আবনা ডেস্ক : বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমায় বড় ধরনের অর্থ সংকটে মধ্যপ্রাচ্যের তেল রফতানিকারক দেশগুলো। এর বড় ধাক্কা এসেছে বাংলাদেশের রেমিটেন্সে (প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ)। সৌদি আরব ও দুবাইয়ের অনেক কোম্পানি শ্রমিকদের বেতন দিতে পারছে না। এতে দেশে টাকা পাঠানো দূরের কথা, শ্রমিকদের চলতেই কষ্ট হচ্ছে। অধিকাংশ দেশেই ধারাবাহিক অর্থনৈতিক মন্দার মুখে শ্রমিক ছাঁটাই চলছে। এ ছাড়া এসব দেশের মুদ্রার মানও কমছে। ফলে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে রেমিটেন্স কমেছে ১৯ কোটি ৮৭ ডলার। কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মে রেমিটেন্সের হার বাড়ার কথা ছিল। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশংকা করা হচ্ছে।
জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি (বায়রা) বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক রফতানি অনেক কমে গেছে। বিভিন্ন দেশে কড়াকড়ির কারণে প্রবাসীদের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশের জাতীয় আয়ের শক্তিশালী খাতটিতে বিপর্যয় আসবে। রেমিটেন্স বাড়াতে নতুন বাজার খুঁজে বের করতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই থেকে মার্চ) রেমিটেন্স ১৯ কোটি ৮৭ লাখ ডলার কম এসেছে। এ সময়ে প্রবাসীরা এক হাজার ১০৫ কোটি ৯৬ লাখ মার্কিন ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল এক হাজার ১২৫ কোটি ৮৩ লাখ ডলার। দেশভিত্তিক হিসাবে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স আসে সৌদি আরব থেকে। আর জুলাই থেকে মার্চ সময়ে দেশটি থেকে রেমিটেন্স এসেছে ২২৩ কোটি ৯২ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এদেশ থেকে ২৪৪ কোটি ১৭ লাখ ডলার এসেছিল। আলোচ্য সময়ে রেমিটেন্স আয়ের দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ১৯৯ কোটি ডলার এসেছে। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ২১০ কোটি ২৩ লাখ মার্কিন ডলার। একইভাবে কুয়েত ওমান ও বাহরাইন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর থেকেও রেমিটেন্স কমেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে অর্থবছর শেষে রেমিটেন্স উল্লেখযোগ্য হারে কমবে বলে আশংকা করা হচ্ছে।
জানতে চাইলে জনশক্তি বায়রার চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবুল বাশার যুগান্তরকে বলেন, রেমিটেন্স কমছে। এর বড় কারণ হল জ্বালানি তেলের দাম কমায় মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ শ্রমিকদের বেতন দিতে পারছে না। এসব দেশের মুদ্রার মানও কমছে। ফলে টাকা পাঠানো দূরের কথা, ওইসব দেশে কাজ করা শ্রমিকদের চলতেই কষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন, উদ্বেগের বিষয় হল সাম্প্রতিক সময়ে জনশক্তি রফতানিও কমছে। বিশেষ করে দুবাই, সৌদি আরব, কুয়েত এবং লিবিয়ার মতো দেশগুলোতে জনশক্তি রফতানি একেবারে কম। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামীতে রেমিটেন্স আরও কমবে। তিনি বলেন, এ অবস্থায় সরকারি উদ্যোগ জরুরি। বিশেষ করে সরকারের পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং বায়রা মিলে নতুন বাজার খুঁজে বের করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে, মোট রেমিটেন্সের ৬৫ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে। এছাড়া মালয়েশিয়ার মুদ্রা রিঙ্গিত এবং আরব আমিরাতের দিরহামের দরপতনে এই দুই দেশ থেকেও রেমিটেন্স কম আসছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের রেমিটেন্সের পরিমাণ ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের ৮ দশমিক ৬ শতাংশের সমান। এছাড়াও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের রেমিটেন্সের অবদান ৬৭ শতাংশ। কিন্তু গত এক বছরে যে হারে দেশ থেকে জনশক্তি রফতানি বেড়েছে, ওই হারে রেমিটেন্স বাড়েনি। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় জানায়, বর্তমানে বিশ্বের ১৬০টি দেশে ৯৬ লাখ শ্রমিক কর্মরত। আর ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ২৪ লাখ ৫১ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। এ সময়ে রেমিটেন্স এসেছে ৬২ বিলিয়ন ডলার। ওই মন্ত্রণালয়ের তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৮৮১ জন শ্রমিক বিদেশে গেছে। আর ২০১৪ সালে যা ৪ লাখ ২৫ হাজার ৬৮৪ জন। এ হিসেবে এক বছরে জনশক্তি রফতানি বেড়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার ১৯৭ জন। শতকরা হিসেবে যা ৩০ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪ সালে রেমিটেন্সে ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। কিন্তু ২০১৫ সালে মাত্র ২ দশমিক ৬৮ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০১৪ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে রেমিটেন্স এসেছিল ২৭৯ কোটি ২০ লাখ ডলার। গত বছর তা কমে ২৭৬ কোটি ১৫ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। লিবিয়া থেকেও রেমিটেন্স কমেছে। ২০১৪ সালে দেশটিতে অবস্থানরত প্রবাসীরা ৫ কোটি ৬৪ লাখ ডলার দেশে পাঠালেও গত বছর পাঠিয়েছেন ৩ কোটি ২৫ লাখ ডলার। গত বছর রেমিটেন্স কমেছে আরেক গুরুত্বপূর্ণ উৎস দেশ কুয়েত থেকেও। ২০১৪ সালে দেশটিতে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশীরা ১১০ কোটি ডলার দেশে পাঠালেও গত বছর পাঠিয়েছেন ১০৫ কোটি ২৫ লাখ ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. বিরূপাক্ষ পাল বলেন, বাংলাদেশের রেমিটেন্স সবচেয়ে বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এক্ষেত্রে সৌদি আরব প্রথম স্থানে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। আর অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের কোম্পানি থেকে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের হুমকি বাড়ছে। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনৈতিক মন্দার কারণে রেমিটেন্স কমতে পারে।
জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশগুলোর অবস্থা খারাপ। এসব দেশের প্রবৃদ্ধির হার কমছে। ফলে শ্রমের মজুরিও কমছে। যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের রেমিটেন্সে। তিনি বলেন, যে পরিমাণ জনশক্তি রফতানি হয়েছে, ওই হারে রেমিটেন্স বাড়েনি।