আবনা ডেস্ক: যখন তাঁর ছেলেমেয়েদের বললেন যে হয়তোবা ওদের হত্যা করতে হবে তাঁকে, তখন তারা অমত করেনি। আইএসআইএলে'র অত্যাচারে দুর্বিষহ জীবনের কথা ভেবে তারা মরতেও রাজি ছিল। ২০১৪ সালে ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলের সংখ্যালঘু ইজাদি সম্প্রদায়ের অন্যদের মতো নেদার পরিবারকেও আইএসআইএল অপহরণ করে ক্রীতদাস বানিয়ে রাখে।
নেদার (আসল নাম নয়) স্বামীকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল আইএসআইএল। তাঁকে হত্যা করা হয়েছে বলে মনে করা হয়। নেদার বড় ছেলের বয়স তখন মাত্র ১৩ বছর। তাকে জিহাদি হিসেবে লড়াইয়ের জন্য জোর করে নিয়ে যাওয়া হয়। আইএসআইএল যোদ্ধাদের হাতে ধর্ষণ থেকে বাঁচাতে তিনি তার দুই কিশোরী কন্যার চুল ও ভুরু ফেলে দিয়েছিলেন, যাতে তাদের রুগ্ন ও ছেলেদের মতো দেখতে লাগে। তিনি নিজেও আইএসআইএলে'র হাতে মারধর আর ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। কয়েকবার তাঁকে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়। গত বছর তাঁর আত্মীয়রা তাঁকে মুক্ত করে। এ জন্য তাঁর মালিককে ‘ক্ষতিপূরণ’ বাবদ অর্থ দিতে হয়েছিল।
বাস্তুহারা মানুষের জন্য কুর্দিস্তানের ম্যামিলিয়ান ক্যাম্পে ত্রাণকর্মীদের কাছে সয়ে যাওয়ার এই কঠিন পরীক্ষা দেওয়ার কথা বলছিলেন নেদা। তবে সে সময় নেদাকে ততটা আবেগ প্রকাশ করতে দেখা যায়নি। ক্যাম্পে মানসিক সেবা প্রদানকারী সংস্থা সিড ফাউন্ডেশনের পরিচালক রেঝনা মোহাম্মদের মতে, নিজেকে নিয়ন্ত্রণের একধরনের কৌশল আয়ত্ত করে থাকতে পারেন তাঁরা।
‘তাঁরা যদি একবার ভেঙে পড়ে কাঁদতে শুরু করেন, তাহলে ক্ষণিকের তরেও সে কান্না থামবে না’—হয়তো এ ভাবনাই তাঁদের মনে কাজ করে। মধ্যপ্রাচ্যে খুব কম মানুষই আছেন, যাঁরা মানসিক দুর্ভোগ থেকে বাঁচার জন্য সাহায্য খোঁজেন বা নেন। ক্যাম্পে নেদা নিজেও এখন পর্যন্ত কারও কোনো ধরনের সাহায্য নিতে আগ্রহী নন। তিনি প্রতিদিন কাঁদেন। আর তাঁর দুই সন্তান কারও সঙ্গে কথা বলে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এই অঞ্চলে থাকা লোকজনের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বে প্রতি ১০ জনের একজন মানসিক সমস্যায় ভুগছেন বলে ধারণা করা হয়। যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে এ হার প্রতি ছয়জনে একজন। আঘাতের ফলে মানসিক অসুস্থতা ও বিষণ্নতা মধ্যপ্রাচ্যে এখন খুব বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। যুদ্ধের কারণে এসব বিষয়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। যেমন যুদ্ধের আগে সিরিয়ার দামেস্ক ও আলেপ্পো শহরের তিনটি হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চালু ছিল। এর মধ্যে একটি হাসপাতাল পুরোপুরি শেষ। অন্য দুটি হাসপাতাল এখন আর প্রবেশযোগ্য নয়।
২৩ লাখ সিরীয়র জন্য মাত্র ৭০ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন। যুদ্ধের কারণে তাঁদের বেশির ভাগই পালিয়ে গেছেন। আমেরিকায় প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য ১ দশমিক ২ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আছেন। কোনো আরব দেশেই এই সংখ্যা মানুষের বিপরীতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞর হার শূন্য দশমিক ৫-এর বেশি নয়। কোনো কোনো আরব দেশে এরও কম। ৪ ভাগের ৩ ভাগেরও বেশি মানুষ মানসিক সেবা পাওয়ার বাইরে রয়ে গেছেন। সিরিয়ায় অভিজাত এলাকায় সরকার এ সেবা কিছুটা দিয়ে থাকলেও জঙ্গিদের দখলে থাকা এলাকাগুলোতে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয় না। দ্য ইকোনমিস্ট অবলম্বনে