১৫ ডিসেম্বর ২০১৩ - ২০:৩০
ইমামত বিষয়ক আলোচনা (পর্ব ০১)

মূল : মোহাম্মাদ সাঈদী মেহ্‌র অনুবাদ : মোঃ ইউনুস আলী গাজী

ভূমিকা

মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্বের বিষয়টি -যা ইমামত[১] নামে পরিচিত- মহানবী (স.) এর ইন্তেকালের পর, ইসলামি চিন্তাধারায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক একটি বিষয়। মহানবী (স.) মদিনায় হিজরতের পর প্রথম ইসলামি রাষ্ট্র গঠন করেন এবং নিজেই তার নেতৃত্বের দায়িত্ব নেন। এরপর হতে মহানবী (স.) নিজের নবুয়্যতি মিশনের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি -যেমন : ওহী গ্রহণ ও তার প্রচার, কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের তাফসির করা, ঐশী হুকুম-আহকাম বর্ণনা করা, জনগণকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দান ও তরবিয়্যত করা ইত্যাদি- ইসলামি সমাজের নেতৃত্ব দানের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে এসে পড়ে। তিনি মুসলমানদের মতবিরোধের সমাধান দিতেন, তাদের মাঝে বিচার করতেন, ইলাহি হদ (ঐশী দণ্ডবিধী) ও আইন জারী করতেন, সামরিক বাহিনী’র নেতৃত্ব দিতেন, যুদ্ধ ও সন্ধির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন এবং সমাজের অর্থনৈতিক বিষয়াদি দেখাশুনা করতেন। এক কথায় মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব দানের ধর্মীয় ও পার্থিব সকল বিষয়াদি মহানবী (স.) এর কাঁধেই ছিল।

কিন্তু মহান আল্লাহর সুন্নত (নীতি) এ সিদ্ধান্তের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল যে, মহানবী (স.) এর আয়ু চিরন্তন হবে না; তিনি হিজরতের ১০ বছর পর মদিনায় ইন্তিকাল করেন। এ সময় মুসলিম উম্মাহ একটি মৌলিক প্রশ্নের সম্মুখীন ছিল যে, মহানবী (স.) এর কোন সাহাবী নেতৃত্ব দানের গুরুত্বপূর্ণ এ দায়িত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে যোগ্য? স্বয়ং এ প্রশ্নটিই অন্য কিছু প্রশ্নের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। মূলতঃ মহানবী (স.) এর উত্তরাধিকারী ও স্থলাভিষিক্তের জন্য কোন কোন শর্ত থাকা আবশ্যক এবং মুসলমানদের ইমাম ও নেতা কিভাবে নিযুক্ত হবেন?... কিন্তু এ সকল প্রশ্নের ক্ষেত্রে প্রদত্ত সকল উত্তর কিন্তু এক রকম ছিল না!

ইতিহাসের সাক্ষ্য অনুযায়ী মহানবী (স.) এর ইন্তেকালের পর মুসলমানদের মাঝে সর্বপ্রথম বিভেদ ইমামত ও তাঁর স্থলাভিষিক্তের বিষয়েই সৃষ্টি হয়, আর এ বিভেদের পরিণামে শিয়া ও সুন্নি পৃথক হয়ে যায়। অবশ্য এ বিষয়টিকে ভুলে গেলে চলবে না যে, ইমামতের বিষয়ে শিয়া ও আহলে সুন্নতের মধ্যকার বিভেদ শুধুমাত্র ‘মহানবী (স.) এর যোগ্য উত্তরসূরী নির্বাচন’-এ বিষয়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ইসলামি সমাজে ইমামতের স্থান, ইমাম বা নেতার কর্তব্য ও নেতা হওয়ার শর্ত ইত্যাদি বিষয়ে এ দুয়ের মাঝে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। আর এ মৌলিক পার্থক্যের কারণেই এরা মহানবী (স.) এর যোগ্য উত্তরসূরী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ঐকমত্যে পৌঁছুতে পারেনি।

 

