বার্তা সংস্থা আবনা : সন্তানকে জীবিত ফিরে পাবেন বলে আশায় বুক বেঁধেছিলেন নিখোঁজ শিক্ষার্থীদের বাবা-মা। কিন্তু নিয়তি তাদের সে আশা পূরণ করেনি। লাশই মিলল তাদের। প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন সাগরে গোসল করতে নেমে নিখোঁজ হওয়া আহসান উল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের চার ছাত্রের মধ্যে বুধবার দুজনের মৃতদেহ উদ্ধার করেছে কোস্টগার্ড। তারা হলেন শাহরিয়ার ইসলাম নোমান ও এসএম গোলাম রাহীম বাপ্পী।তাদের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা ও ভালুকায়। নোমান ও বাপ্পীর লাশ উদ্ধারের খবর শোনার পর তাদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। এ মৃত্যুকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না স্বজনরা। সন্তান হারিয়ে এখন বাকরুদ্ধ ও পাগলপ্রায় তাদের বাবা-মা। ছেলের লাশের অপেক্ষার প্রহর গুনছে দুটো পরিবার।টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি জানান, নিখোঁজ হওয়ার ৪৩ ঘণ্টা পর বুধবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সেন্টমার্টিনের উত্তর সৈকতে বাপ্পী ও সাড়ে ১০টায় পশ্চিম সৈকতে নোমানের মৃতদেহ ভেসে উঠলে কোস্টগার্ড সদস্যরা তা উদ্ধার করেন। মৃতদেহ দুটি দুপুরে বন্দর ইমিগ্রেশন জেটি দিয়ে টেকনাফে নিয়ে আসা হয়েছে। টেকনাফ থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রণজিত কুমার বড়ুয়া জানান, উদ্ধার দুই শিক্ষার্থীর মৃতদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে।এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মোজাহিদ উদ্দিন জানান, পরিবারের কেউ শনাক্ত না করা পর্যন্ত মৃতদেহের পরিচয় সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাবে না। নিখোঁজ সাব্বিরের চাচাত ভাই আসিবুর রহমান টেকনাফে ভাইয়ের খোঁজে রয়েছেন। উদ্ধার করা দুটি লাশের মধ্যে সাব্বির নেই বলে জানান তিনি। কোস্টগার্ড সেন্টমার্টিন ক্যাম্প ইনচার্জ লেঃ শহীদ হাসান ও সেন্টমার্টিন ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল আমিন জানান, বাকি দুজনের খোঁজে উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।সোমবার বেলা দেড়টার দিকে সেন্টমার্টিন বেড়াতে এসে সাগরে গোসল করতে নামে আহসান উল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪ শিক্ষার্থী। এ সময় প্রচণ্ড ভাটার টানে ১০ ছাত্র সাগরে ডুবে যায়। এদের মধ্যে স্থানীয় লোকজন ছয়জনকে উদ্ধার করলে তাদের মধ্যে মানফেজুল ইসলাম ইভান ও সাদ্দাম হোসেন অংকুর নামে দুই ছাত্রের মৃত্যু হয়।ময়মনসিংহ ব্যুরো জানায়, ভালুকা পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে বসবাসরত অবসরপ্রাপ্ত উপজেলা পরিসংখ্যান অফিসার শামছুদ্দিন আহমেদ ও শামছুন্নাহার আহমেদ দম্পতির পাঁচ ছেলেমেয়ের মধ্যে বাপ্পী ছিলেন চতুর্থ। তিনি স্থানীয় শাপলা বিদ্যানিকেতন থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে মির্জাপুর ক্যাডট কলেজে ভর্তি হন। প্রাথমিকে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি ও মির্জাপুর ক্যাডট কলেজ থেকে ২০০৬ সালে জিপিএ ৫ নিয়ে এসএসসি ও ২০০৮ সালে জিপিএ ৫-সহ উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ঢাকা আহছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি।