১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ১৫:৩১
গাজায় নিহতের সংখ্যা ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে

গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা পূর্বের সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি—বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যনচেট গ্লোবাল হেলথে প্রকাশিত স্বাধীন গবেষণায় এমনটাই উঠে এসেছে।

আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা পূর্বের সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি—বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যনচেট গ্লোবাল হেলথে প্রকাশিত স্বাধীন গবেষণায় এমনটাই উঠে এসেছে।


গবেষণাগুলো বলছে, ২০২৫ সালের শুরু পর্যন্ত “সহিংস মৃত্যু” ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে, যা গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের (MoH) প্রকাশিত তথ্যের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

দ্য ল্যনচেট গ্লোবাল হেলথ প্রকাশিত ‘গাজা মর্টালিটি সার্ভে (জিএমএস)’ শীর্ষক এক জনসংখ্যাভিত্তিক গৃহস্থালি জরিপে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত আনুমানিক ৭৫,২০০ জন সহিংসতায় নিহত হয়েছেন। এই সংখ্যা গাজার যুদ্ধ-পূর্ব ২২ লাখ জনসংখ্যার প্রায় ৩.৪ শতাংশ এবং একই সময়ের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ৪৯,০৯০ জন মৃত্যুর হিসাবের তুলনায় প্রায় ৩৪.৭ শতাংশ বেশি।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কমপক্ষে ৭১,৬৬২ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ৪৮৮ জন নিহত হওয়ার তথ্য রয়েছে।

ইসরাইল বরাবরই গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে জানুয়ারিতে দেশটির সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, গাজায় প্রায় ৭০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন—এমন হিসাব তারা মেনে নিচ্ছেন।

বৈজ্ঞানিক যাচাইয়ে নতুন মাত্রা

জিএমএস জরিপে ২,০০০টি পরিবার—মোট ৯,৭২৯ জনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষণাটির প্রধান লেখক, লন্ডনের রয়্যাল হলোওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক মাইকেল স্প্যাগাট বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য সাধারণত নির্ভরযোগ্য হলেও অবকাঠামো ভেঙে পড়ায় তা স্বভাবতই রক্ষণশীল বা কম হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে।

এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্য ল্যনচেটে প্রকাশিত এক গবেষণায় পরিসংখ্যানভিত্তিক “ক্যাপচার-রিক্যাপচার” মডেল ব্যবহার করে যুদ্ধের প্রথম নয় মাসে ৬৪,২৬০ জন মৃত্যুর অনুমান করা হয়েছিল। নতুন গবেষণাটি সরাসরি গৃহস্থালি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে সেই অনুমানকে আরোবিস্তৃত ও প্রামাণ্য ভিত্তি দিয়েছে।

এছাড়া প্রথমবারের মতো “অসহিংস অতিরিক্ত মৃত্যু”র হিসাবও তুলে ধরা হয়েছে। জরিপে ১৬,৩০০টি অসহিংস মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে ৮,৫৪০টি মৃত্যু অবরোধ ও জীবনযাত্রার অবনতির কারণে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভেঙে পড়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন, নারী, শিশু ও বয়স্কদের মিলিয়ে মোট নিহতের ৫৬.২ শতাংশ—যা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পূর্ববর্তী প্রতিবেদনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য নিয়ে ছড়ানো বিভ্রান্তি বা অবিশ্বাসের প্রচারণা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

জটিল অস্ত্রোপচারের দীর্ঘ অপেক্ষা

মৃত্যুর পাশাপাশি আহতের সংখ্যাও উদ্বেগজনক। ই-ক্লিনিক্যাল মেডিসিন-এ প্রকাশিত আরেকটি বহুমাত্রিক গবেষণায় ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মোট আহতের সংখ্যা ১,১৬,০২০ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণাটি, যেখানে ডিউক ইউনিভার্সিটি এবং গাজার আল-শিফা হাসপাতালের গবেষকেরা যুক্ত ছিলেন, তারা দেখিয়েছেন—আহতদের মধ্যে ২৯,০০০ থেকে ৪৬,০০০ জনের জটিল পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। যুদ্ধের আগে ২২ লাখের বেশি মানুষের জন্য গাজায় স্বীকৃত প্লাস্টিক ও পুনর্গঠন সার্জন ছিলেন মাত্র আটজন।

গবেষণার সহ-লেখক সার্জন অ্যাশ প্যাটেল বলেন, যুদ্ধ-পূর্ব সক্ষমতায় ফিরতে পারলেও সম্ভাব্য অস্ত্রোপচার জট কাটাতে প্রায় এক দশক সময় লাগতে পারে।

ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থা

২০২৫ সালের মে নাগাদ গাজার ৩৬টি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১২টি প্রাথমিক চিকিৎসার বাইরে সেবা দিতে সক্ষম ছিল। মোট শয্যা কমে দাঁড়ায় প্রায় ২,০০০-এ, যেখানে যুদ্ধের আগে তা ছিল ৩,০০০-এর বেশি। বিশেষায়িত মাইক্রোসার্জারির মতো দক্ষতা প্রায় অনুপস্থিত।

গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, সময়মতো চিকিৎসা না পেলে ক্ষত সংক্রমণ, সেপসিস ও স্থায়ী অক্ষমতার ঝুঁকি বহুগুণে বাড়ে। আন্তর্জাতিক সহায়তা ও পুনর্গঠন সক্ষমতা না বাড়ালে হাজারো মানুষ আজীবন শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে বেঁচে থাকতে বাধ্য হবেন।

দ্য ল্যনচেটে প্রকাশিত এক মন্তব্যে গবেষকেরা বলেন, সরাসরি হামলায় মৃত্যু ও পরোক্ষ কারণে মৃত্যুর সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হচ্ছে। বিস্ফোরণে আহত হয়ে মাস পরে সেপসিসে মৃত্যু, বা বিশুদ্ধ পানি ও অস্ত্রোপচারের অভাবে কিডনি বিকল হয়ে মৃত্যুকে সরাসরি না পরোক্ষ—এই প্রশ্নে একটি “ধূসর অঞ্চল” তৈরি হয়েছে, যা প্রকৃত প্রাণহানির চিত্রকে আংশিক করে তুলতে পারে।

২০২৫ সালের শেষভাগে পরিস্থিতি আরোঅবনতি হয়েছে। গাজার ৮০ শতাংশের বেশি এলাকা জোরপূর্বক খালি করা হয়; উত্তর গাজায় দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হয় আগস্টে। ফলে আহতদের শারীরিক সক্ষমতা ও অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও আরো কমে যায়।

গবেষকরা বলছেন, এই ধারাবাহিক স্বাধীন গবেষণা আন্তর্জাতিক জবাবদিহি ও অবিলম্বে হামলা বন্ধের আহ্বান হিসেবে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুরক্ষা সত্ত্বেও স্বাস্থ্য অবকাঠামোর ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে প্রাণহানি ও দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার বোঝা আরোবাড়বে বলে তারা সতর্ক করেছেন।

Tags

Your Comment

You are replying to: .
captcha