ইমামত সম্পর্কে শিয়া ও সুন্নিদের সার্বিক ধারণা

আহলে সুন্নতের দৃষ্টিতে  ইমামত একটি ঐশী পদ নয়। আর এ কারণে ইমাম, জনগণের ভোট বা তাদের প্রতিনিধিদের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হন, অথবা (ইমাম) সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেও ক্ষমতায় আসতে সক্ষম। কিন্তু শিয়াদের দৃষ্টিতে, ইমামত হচ্ছে ঐশী এক পদ এবং মহানবী (স.) এর রেসালতের কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা। এ কারণে ইমামকে অবশ্যই বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী হতে হবে যাতে মহানবী (স.) এর নেতৃত্বকে ধারাবাহিকতা দানের তওফিক লাভ করেন। অন্য ভাষায়, শিয়াদের দৃষ্টিতে ইমামকে অবশ্যই নবুয়্যত (যা ওহী গ্রহণ ও তার প্রচারের বিষয়টিকে বোঝায়) ব্যতীত মহানবী (স.) এর সকল বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হবে। এরই ভিত্তিতে ইমাম এমন এক ব্যক্তিত্বের নাম যিনি ‘ইসমাত’-এর শীর্ষক বৈশিষ্ঠের অধিকারী হওয়া ছাড়াও ঐশী জ্ঞানে সমৃদ্ধ হবেন; যার ভিত্তিতে তিনি মহান আল্লাহর পবিত্র গ্রন্থের ত্রুটিমুক্ত তাফসির করতে পারবেন এবং মহানবী (স.) এর শিক্ষা মুসলমানদেরকে প্রদান করতে পারেন। পাশাপাশি মুসলিম উম্মাহ’র ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্ব কাঁধে তুলে নেবেন।

ইমামতের বিষয়টি উত্থাপনের প্রয়োজনীয়তা

হয়তবা ইমামতের বিষয়টি উত্থাপনের সমালোচনায় বলা হতে পারে যে, মহানবী (স.) এর স্থলাভিষিক্ত নির্বাচনের বিষয়টি অতিত ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত। কেননা এর মূল বিষয়টি হচ্ছে, মহানবী (স.) এর সত্য ও প্রকৃত উত্তরসূরী ছিলেন প্রথম অথবা চতুর্থ খলিফা। কিন্তু বর্তমান যুগের মুসলমানদের জন্য এর কোন কার্যকরী উপকারিতা নেই; বিশেষতঃ যখন বিষয়টির উত্থাপন সাম্প্রদায়িক বিভেদের জন্ম দেয় এবং মুসলিম ঐক্যকে হুমকির সম্মুখীন করে।

এ অভিযোগ ও সমালোচনার জবাবে বলা যেতে পারে যে, প্রথমতঃ ইমামতের বিষয়টি শুধুমাত্র একটি ঐতিহাসিক বিষয় নয়, বরং এটা কালামশাস্ত্র ভিত্তিক ও আকিদাগত একটি বিষয়ও বটে। সুতরাং সকল মুসলমানের জন্য মা’রিফাতুল্লাহ বা আল্লাহ পরিচিতি এবং পুণরুত্থান দিবসের বিষয়ে গবেষণা করা যেমন আবশ্যক তেমনিভাবে ইমামতের বিষয়ে গবেষণা করা জরুরী। যাতে করে এর মাধ্যমে ব্যক্তি তার আকিদাগত জগতের একটি অংশে স্পষ্ট ফলাফলে পৌঁছুতে পারে। এ কারণেই ইমামতের বিষয়টি প্রতিটি যুগে ও প্রতিটি স্থানে মুসলমানদের জন্য একটি জীবন্ত ও দৃষ্টি আকর্ষণকারী বিষয় হিসেবে গন্য।

দ্বিতীয়তঃ ইমামত ও মহানবী (স.) এর স্থলাভিষিক্তির বিষয়টি প্রতিটি যুগে মুসলমানদের ধর্মীয় বিষয়াদিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইমামতের মূল বিষয়টির ব্যাপকতার প্রতি দৃষ্টি রেখে শিয়াদের দৃষ্টিতে আমিরুল মু’মিনীন (আ.) ও তার সন্তানগণের ইমামতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের অর্থ হচ্ছে; তারা মহানবী (স.) এর পর ইসলামি শিক্ষা ও ধর্মের সত্য বিষয়াদি উদ্ঘাটনে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং পবিত্র কুরআন ও মহানবী (স.) এর সুন্নতের বিষয়ে তাদের প্রদত্ত তাফসীরসমূহ ত্র“টিমুক্ত, তাই তাদের অনুসরণ করা আবশ্যক। অপরদিকে শিয়ারা যেভাবে হযরত আলী (আ.) ও তাঁর সন্তানদের ইমামতের বিষয়ে বিশ্বাস করে সুন্নিরা সেভাবে বিশ্বাস করে না, তারা ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে অন্যান্য সূত্রের শরণাপন্ন হয় এবং পবিত্র কুরআনের তাফসির ও নব (স.) এর সুন্নতকে অন্য সূত্রের মাঝে অনুসন্ধান করে। মূলতঃ শিয়া ও আহলে সুন্নতের আকিদাগত ও ব্যবহারিক