সেন্টমার্টিনে বেড়াতে গিয়ে সাগরে নিখোঁজ হওয়ার দুদিন পর বুধবার সকালে তার লাশ উদ্ধারের খবরে পরিবারে কান্নার রোল পড়ে যায়। লাশ উদ্ধারের খবর বাড়িতে পৌঁছলে বাপ্পীর পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও আশপাশের লোকজনের কান্নায় এলাকার বাতাস ভারি হয়ে উঠে। দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা নিহত বাপ্পীর বাড়িতে ভিড় করছেন। এদিকে লাশের জন্য অধীর আগ্রহে প্রহর গুনছেন তার পরিবার। লাশ উদ্ধারের সংবাদ পাওয়ার পর নিহত বাপ্পীর মামা শাহজাহানসহ পরিবারের লোকজন লাশ আনার জন্য কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।নিহত বাপ্পীর বাকরুদ্ধ বাবা শামছুদ্দিন আহমেদ বলেন, অনেক স্বপ্ন ছিল বাপ্পীকে নিয়ে। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ১০ এপ্রিল সে বাড়িতে এসে সবার সঙ্গে দেখা করে বন্ধুদের নিয়ে সেন্টমার্টিন বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে। শনিবার সকালে বাড়ি থেকে বের হয় সে। সেখানে গিয়ে আমার মোবাইলে এসএমএস করে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানায়। এটাই যে ছেলের সঙ্গে আমার শেষ যোগাযোগ হবে, তা ভাবতে পারিনি। নিহত বাপ্পীর ছোট ভাই সাব্বির জানান, সোমবার সকালে ফোনে ভাইয়ার সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়। ওই দিন দুপুরে ভাইয়ার বন্ধু সাকিলের মাধ্যমে সেন্টমার্টিনে দুর্ঘটনার খবর শুনে ভাইয়ার মোবাইলে ফোন দিলে অন্য লোক মোবাইল ধরে ভাইয়ার নিখোঁজের সংবাদ জানান।এদিকে নিহত শিক্ষার্থী শাহরিয়ার ইসলাম নোমান ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলা সদরের লক্ষ্মীখোলা গ্রামের নজরুল ইসলামের ছেলে। তার বাবা মুক্তাগাছা উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা। বুধবার ১০টায় নোমানের লাশ পাওয়ার খবর টেলিভিশনে দেখে বারবার মূর্ছা যান পরিবারের সদস্যরা। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন বাবা-মা। পাগলপ্রায় ও নির্বাক একমাত্র ছোট বোন নিশিও। এখন ছেলের লাশ দেখার প্রহর গুনছেন তারা। নোমানের বাবা নজরুল ইসলাম জানান, বারণ সত্ত্বেও বেড়াতে যায় সে। তিন মাস আগে বাড়ি এসেছিল। নোমানের মা শামসুন্নাহার বেগম বলেন, সেন্টমার্টিন ঘুরে এসে বাড়ি আসার কথা ছিল তার। কিন্তু ফিরছে লাশ হয়ে। নোমানের একমাত্র ছোট বোন নুসরাত জাহান নিশি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলে, ভাইয়া যাবে, বাবা-মা রাজি ছিলেন না। টাকাও দিতে চাননি। আমিই বাবা-মাকে বলে রাজি করিয়েছিলাম।কর্ণফুলীতে নিখোঁজ ছাত্রের লাশ উদ্ধার : কর্ণফুলী নদীতে নিখোঁজের এক দিন পর চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রিদুয়ানুল ইসলাম রক্তিমের মৃতদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সোমবার সন্ধ্যায় পহেলা বৈশাখে নৌভ্রমণ শেষে ফেরার পথে বোটে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার সময় সদরঘাট এলাকায় নদীতে পড়ে নিখোঁজ হন তিনি। মঙ্গলবার রাতে কর্ণফুলী নদীর আনুমাঝির ঘাট এলাকা থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত রিদুওয়ান ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ’র চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। ঢাকার মিরপুর থানার কল্যাণপুর এলাকার ১নং রোড়ের ১২নং বাসার বাসিন্দা মৃত আবদুল মজিদের ছেলে তিনি।
সূত্র : দৈনিক যুগান্তর
১৭ এপ্রিল ২০১৪ - ০৪:২৫
News ID: 602978
সন্তানকে জীবিত ফিরে পাবেন বলে আশায় বুক বেঁধেছিলেন নিখোঁজ শিক্ষার্থীদের বাবা-মা। কিন্তু নিয়তি তাদের সে আশা পূরণ করেনি।