাহাদাতের প্রেরণা এবং কুফার অধিবাসীদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করা হতে শিক্ষা নিতে হবে। বক্তাগণ ও আলেম সমাজের উচিত উভয় দিকের উপর আলোকপাত করা। তাদেরকে কাঁদাতেও হবে, আবার এ মহান বিপ্লব হতে শিক্ষা গ্রহণের প্রতিও জন্যও তাগিদ দিতে হবে।
মুম্বাই শহরের বিশিষ্ট আলেম ‘হুসাইন মাহদী হুসাইনী’ কারবালার শহীদ পরিচিতি শীর্ষক বিষয়ে প্রদত্ত বক্তব্যে কারবালার ঘটনার বিভিন্ন দিক এবং কয়েকজন শহীদদের স্মৃতি চারণ করে বলেন : আহলে বাইত (আ.) এর প্রতি ভালবাসা ও মহান আল্লাহর নির্দেশ মান্য করা –এ দু’টি বিষয় পরস্পরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
তিনি কারবালার হতে গৃহিত শিক্ষার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, শত্রুদের মোকাবেলায় আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত।
মুম্বাইয়ের অপর আলেম হুজ্জাতুল ইসলাম হাসনাইন কাররারভি, হুসাইনী বিপ্লবে নারীদের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন এবং কুফা শহরে হযরত মুসলিম বিন আকীলের মজলুমিয়্যাতের কথা উল্লেখ বলেন : কারবালার ঘটনায় নারীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
কারবালার বার্তা পৌঁছাতে হযরত যায়নাব (সা. আ.) এর ভূমিকার কথা বলে ইয়াযিদ সম্পর্কে তাঁর (সা. আ.) বক্তব্যের উপর তিনি আলোকপাত করেন।
এরপর ভারতের প্রখ্যাত মার্সিয়াখান শান হায়দার আমরুহাভি উর্দুতে কয়েক লাইনের একটি মার্সিয়া পরিবেশন করেন।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ডেপ্যুটি প্রধান হুজ্জাতুল ইসলাম ‘আহমাদ আলেমী’ তার ‘সুন্নি মাযহাবের দৃষ্টিতে ইমাম হুসাইন (আ.) এর বিপ্লব’ শীর্ষক প্রবন্ধে ইমাম হুসাইন (আ.) এর ব্যক্তিত্ব, মহানবী (স.) ও ইমাম হুসাইন (আ.) এর শাহাদাত এবং ইমাম হুসাইন (আ.) এর জন্য আযাদারী’ ইত্যাদি বিষয়ে সুন্নি মাযহাবের বিশ্বস্ত গ্রন্থাবলি হতে বেশ কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করে বক্তব্য রাখেন।
লাখনৌ শহরের জুমআর খতিব হুজ্জাতুল ইসলাম সৈয়দ কালবে জাওয়াদ নাকাভী তার বক্তব্যে ইসলাম ধর্মের উদ্দেশ্যকে এগিয়ে নিতে আযাদারীর ভূমিকার উপর আলোকপাত করে বলেন : মেম্বর হচ্ছে একটি পবিত্র স্থান এবং প্রকৃত আলেমরাই এতে বসে বক্তব্য রাখার অধিকার রাখেন।
তিনি বলেন : আমরা এ শোক মজলিশ ও মাসায়েবের মাধ্যমেই মুসলমানদেরকে সঠিক পথে নির্দেশনা ও সিরাতে মুস্তাকিমের পথ দেখাতে সক্ষম।
ভারতে ‘আল-মোস্তফা (স.) আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে’র প্রতিনিধি হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন গোলাম রেজা মাহদাভি তার বক্তব্যে বলেন : শিয়া সংস্কৃতিতে মহররম ও ইমাম হুসাইন (আ.) এর বিপ্লব, শিয়া স্বকীয়তার সাথে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রাখে এবং ইমাম হুসাইন (আ.) এর বিপ্লবকে না চিনে শিয়া মাযহাবকে চেনা সম্ভব নয়।
তিনি তার বক্তব্যে ইমাম খোমেনী (রহ.) এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন : আযাদারী একটি যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তি সমর্থিত কর্ম এবং প্রাচীনকালেও প্রতিটি সমাজে এর প্রচলন ছিল। পাশাপাশি ইসলাম ধর্মেও আযাদারী প্রশংসিত একটি কাজ হিসেবে বিবেচিত এবং আল্লাহর বিশেষ বান্দারা এ কাজের প্রতি তাগিদ দিয়েছেন।
এরপর হুজ্জাতুল ইসলাম সৈয়দ শামশাদ আহমাদ আবা আব্দিল্লাহিল হুসাইন (আ.) এর মজলিশের বক্তাগণের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন।
লাখনৌ প্রদেশের ‘ইসলাহ’ পত্রিকার সম্পাদক সৈয়দ মুহাম্মাদ জাবের জাওয়ারসি আশুরার দর্শনের উপর আলোকপাত করেন।
এরপর ভারতের বিশিষ্ট নওহাখান সৈয়দ নাঈম আব্বাস বক্তব্য রাখেন।
সম্মেলনের শেষ অংশে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের প্রধান ‘আলী ফুলাদী’ এ সম্মেলন আয়োজনে সহযোগিতার জন্য আহলে বাইত (আ.) বিশ্বসংস্থার প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে ধর্মীয় শিক্ষা উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আলেম ও বক্তাগণের গুরত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন : জনগণ ধর্ম এবং ধর্মীয় বিধানকে আলেমদের নিকট থেকে গ্রহণ করে আর এ কারণেই আলেম সমাজের কাঁধে ভারী ও গুরুদায়িত্ব।
সম্মেলনের পরবর্তী কর্মসূচীতে নয়া দিল্লীতে অবস্থিত ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র কর্তৃক অনুদিত ও প্রকাশিত ৫টি গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। ঐ গ্রন্থগুলো হচ্ছে :
(১) ‘সুন্নি মাযহাবের রেওয়ায়েতসমূহে ইমাম রেজা (আ.) এর যেয়ারত’ ; মুহাম্মাদ মুহসেন তাবাসী (হিন্দী)
(২) ‘ইসলাম ও ইরানের পারস্পারিক সম্পর্ক’ (২য় খণ্ড) ; শহীদ মুতাহারী (উর্দু)
(৩) ইমাম হুসাইন (আ.) এর আযাদারী একটি বিশ্বজনিন বিপ্লব ; ড. ধরমিন্দ্র নাথ (উর্দু)
(৪) হজ্ব বিষয়ক ‘রাহে ইসলাম’ পত্রিকা
(৫) মদিনা হতে কারবালা পর্যন্ত ইমাম হুসাইন (আ.) এর খোতবা ; মুহাম্মাদ সাদেক নাজমী (উর্দু)