আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): সৌদি আরবের মক্কায়; সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে।
চুক্তি সইয়ের পর এক বিবৃতিতে বলা হয়, এর লক্ষ্য হলো যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিন দেশের সম্মিলিত প্রতিরোধক্ষমতা জোরদার করা।
চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এতে আরও বলা হয়, চুক্তির আওতায় তিন দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সব ক্ষেত্র আরও জোরদার করা হবে।
তবে বাস্তবে এই প্রতিরক্ষা চুক্তি কীভাবে কার্যকর হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার স্থায়িত্ব নিয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে বাড়তে থাকা উদ্বেগেরই প্রতিফলন।
যুক্তরাষ্ট্রের রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসির মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক ফেলো ক্রিস্টিয়ান কোটস উলরিখসেন আল জাজিরাকে বলেন, ‘এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা অংশীদারত্বের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ বাড়ছে।’
তার মতে, নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি গড়ে তোলার উদ্দেশ্য সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রকে ‘প্রতিস্থাপন’ করা নয়, বরং নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কৌশলগত ও নীতিগত বিকল্প তৈরি করা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এখনো মক্কা চুক্তি নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির বিশ্লেষক সিনা তুসি আল জাজিরাকে বলে, ‘ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক ব্যবস্থা পুনর্গঠিত হওয়ার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, মক্কা চুক্তি তার প্রথম বড় ভূরাজনৈতিক উদ্যোগগুলোর একটি।’
তার মতে, চুক্তিটির গুরুত্ব একটি আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট গঠনের চেয়েও বেশি নিহিত রয়েছে আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কীভাবে নতুন করে মূল্যায়ন করছে, তার ওপর।
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা অংশীদারত্ব রয়েছে। কিন্তু নতুন এই চুক্তি ইঙ্গিত দিচ্ছে, সৌদি আরব তার নিরাপত্তা অংশীদারত্ব আরও বিস্তৃত করতে চাইছে।
তুসি বলে, প্রধানত ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করার পরিবর্তে সৌদি আরব তার নিরাপত্তা অংশীদারত্ব বাড়াচ্ছে এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে আরও বেশি নিরাপত্তা সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করছে। তার মতে, এটিই চুক্তিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের শুরু করা যুদ্ধ নিয়ে হতাশ ছিল।
তাদের অভিযোগ, ওই অভিযান শুরুর আগে আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব যথেষ্ট বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক হামলার পরও হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল সীমিত করার সক্ষমতা ইরান ধরে রেখেছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের মিত্রদের পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষা গোলাবারুদ সরবরাহ করতেও ওয়াশিংটন হিমশিম খেয়েছে। এসব অস্ত্রের বড় একটি অংশ ইসরায়েলে সরবরাহ করা হয়েছে।
যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা আরও চাপে পড়েছে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনে মধ্যপ্রাচ্য নীতির অন্যতম প্রধান রূপকার ব্রেট ম্যাকগার্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, মধ্যপ্রাচ্য এখন এমন এক পরিবর্তনশীল সময়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে পুরোনো কাঠামো অনেকটাই ভেঙে পড়েছে এবং নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক ইয়াসমিন ফারুক আল জাজিরাকে বলে, ‘তিনটি দেশই যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার এবং তারা বুঝতে পারছে, যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করার মতো কোনো কাঠামো এখনো নেই।’
ফারুক বলে, ‘ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকেই তিন দেশই মোটামুটি মধ্যস্থতা ও উত্তেজনা কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।’
এই বিশ্লেষকের মতে, চুক্তিটির গুরুত্ব বরং ‘নিয়মভিত্তিক প্রতিরোধ’ তৈরির মধ্যে নিহিত থাকতে পারে, অর্থাৎ কোনো একটি দেশের ওপর হামলা হলে অন্য দুই দেশও তা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করবে, এমন একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা দেওয়া।
ফারুকের মতে, যুদ্ধের পর ইরান আরও কঠোর অবস্থানে গেছে এবং নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে শক্তি প্রয়োগের সক্ষমতা নিয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়েছে। এখানে শুধু তাৎক্ষণিক প্রতিরোধের বিষয় নেই, এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতারও একটি দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।
Your Comment