আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): সবার কাছে উম্মে মোহাম্মদ নামে পরিচিত ৫২ বছর বয়সি মাইসুন দুই সন্তানের মা। তিনি তার ৯ বছরের ছেলে হাসানের জন্য একটি ছোট্ট লণ্ঠন কিনতে পেরে ক্লান্ত মুখে হাসছেন।
সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে মাইসুন বলেন, আমার সামর্থ্য সীমিত, কিন্তু দিনশেষে শিশুদের মুখে হাসিটাই বড় কথা। গত দুই বছরের শোক আর বিষণ্নতা থেকে একটু মুক্তি পেতেই এই আয়োজন।
গাজায় অন্যবারের তুলনায় এবারের রামজান মাসের বৈশিষ্ট্য হলো এবার পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত। গত বছর ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির কারণে গত দুই বছরের তুলনায় এই আপাত শান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
যদিও এই শান্তি মোটেও নিষ্কণ্টক নয়; তাঁবুটিতে এখনও কয়েক দিন আগের ইসরাইলি ড্রোনের গুলির চিহ্ন স্পষ্ট। মাইসুন বলেন, ‘পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত নয়, মাঝেমধ্যেই কামানের গর্জন শোনা যায়। তবে যুদ্ধের চরম পর্যায়ের তুলনায় তীব্রতা এখন কিছুটা কম।’ তিনি আরও জানান, যুদ্ধে বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর থেকে তারা এ নিয়ে তৃতীয় রমজান পার করছেন।
মাইসুন বলেন, ‘আমরা আমাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছি, আমাদের পরিবার এবং বহু প্রিয়জনকে হারিয়েছি। এতকিছু না থাকার পরও আমরা জীবন ও আনন্দ নিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছি।’ আশা ও শঙ্কার সুরে কথা বললেও মাইসুন একরকম জোর দিয়েই বলেছেন, তার চারপাশের পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন রমজান মাস এক আশীর্বাদ।
তিনি জানান, এই মাসে তার প্রতিদিনের দোয়া একটাই, যুদ্ধ যেন আর ফিরে না আসে।
দুর্ভিক্ষের স্মৃতি ও শঙ্কা : গাজার বাসিন্দাদের মনে এখনও গত রমজানের সেই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের স্মৃতি টাটকা। গত বছরের ১৯ মার্চ, অর্থাৎ রমজানের দ্বিতীয় সপ্তাহে ইসরাইলি হামলায় সব সীমান্ত পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে ত্রাণ আসা বন্ধ হয়ে শুরু হয়েছিল তীব্র খাদ্য সংকট।
পুরোনো সেই অভিজ্ঞতার কথা মনে করে মাইসুন উদ্বেগের সঙ্গে বলেন, ‘মানুষ এখন আটা আর খাবার মজুদ করার কথা বলছে। সবাই আশঙ্কা করছে যুদ্ধ আবার ফিরে আসবে। গত রমজান ছিল একাধারে দুর্ভিক্ষ আর যুদ্ধের কাল। খাবারের অভাবে আমার ছোট ছেলেটি তখন ক্ষুধার জ্বালায় মৃত্যুর প্রার্থনা করত। ভাবা যায়?’
বাস্তুচ্যুত হানান আল-আত্তার ১৬ সদস্যের পরিবার নিয়ে দেইর আল-বালাহতে একটি তাঁবুতে বসবাস করছেন। রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকটে গত দুই বছর ধরে তাকে খোলা আগুনেই রান্না সারতে হচ্ছে।
হানান আক্ষেপ করে বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত রমজান এলেও আমাদের বাস্তবতার পরিবর্তন হয়নি। খোলা জায়গায় বাতাসের ঝাপটায় আগুন নিভে যায়, আর আমার ছেলে প্লাস্টিক দিয়ে তা আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করে।’ দুই মাস আগে অনেক কষ্টে আট কেজির একটি গ্যাস সিলিন্ডার ভরতে পেরেছিলেন তিনি, যা এখন তার কাছে ‘গুপ্তধন’।
হানান জানান, রাত দুপুরে সেহরির সময় খড়ি দিয়ে আগুন জ্বালানো প্রায় অসম্ভব, তাই বিশেষ সময়ের জন্যই এই গ্যাসটুকু লুকিয়ে রেখেছেন তিনি।
ত্রাণই যখন ইফতারের ভরসা : বিদ্যুৎ নেই, নেই কোনো অবকাঠামো বা খাবার সংরক্ষণের জন্য রেফ্রিজারেটর। ফলে গাজাবাসীর দিন চলছে ‘দিন আনা দিন খাওয়া’ পদ্ধতিতে।
হানান জানান, রমজানের প্রথম দিনে একটি ত্রাণ সংস্থা থেকে পাওয়া পার্সেলই তাদের বড় ভরসা। সেই পার্সেলে থাকা মটরশুঁটি, হালুয়া আর খেজুর দেখে তার নাতি-নাতনিদের চোখেমুখে খুশির ঝিলিক দেখা যায়।
Your Comment