জন্ম ও বংশ পরিচয় :
শিয়াদের ষষ্ট ইমাম হযরত ইমাম সাদিক (আ.) ১৭ই রবিউল আওয়াল ৮৩ হিজরীতে পবিত্র মদিনা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর কুনিয়াহ ছিল আব্দুল্লাহ এবং তাঁর উপাধী সাদেক (সত্যবাদী)। তাঁর পিতার নাম হযরত ইমাম মুহাম্মাদ বাকের (আ.) –শিয়াদের পঞ্চম ইমাম- এবং তাঁর মাতার নাম উম্মে ফারওয়া।
ইমামতের পূর্বে তিনি তাঁর সম্মানিত পিতার ধর্মীয় শিক্ষা প্রচার ও একনিষ্ঠ ছাত্র প্রশিক্ষণের সাক্ষ্য ছিলেন। ইমাম মুহাম্মাদ বাকের (আ.) বিভিন্ন সময়ে স্বীয় পুত্র হযরত জাফর সাদিক (আ.) এর ইমামত ও বেলায়েতের বিষয়টি শিয়াদের সম্মুখে স্পষ্ট করেছিলেন এবং শিয়াদেরকে নিজের পর স্বীয় পুত্রের অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এরই ভিত্তিতে ইমাম সাদিক (আ.) এর ইমামতের সপক্ষে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
হযরত ইমাম সাদিক (আ.) স্বীয় পিতা হযরত ইমাম মুহাম্মাদ বাকের (আ.) এর শাহাদতের পর ১১৪ হিজরীতে ৩১ বছর বয়সে ইমামতের দায়িত্ব লাভ করেন। তার ইমামতের সময়টি ছিল স্বৈরাচারী বনি আব্বাস গোষ্ঠীর শাসনামলের শেষের দিক এবং অত্যাচারী আব্বাসী গোষ্ঠীর শাসনামলের শুরু। উমাইয়া শাসকদের হুকুমতের পতন ১৩২ হিজরী ঘটে।
ইমাম সাদিক (আ.) এর যুগটি ছিল অন্যান্য ইমাম (আ.) গণের যুগ অপেক্ষা আলাদা। ঐ সময়কার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ ছিল অন্যান্য ইমামদের সময় অপেক্ষা ভিন্ন। কেননা তাঁর যুগটি ছিল অত্যাচারী শাসক গোষ্ঠী বনি উমাইয়ার ক্ষমতা হতে পতনের সময় এবং উমাইয়া শাসকদের হতে আব্বাসীয় কর্তৃক ক্ষমতা কেড়ে নেয়ার সময়। এ দুই অত্যাচারী এ দুই শাসক গোষ্ঠী দীর্ঘদিন যাবত ক্ষমতার লোভে পরস্পরের সাথে দ্বন্দে লিপ্ত ছিল। অবশেষে ১২৯ হিজরীতে সশস্ত্র ও সামরিক হামলা শুরু হয়।
এই টানাপোড়ন ও সংঘর্ষের কারণে বনি উমাইয়া ও বনি আব্বাস ইমামগণ (আ.) এর তত্পরতার প্রতি কঠোর দৃষ্টি দেয়ার সুযোগ পেত না। এ কারণে এ সময়ে ইমাম সাদিক (আ.) ও শিয়ারা তুলনামূলকভাবে সাংস্কৃতিক ও ইলমি তত্পরতার জন্য উত্তম সুযোগ লাভ করেছিলেন।
ইমাম (আ.) তত্কালীন সরকারের রাজনৈতিক শক্তির দূর্বলতার সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ধর্মীয় শিক্ষা প্রচার ও প্রসারের জন্য সচেষ্ট হন। ইমাম (আ.) এর যুগে যেহেতু ইসলামি ভূখণ্ড প্রাথমিক যুগ অপেক্ষা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছিল তাই ইসলাম ও শিয়া মাযহাব, অন্যান্য ধর্ম ও মাযহাবের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন ছিল। আর এ কারণেই সাংস্কৃতিক কর্মতত্পরতা ও ছাত্র প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা ঐ যুগে প্রকটভাবে দেখা দেয়। এ সময় ইমাম সাদিক (আ.) যথাযথ উত্তমরূপে অন্যান্য ধর্ম ও মাযহাবের সকল প্রশ্ন ও সন্দেহের জবাব অত্যন্ত গভীরভাবে ও মনোযোগ সহকারে দিতেন এবং শিয়া মাযহাবের স্বকীয়তা ও গভীরতা তুলে ধরতেন।
