১০ জানুয়ারী ২০২৬ - ১৬:৪২
সন্তান লালন পালনের মূল ভিত্তি: ঈমানদার পিতা, সচ্চরিত্র মাতা ও হালাল খাদ্য

কুরআন ও রেওয়ায়াতের আলোকে পরিবারের গুরুত্ব তুলে ধরে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন আনসারিয়ান বলেন: একটি সুস্থ ও আদর্শ পরিবারের তিনটি মৌলিক স্তম্ভ উল্লেখ হয়েছে/এই তিনটি স্তম্ভ সঠিকভাবে রক্ষা করা হলে সৎ ও যোগ্য সন্তান গড়ে ওঠার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): ইসলামী ইরানের প্রখ্যাত শিক্ষক হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন আনসারিয়ান হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে তার ধারাবাহিক বক্তৃতামালার চতুর্থ পর্বে কুরআন ও হাদিসের আলোকে ঘর, পরিবার ও সন্তান লালনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন।




উস্তাদ আনসারিয়ান বলেন, কুরআন ও রেওয়ায়াতের দৃষ্টিতে ঘরের তিনটি মূল ভিত্তি রয়েছে, যদি এই ভিত্তিগুলো আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী গড়ে ওঠে, তবে সেই ঘরে জন্ম নেওয়া সন্তান স্বাভাবিকভাবেই একজন সৎ, ভারসাম্যপূর্ণ ও যোগ্য মানুষে পরিণত হবে।


প্রথম স্তম্ভ: ঈমানদার ও সৎ পিতা: হুজ্জাতুল ইসলাম আনসারিয়ান বলেন, ঘরের প্রথম ও প্রধান স্তম্ভ হলেন পিতা। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে সৎ ও ধার্মিক পিতার কথা উল্লেখ হয়েছে, যা সন্তানের চরিত্র গঠনে পিতার ভূমিকার গুরুত্বকে সুস্পষ্ট করে। যে পিতা ঈমানদার, পবিত্র জীবনযাপনকারী এবং গুনাহ থেকে বিরত থাকেন, তার সন্তানও সেই পরিবেশের প্রভাবে সৎ ও নৈতিক মানুষ হয়ে ওঠে।

তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক পিতার পক্ষে হযরত ইবরাহিম (আ.) বা হযরত মুসা (আ.)-এর মতো হওয়া সম্ভব নয়; তবে একজন শান্ত, সংযমী, ঈমানদার ও চরিত্রবান পিতা, যেমন সালমান ফারসি ও আবু যার (রা.)-এর ন্যায় আদর্শিক হওয়া নিঃসন্দেহে সম্ভব।

যে পিতা ঘরের ভেতরে ছোটখাটো গুনাহসমূহ থেকেও নিজেকে সংযত রাখেন এবং কোনো অন্যায় কাজে লিপ্ত হন না, কুরআনের দৃষ্টিতে এমন পিতা হচ্ছে আদর্শ।

দ্বিতীয় স্তম্ভ: পর্দাশীল ও সচ্চরিত্র মাতা: উস্তাদ আনসারিয়ান বলেন, ঘরের দ্বিতীয় স্তম্ভ হলেন মাতা; যাঁকে অবশ্যই পর্দাশীল, সৎ, চরিত্রবান এবং পরিবারের আমানতদার হতে হবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) মাকেও পরিবারের একটি মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। মায়ের আচার-আচরণ, নৈতিকতা ও পবিত্রতা সন্তানের ব্যক্তিত্ব গঠনে প্রত্যক্ষ ও গভীর প্রভাব ফেলে।

এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হযরত যায়নাবে কুবরা (সা.আ.) কেবল বাহ্যিক খাবার থেকেই নয়, বরং আত্মিক ও আধ্যাত্মিক খাবার থেকেও পূর্ণমাত্রায় উপকৃত হয়েছেন। তিনি নয় মাস হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর গর্ভে অবস্থান করেন এবং পরবর্তীতে মায়ের ইবাদত, মুনাজাত ও খোদাভীতির পরিবেশে লালিত হন, যা তাঁর মহীয়সী ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তৃতীয় স্তম্ভ: পবিত্র ও হালাল খাদ্য: হুজ্জাতুল ইসলাম আনসারিয়ান বলেন, ঘরের তৃতীয় স্তম্ভ হলো খাদ্য। কুরআনে খাদ্যের বিশেষ গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে; এমনকি আল্লাহ তায়ালা ডুমুর ও জলপাইয়ের মতো খাদ্যবস্তুর শপথ করেছেন। এর মাধ্যমে মানুষকে খাদ্যের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে-হালাল হওয়া ও পবিত্রতা-উভয় দিক থেকেই।

তিনি বলেন, হালাল ও পবিত্র খাদ্য শুধু দেহকে সুস্থ রাখে না; বরং সন্তানের আত্মা, চরিত্র ও নৈতিক গঠনের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। যদি ঘরের খাদ্য হালাল ও পবিত্র না হয়, তবে তা সন্তানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই খাদ্য ক্রয়ের অর্থ যেমন হালাল হতে হবে, তেমনি খাদ্য নিজেও হতে হবে হালাল ও পরিচ্ছন্ন।

সৎ পরিবেশে গড়ে ওঠা সন্তানের পরিণতি
উস্তাদ আনসারিয়ান আরও বলেন, যে সন্তান ঈমানদার পিতা, সচ্চরিত্র মাতা ও হালাল খাদ্যের পরিবেশে লালিত হয়, সে হযরত যায়নাবে কুবরা (সা.আ.)-এর মতো উচ্চ চরিত্রের অধিকারী হতে পারে। হযরত যায়নাব (সা.আ.) শুধমাত্র হযরত ফাতেমা (সা.আ.)-এর গর্ভের প্রভাবেই প্রভাবিত হননি; বরং পিতা আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-এর বেলায়েতের পরিবেশ ও হালাল জীবনের মধ্য দিয়ে তাঁর ব্যক্তিত্ব আরও পূর্ণতা লাভ করে।

বক্তব্যের শেষাংশে তিনি বলেন, সঠিক পারিবারিক লালন-পালন ও হালাল খাদ্যের গুরুত্ব কেবল দুনিয়াবি জীবনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আখিরাতের সফলতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। সৎ পিতা-মাতা ও পবিত্র খাদ্যের গুরুত্ব কখনোই অবহেলা করা যায় না। এই তিনটি স্তম্ভই একটি সুস্থ পরিবার, আদর্শ সমাজ এবং নেককার সন্তানের মেরুদণ্ড।

Tags

Your Comment

You are replying to: .
captcha