আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): আরবাঈনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান যখন নিকটে আসছে, তখন শোকানুষ্ঠান আয়োজনের বিষয়ে বাহরাইন সরকারের নতুন নির্দেশনা দেশটিতে ধর্মীয় স্বাধীনতার ‘নিয়ন্ত্রণ’ ও ‘নিষেধাজ্ঞা’-র মধ্যকার সীমারেখা নিয়ে বিতর্ককে আবারও উসকে দিয়েছে।
অনুষ্ঠানগুলো কেবল ‘হোসাইনিয়া’-র (ধর্মীয় সমাবেশস্থল) মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা, বাইরে লাউডস্পিকার ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং কর্মসূচির সমাপ্তির সময়সীমা নির্ধারণের মতো পদক্ষেপগুলো কর্মী ও পর্যবেক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
জনশৃঙ্খলা বজায় রাখার লক্ষ্যে সভা-সমাবেশ সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা প্রণয়নের অধিকার সরকারের থাকলেও, সমালোচকদের মতে—যখন এই বিধিমালা এমনভাবে প্রয়োগ করা হয় যা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের প্রকৃতি ও কার্যপদ্ধতিকে প্রভাবিত করে, তখন সেগুলোকে আর নিছক প্রশাসনিক বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য করা যায় না।
বাহরাইনে শোক পালন ও হোসেনি শোভাযাত্রার এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাস রয়েছে এবং এগুলো দেশটির সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বহু দশক ধরে নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও এই অনুষ্ঠানগুলো মানুষের জনজীবনে নিজেদের অবস্থান অবিচলভাবে ধরে রেখেছে। এ কারণেই অনেকের ধারণা, এমন গভীর শিকড়যুক্ত ঐতিহ্যকে কেবল ঋতুভিত্তিক নির্দেশনার মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত বা সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনিক বিধিনিষেধের কারণে ধর্মীয় পরিচিতি ক্ষুণ্ণ হয় না; বরং অনেক ক্ষেত্রেই এ ধরনের চাপের ফলে সামাজিক সংহতি আরও সুদৃঢ় হয়েছে এবং ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের ক্ষেত্রে মানুষের অঙ্গীকার আরও জোরালো হয়েছে।
এমতাবস্থায় পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এই বিষয়টি পরিচালনার পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা না করে প্রতিটি ধর্মীয় উৎসবের সময় পুনরায় বিধিনিষেধ আরোপ করাটা অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে বেশি জনআস্থা ক্ষুণ্ণ করে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে যে, নানাবিধ চাপ ও বিধিনিষেধ সত্ত্বেও বাহরাইনের শিয়া সম্প্রদায় তাদের ধর্মীয় রীতিনীতি ও নিজস্ব সত্তা রক্ষায় অবিচল রয়েছে এবং তাদের এই সুগভীর প্রথাগুলোকে দেশের সামাজিক কাঠামো থেকে মুছে যেতে দেয়নি।
একই সাথে, শিয়া ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের পরিধি সংকুচিত করার লক্ষ্যে বাহরাইন কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে যেসব পদক্ষেপ—যেমন—ধর্মীয় নেতা, ধর্মপ্রচারক, ধর্মীয় কর্মী ও বিবেকবান বন্দিদের (prisoners of conscience) আটক করা—নিয়ে আসছে, তার প্রেক্ষাপটেই এই বিধিনিষেধগুলো আরোপ করা হচ্ছে।
অনেক বিশিষ্ট ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এখনও কারাগারে বন্দী অথবা কঠোর বিধিনিষেধের সম্মুখীন—এমন এক পরিস্থিতি যা শিয়া জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ও নাগরিক দাবির প্রতি আল-খলিফা সরকারের নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক মনোভাব এবং দেশটির ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও আচার-অনুষ্ঠান নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকেই প্রতিফলিত করে।
তবে জনমনে প্রতিক্রিয়া, বাহরাইনের অভ্যন্তরে শোকানুষ্ঠান আয়োজন এবং বাস্তব ও ভার্চুয়াল—উভয় জগতেই ইমাম হোসাইন (আ.)-এর প্রতি ভক্তি ও অনুরাগের ব্যাপক বহিঃপ্রকাশ প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় রীতিনীতি ও আশুরার সংস্কৃতির প্রতি বাহরাইনের শিয়া সম্প্রদায়ের নিষ্ঠা ও অঙ্গীকারকে ক্ষুণ্ণ করতে এসব নীতি ব্যর্থ হয়েছে।
Your Comment