হযরত ইমাম সাদিক (আ.) এর যুগ থেকেই ইমামিয়া শিয়া মাযহাব ফিকাহ, কালাম শাস্ত্র, নৈতিকতা, তাফসীর ইত্যাদি বিষয়ে স্বতন্ত্র স্বকীয়তা লাভ করে। শিয়া মাযহাবের ফিকাহ -যা জাফরী ফিকাহ নামে প্রসিদ্ধ- ইমাম সাদিক (আ.) এর নামের সাথে নামকরণ করা হয়েছে। কেননা শিয়া মাযহাবের ফিকাহ শাস্ত্রের অধিকাংশ মাসআলা-মাসায়েল তাঁর (আ.) হতেই বর্ণিত হয়েছে। আজকে আমাদের মাঝে যে বিভিন্ন ফিকাহ’র রূপ আমরা দেখতে পাই সেগুলোর উত্পত্তি ইমাম সাদিক (আ.) এর সমসময়ে বা তার পরে। ইমাম সাদিক (আ.) এর এহেন পদক্ষেপের মাধ্যমে মহানবী (স.) কর্তৃক আনীত প্রকৃত ইসলাম আহল বাইত (আ.) এর মাধ্যমে তথা তত্কালীন যুগের ইমাম হযরত সাদিক (আ.) এর মাধ্যমে আমাদের নিকট পৌঁছে। আর এ যুগেই কুফা ও বসরাতে হাদীস ও কালাম শাস্ত্রে ও ফিকাহ শাস্ত্রের ব্যাপক চর্চা হয়।
তাঁর (আ.) সময়টি ছিল সংস্কৃতি ও চিন্তার জাগরণের সময় এবং বিভিন্ন মাযহাবের মাঝে তর্ক-বিতর্কের সময়। মহানবী (স.) এর যুগের পর এমন সুযোগ আর কখনই সৃষ্টি হয়নি। কেননা মহানবী (স.) এর ইন্তেকালের পর হাদীস লেখার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছিল। আর বনি উমাইয়া শাসকদের প্রচণ্ড চাপের কারণে ইমাম (আ.) গণও প্রকাশ্যে মহানবী (স.) এর শিক্ষাকে প্রচার করতে পারতেন না। এ কারণে তত্কালীন মুসলমানরা মহানবী (স.) এর রেখে যাওয়া শিক্ষা লাভ হতে বঞ্চিত হয়।
ইমাম সাদিক (আ.) রাজনৈতিক চাপ মুক্ত হওয়ার সাথে সাথে এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মহানবী (স.) এর প্রকৃত ইসলামের শিক্ষাকে –যা বংশীয় পরম্পরায় আহলে বাইত (আ.) এর এক সদস্য হতে অন্য সদস্যের মাধ্যে তাঁর নিকট পৌঁছে ছিল- মুসলমানদের মাঝে প্রচার শুরু করলেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষ ছাত্র প্রশিক্ষণে নিজেকে নিয়োজিত করলেন। বিভিন্ন সূত্র হতে বর্ণিত বিশ্বস্ত রেওয়াতের ভিত্তিতে জানা গেছে যে, ইমাম সাদিক (আ.) এর ছাত্রদের সংখ্যা ছিল ৪ সহস্রাধিক।
তাঁর সময়কার শাসকগণ:
যেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইমাম সাদিক (আ.) উমাইয়া ও আব্বাসী উভয় শাসক গোষ্ঠীর শাসনামল দেখেছেন। তাঁর যুগে যে সকল উমাইয়া শাসকগণ ইসলামি ভূখণ্ডকে শাসন করেছে তারা হলো :
১। হিশাম বিন আব্দুল মালেক (১০৫-১২৫ হি.)।
২। ওয়ালিদ বিন ইয়াযিদ বিন আব্দুল মালেক (১২৫-১২৬ হি.)।
৩। ইয়াযিদ বিন ওয়ালিদ (১২৬ হি.)।
৪। ইবরাহিম বিন ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালেক (১২৬ হিজরী সন হতে মাত্র ৭০ দিন)।
৫। মারওয়ান বিন মুহাম্মাদ (১২৬-১৩২ হি.)
যে সকল আব্বাসীয় খলিফা তার যুগে শাসন করেছে তাদের নাম নিম্নরূপ :
১। আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ ওরফে সাফফাহ (১৩২-১৩৭ হি.)
২। আবু জাফার ওরফে মানসুর দাওয়ানেকী (১৩৭-১৫৮ হি.)